শিশুদের টিকাদানে দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগতি ‘মহামারীতে ম্লান’

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুদের অন্যান্য রোগের টিকা দেওয়ার হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ বলছে, মহামারীর প্রথম বছর ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, পারটুসিস, হাম বা পোলিওর মত রোগের টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের এ দুই সংস্থার এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে টিকাদান কমেছে ৬ শতাংশ পয়েন্ট।

দক্ষিণ এশিয়ায় ৫৩ লাখের বেশি শিশু গতবছর নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ টিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা ২০১৯ সালের চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ায় ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জর্জ লরিয়া-অ্যাডজেই বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে শিশুদের টিকাদানে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করা একটি অঞ্চলকে কোভিড -১৯ এর কারণে এভাবে উল্টোরথে চলতে দেখা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।”

বিবৃতিতে জানানো হয়, ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপথেরিয়া-টিটেনাস-পারটুসিস (ডিটিপি থ্রি) টিকার তিনটি ডোজ পাওয়া শিশুর হার ছিল ৬ শতাংশ, যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৯ সালে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে তা এক ধাক্কায় ৮৪ শতাংশে নেমে গেছে।

জর্জ লরিয়া-অ্যাডজেই বলেন, মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে, এমন ভ্যাকসিনের একটি ডোজও পাচ্ছে না এ অঞ্চলের প্রায় ৪৪ লাখ শিশু। সংখ্যাটি গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের জন্য একটি ‘বিশাল ধাক্কা’।

দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই শিশুদের টিকা দেওয়ার হার কমেছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, নেপালে ডিটিপি থ্রি টিকা দেওয়ার হার ৯ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে; পাকিস্তানে কমেছে ৭ শতাংশ পয়েন্ট; ভারতে কমেছে ৬ শতাংশ পয়েন্ট।

এছাড়া শ্রীলঙ্কায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট এবং ভুটান ও আফগানিস্তানে টিকা দেওয়ার হার ২ শতাংশ পয়েন্ট করে কমেছে জানিয়ে বলা হয়, বছরের শেষ দিকে জোরালো চেষ্টায় অনেক দেশে টিকাদানের এই নিম্নমুখী হার কিছুটা কমিয়ে আনতে পেরেছে।

বিশ্বজুড়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের ৬২ শতাংশের বসবাস মাত্র ১০টি দেশে। করোনাভাইরাসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতে এরকম অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৫ লাখ, যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। অথচ আগের বছরও এই সংখ্যা এর চেয়ে ১৪ লাখ কম ছিল।

পাকিস্তানে ২০২০ সালে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা আগের চেয়ে ৪ লাখ বেড়ে ১৩ লাখ হয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “এই শিশুদের বেশিরভাগ গত বছর টিকার একটি ডোজও পায়নি, যা নির্দেশ করে যে, মহামারীজনিত কারণে টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা এবং দুর্গম এলাকার শিশুদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।”

গত দশ বছরের মধ্যে ২০২০ সালেই দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছে। কোনো টিকা না পাওয়া এই শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ, যাদের মধ্যে ৩০ লাখেরই বসবাস ভারতে।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ বলছে, হাম এখনও অনেক দেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি রয়েছে ডিপথেরিয়া ও পীত জ্বরের মত রোগের প্রাদুর্ভাব। টিকা না পাওয়া হনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় হামের টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া শিশুর হার ছিল ৯২ শতাংশ, যা ২০২০ সালে ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। হাম থেকে সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘ টিকা দেওয়ার হার ৯৫ শতাংশের উপরে রাখতে বলে আসছে।

মহামারীর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় আরও কিছু টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার মধ্যে জরায়ু ক্যান্সারের অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ‘এইচপিভি’ টিকাও রয়েছে। স্কুলে শিশু ও কিশোরীদের এই টিকা দেওয়া হয়।

টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মহামারীর কারণে ২০২০ সালে মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্যসহ অপরিহার্য অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাতেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।

মহামারীর কারণে এসব দেশের অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কর্মীকে কোভিড-১৯ মোকাবিলা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে হয়েছে। আবার কিছু পরিবার করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার কথা ভাবতে গিয়ে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে দেরি করেছে, মূল্য দিতে হয়েছে সেজন্যও।

ইউনিসেফ অনুমোদিত একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে ২ লাখ ২৮ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের প্রধান ঘাতক হল নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো রোগ। অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা সচল থাকলে এবং পরিবারগুলো স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারলে দুটি রোগই প্রতিরোধ কিংবা নিরাময় করা সম্ভব।

ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জর্জ লরিয়া-অ্যাডজেই বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোভিড-১৯ নয়, বরং শৈশবকালীন রোগই তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি, যার কারণে এ অঞ্চলে শিশুমৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।”

কোভিড- ১৯ মহামারীতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা যাতে প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়, তা নিশ্চিত করতে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার পেছনে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকারপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।