ডিমের দাম চোখ রাঙাচ্ছে পুষ্টিতে

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোর্শেদা বেগম প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখতেন। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর নিয়মিত ডিম খাওয়া হয় না তার পরিবারে।

“ডিম তো অনেক উপকারী। প্রতিদিন পরিবারের সবাই একটা করে ডিম খেতাম। এক ডজন ডিম তো ছয় জনের পরিবারে দুই দিনেই শেষ হয়ে যায়। দাম না কমলে প্রতিদিন ডিম খাওয়া সম্ভব না,” হতাশই শোনাল তার কণ্ঠ।

দেশে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ খাবার এই ডিম। ফলে ডিমের বাজার চড়লে মোর্শেদা বেগমের মত অসংখ্য মানুষের পুষ্টিতে টান পড়ে।

গত কিছু দিনে ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ পরিবারের চেয়ে আরও কম আয়ের মানুষ পড়েছেন বেশি বিপাকে।

মিরপুরের রিকশাচালক রিপন মিয়া মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে ডিমে অভ্যস্ত হলেও এখন তাতেও টান পড়েছে।

তিনি বলেন, “আগে একটা ডিমের দাম ছিল ৬-৭ টাকা। ঘরে কিছু না থাকলে একটা ডিম ভাইজা খাইয়া নিছি। এখন এক হালি ডিমের দাম ৩৮ টাকা। ডিম খামু কেমনে? সবকিছুরই দাম খালি বাড়তাছে।”

পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী বলছেন, কেউ যদি মাছ-মাংসের পরিবর্তে প্রতিদিন ডিম খান, তাহলেও তার প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হবে। কেননা ডিমে প্রায় ৬ গ্রামের মত প্রোটিন পাওয়া যায়।

“নিম্নবিত্তের মানুষ যেহেতু প্রতিদিন মাছ-মাংস পায় না, সেহেতু তাদের প্রোটিনের চাহিদা ডিম দিয়েও পূরণ হতে পারে। ইদানিং দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও হয়ত এটা প্রতিদিন খেতে পারছেন না। পুষ্টির ঘাটতিও দেখা দিতে পারে এতে।”

ডিমের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা হচ্ছে: শ ম রেজাউল  

মুরগি ও ডিমের বাজারই গরম বেশি  

শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবসের আলোচনা সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও বলেছেন, ‘সমৃদ্ধ জাতি’ গড়তে হলে পরিপূর্ণ পুষ্টিসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে হবে। ডিম এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

ডিম উপাদান যেন ব্যয়বহুল না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার কথা জানিয়ে তিনি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ডিমের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনতে পরিকল্পনা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ডিম বাজারের হালচাল

বেশ কিছুদিন ধরেই ডিমের বাজার চড়া। বিক্রেতারা বলছেন, খামারিদের কাছ থেকে তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। আর খামারিদের দাবি, মুরগীর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে এখন ফার্মের মুরগির ডিমের গড়পড়তা দাম ১০৫ টাকা ডজন। সাদা ডিমের ডজন ১০০ টাকা। তবে কোথাও কোথাও তা আরও একটু বেশি।

রাজধানীর পল্লবীর ডিম বিক্রেতা আল আমিন মিয়া জানালেন, ১১৫ টাকায় প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি করছেন তিনি।

“ডিমের দাম তো প্রতিদিনই ওঠানামা করে। আজকে বেশি, কাল আবার কম হইতে পারে। তবে মাসখানেক ধরে বাজার একটু বাড়তিই। সেজন্য কাস্টমার একটু কমই নিচ্ছে। আগে হয়ত একবারে ৩০টা কিনত, এখন ১২টা কিনছে।”

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার মো. মহসীনের দাবি, মাঠ পর্যায়ে ডিমের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দাম বেড়ে গেছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “করোনাকালে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য ঠিকমত বাজারজাত করতে না পারায় এবং বিশ্ববাজারে পোলট্রির খাবারের মূল উপাদানগুলোর অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে বাজারে যোগানটা কম। পোলট্রির খাদ্য সংকটের কারণে উৎপাদনটাও কম।”

উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেড় মাস ধরে ডিমের দাম বেড়ে গেছে জানিয়ে মহসীন বলেন, “লকডাউনের পরে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই দামটা বাড়তি।”

তার দাবি, খামারের আধুনিকায়নে প্রান্তিক পর্যায়ে খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার দরকার হলেও তারা তা পাচ্ছেন না।

“মানুষের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও সে অনুযায়ী যোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশটা যেহেতু ছোট, তাই এখানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন সম্ভব।

“ছোট খামারি, যারা দেশের ৭৮ শতাংশ ডিম উৎপাদন করে, তাদের সাথে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় কোনো আলোচনাই করে নাই। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর সমাধান করে নাই। এ কারণেই সমস্যা থেকে খামার সঙ্কুচিত হচ্ছে।”

আগামী সাত থেকে আট মাস ডিমের বাজার অস্থির থাকবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা।

“আমাদের চেয়ে ভারতে সবসময়ই ডিমের দাম কম থাকে। কিন্তু এখন আমাদের চেয়ে তাদের ডিমের দাম বেশি থাকায় এখান থেকে অবৈধ উপায়ে ডিম চলে যাচ্ছে। বিশ্ব বাজারে পোলট্রি পণ্যের দাম স্বাভাবিক না হলে ডিমের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।”

ডিম কেন অপরিহার্য খাদ্য উপাদান?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলেন, প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডিম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ডিমের কুসুম ও সাদা অংশে ৬ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়।

“ডিমের সাদা অংশের বেশিরভাগই প্রোটিন। আবার সাদা অংশ ও কুসুমে অনেকগুলো উপকারী ভিটামিন থাকে। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে।

“এছাড়া কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যেমন- কোলিন, সেলিনিয়াম, জিংক, আয়রন রয়েছে ডিমে। যেগুলো সুস্থ থাকার জন্য খুবই জরুরি।“

ডিমে থাকা কোলিন নামের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট হার্টকে সুস্থ রাখে জানিয়ে তিনি বলেন, “এটি মস্তিস্কের কার্যাবলি ঠিক রাখে। আমাদের শরীরের কোষগুলোকে সুস্থ-সবল রাখে। আমাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য কোলিনের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধেও কাজ করে।

“ডিমের কুসুমে থাকা উপাদান আমাদের দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে সাহায্য করে।”

ডিম শিশুকালের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে জানিয়ে তিনি বলেন, “পরবর্তীকালে আমাদের শরীরে যে ক্ষয় হয়, সে ক্ষয়পূরণে সহায়তা করে ডিম। আমাদের চুল, নখ, শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- লিভার, কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে।”

অ্যালার্জি না থাকলে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে প্রতিদিন কুসুমসহ ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই অধ্যাপক।

“আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় অ্যান্টিবডি তৈরিতে প্রোটিনের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। কোভিড পরিস্থিতিতে মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ডিম খাচ্ছে বেশি। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

“বেশিরভাগ কোভিড রোগীদেরই ভিটামিন ডি এর অভাব থাকে। সেই চাহিদাটা পূরণে ডিমের ভূমিকা অনেক।”

খালেদা ইসলাম বলেন, “কেউ জটিল রোগে ভুগলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ডিম খেতে পারেন। সাধারণ মানুষ যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আছে, ওজন বেশি তাদের ক্ষেত্রে দিনে একটা করে ডিম খেলে ক্ষতির কিছু নেই।

প্রাণিখাদ্যের উপকরণ ‘সয়াবিন মিল’ রপ্তানি বন্ধের দাবি  

ডিমের কেবল সাদা অংশ খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া  

“অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমের কোলেস্টেরল ভালো। সেটা শরীরে উপকার করে এবং অপকারী কোলেস্টেরল বের করে দেয়। এ কারণে প্রতিদিন একটা করে ডিম খাওয়া উচিত।”

এভারকেয়ার হাসপাতালের পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী বলেন, “ডিম একটি প্রথম শ্রেণির প্রোটিন। আমাদের দেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে প্রথম শ্রেণির এই প্রোটিন সবচাইতে ভালো। কারণ পুরো প্রোটিনটা শরীরের কাজে লাগে।

“ডিম আমাদের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ত্বক ও চুলের জন্য অনেক উপকারি। ডিমে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, ই, ডি, বি কমপ্লেক্স আছে। ফলে অনেক ধরনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে ডিম।”

তার মতে, এটি এমন প্রোটিন জাতীয় খাবার, যা তেল ব্যবহার না করেই খাওয়া যায়; যেটা মাছ-মাংসের ক্ষেত্রে সম্ভব না। 

“প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডিম প্রতিদিনের নাস্তায় খাওয়া যেতে পারে। এক বছর বয়স থেকে যে কোনো মানুষ প্রতিদিন একটা করে ডিম খেতে পারে; শুধু কিডনি রোগী ছাড়া। কারণ কিডনি রোগীদের সারাদিনের প্রোটিনটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।

“তাছাড়া সবার জন্য ডিম অনেক জরুরি। ডিমের কোলেস্টেরল হার্টকে ভালো রাখে।”