‘বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, গানটি ততদিন থাকবে’

সত্তর বছর আগে লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কীভাবে বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে গেল, কেনইবা গানটি আজও গুরুত্বপূর্ণ-তা নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন দুই গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।

তারা দুজনই বললেন, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, এই গানটিও ততদিন থাকবে।

১৯৫২ সালে মায়ের ভাষার দাবিতে ফুঁসে ওঠা বাঙালির মিছিলে পুলিশ গুলি ছুড়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে; সেই আন্দোলনের সংগ্রামী রফিকের নিথর দেহ হাসপাতালে দেখে কলেজছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরীর লিখেছিলেন একুশের সেই অবিনাশী গান।

অমলিন এ গান রেখে বৃহস্পতিবার ভোরে চিরবিদায় নিয়েছেন গানটির স্রষ্টা আবদুল গাফফার চৌধুরী; শুধু একটি গানের কারণেই বাঙালির হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে তাকে স্মরণ রাখবে বলে মনে করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

“উনি আছেন থাকবেন, চিরদিনই থাকবেন। বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকবেন। আমি ওনার অন্তর থেকে স্যালুট জানাই।”

আবদুল গাফফার চৌধুরী লেখেন এক অমর কবিতা: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রথমে আব্দুল লতিফ ও পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে সেই কবিতা হয় গান।

পরবর্তীতে মানুষের মুখ থেকে মুখে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গানটি; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে গানটি কণ্ঠে তুলে শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছে বাঙালিরা।

একুশের সেই অবিনাশী গান যেভাবে এল  

গানটার শক্তি কোথায়?

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় বাংলা মায়ের দামাল সন্তানরা। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চলে; শহীদ হন রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, সালামসহ আরও অনেকে।

ঢাকা মেডিকেলে ভাষা সংগ্রামী রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখে তখনকার ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরীর কলম থেকে বেরিয়েছিল, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।”

‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানের গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাষ্যে, এটি নিঃসন্দেহে একটি অমর গান। আমাদের ভাষার উপর যখন চাপ এলো, তখন উনার কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। এটি শুধু গান হিসেবেই ব্যবহার করেনি, এটি একটি আদর্শিক দিক উন্মোচন করেছিল।

“তখন প্রতিঘাত করার প্রয়োজন ছিল, সেটা গানের মাধ্যমে ওনি মিটিয়েছেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকতে ততদিন গানটি থাকবে। উনাকে শ্রদ্ধা করে যাওয়া উচিৎ আমাদের।”

পৃথিবীর সমস্ত শক্তি দিয়েও মানুষের মুখ থেকে যেমন ‘মা’ ডাক কেড়ে নেওয়া যাবে না তেমনি বাঙালির মুখ থেকে গানটি কথা কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে মনে করেন মাজহারুল আনোয়ার।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জন্মের পর কাউকে মা মা বলে ডাক শিখিয়ে দেয় না, অজান্তেই শিশুদের কণ্ঠ থেকে ‘মা’ শব্দটা উচ্চারিত হয়। সমস্ত পৃথিবীর শক্তি দিয়েও শব্দটাকে বন্ধ করা যায় না। আদর্শিকভাবে অন্তরের মধ্যে যা স্থান পায়, তা অন্তরেই রাখে মানুষ। সেইভাবে রাখার কারনেই ওনার গানটা আমাদের কাছে অনবদ্য হয়ে উঠেছে।”

মুখ থেকে মুখে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়াল

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন, যে কোনো গানের কথা ও সুরের মেলবন্ধন অসাধারণ হলে গানটা সহজেই মানুষের কাছে যায়, শ্রোতাপ্রিয় হয়। এই গানটাতে কথার সঙ্গে সুরের এতো সামঞ্জস্য হয়েছে যে কারণে আপামর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

“কাছে অবাক লাগে, ভাষা আন্দোলন আত্মত্যাগটাকে আমরা প্রতিবছরই একটা গানের মাধ্যমেই স্মরণ করি ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এটা পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না।”

আলতাফ মাহমুদের সুরে ১৯৫৪ সালে গানটি প্রভাতফেরিতে প্রথম গাওয়া হয়।

এখন প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেই অবিনাশী গান কণ্ঠে নিয়ে প্রভাতফেরিতে যায় বাংলাদেশের মানুষ।

শহীদ মাহমুদের ভাষ্যে, “এই গানটা গেয়ে আমরা যেমন ছোটবেলায় নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারে যেতাম এখনকার বাচ্চা ও সব বয়সের মানুষ সেইভাবেই গানটি করে যাচ্ছেন। গানটির স্বার্থকতা ওই জায়গায়।

“গানটা পুরোটা তো গাওয়া হয় না, প্রথম চরণগুলো গাওয়া যায়। গেঁথে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, গানের কথা ও সুর। অতি সহজ কথায় এভাবে শহীদদের স্মরণ করা, অসাধারণ ব্যাপার। সেই অসাধারণ কাজটা আবদুল গাফফার চৌধুরী করেছেন। গাফফার চৌধুরীকে একটা গানের জন্য মানুষ স্মরণ করে। হয়ত যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি জাতি থাকবে ততদিনও উনি স্মরণে থাকবে।“

গানটির প্রথম দুই লাইনই গানটির শ্রোতাপ্রিয় হয়ে ওঠার প্রধান কারণ বলে মনে করেন এ গীতিকার।

“প্রথম দুই লাইন মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। গানে যেটা আমি বলতে চাচ্ছি, সেটা যদি আমি প্রথম দুই লাইনে বলে ফেলতে পারি তাহলে সেটা মানুষকে ছুঁয়ে যাবে। সেটা এই গানের ক্ষেত্রে হয়েছে।”

আজও অমলিন কেন?

শহীদ মাহমুদ বলছেন, “এই গানের সঙ্গে আমাদের ভাষার সম্পর্ক রয়েছে। ভাষা নিয়ে আন্দোলনই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। সেই ভাষার জায়গা থেকে গানটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের স্বাধীনতা শুরুতে অবদান রেখেছে। এইজন্যই এখনও গানটি গুরুত্ববহন করবে। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, গানটি ততদিন গুরুত্ব বহন করবে।”

গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে এতটাই গেঁথে গেছে যে, সত্তর বছর ধরে একটি গানই বাঙালির প্রভাতফেরিতে বাজছে।

ঈদের গান হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানেরও রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’র মতো একুশের গান হিসেবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের বিকল্প হিসেবে কোনো গান রচিত হয়নি বলে জানান শহীদ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “এই ধরনের কিছু গান এসে যায় যখন ওগুলো কালজয়ী হয়ই, ওই ধরনের গানের পাশে আর কোনো গান দাঁড়ানো খুব কঠিন হয়ে যায়। হয়ত হবে, কিন্তু আপাতত হয়নি।”

একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরীর চিরবিদায়