মানসিক সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে মহামারী

কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর থেকে সবকিছুতেই মন খারাপ লাগে ত্রিশোর্ধ্ব রাশেদ হাসানের; নেতিবাচক কিছু ঘটলে সহজেই ভেঙে পড়েন। ইদানিং ভয়ও কাজ করে বেশি, একটু অসুস্থ হলেই মনে হয়, আবারও বোধহয় করোনাভাইরাস ধরল!

এনজিওকর্মী রাশেদ থাকেন ঢাকার খিলক্ষেতে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেছেন, বিষণ্ণতা আর হতাশার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে তাকে।

“রাতে ঘুম হচ্ছে না ঠিকমত। কোনো কিছু মনমতো না হলে রিঅ্যাক্ট করা শুরু করি। আবার কিছুক্ষণ পরেই বিষয়টা ভুলে যাই। একটু আগে একটা কথা বলে একটু পরেই মনে থাকে না।”

চিকিৎসকরা বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করছেন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে। কোভিড থেকে সেরে ওঠা অনেকের মধ্যে যেমন এসব সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তেমনি মহামারীর দীর্ঘ ঘরবন্দি জীবনও প্রভাব ফেলেছে অনেকের ওপর।  

১৪ বছর বয়সী তন্বীকে কোভিডে ভুগতে হয়নি। কিন্তু তার মধ্যেও যে অন্য সমস্যা বাসা বেঁধেছে, তা ধরা পড়েছে দীর্ঘ বিরতি শেষে ক্লাসে ফেরার পর।

মা ফারজানা ইসলাম জানালেন, আগের মত এখন আর সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারছে না তন্বী। তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বাড়িতে বাড়তি সময় দিচ্ছেন তারা।

“অনেক দিন ঘরে থাকতে থাকতে হয়ত এটা হয়েছে। আশা করি সবার সাথে মিশলে আবার ঠিক হয়ে যাবে।”

নিকেতনের বাসিন্দা চলিশোর্ধ্ব মেহেরুন্নেসা আগেও ঘর সামলাতেন, এখনও তাই করছেন। কিন্তু মহামারীর দেড় বছর তার জীবন ধারা বদলে দিয়েছে।

এখন অল্পতেই রেগে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে তার। চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হলেও অনলাইনে বিভিন্ন পরামর্শ নিচ্ছেন তিনি।

“আগে বাইরে বের হতাম, ঘোরাঘুরি হতে, মহামারী শুরুর পর থেকে তো ভয়েই বের হই না। বুয়া বাদ দিয়েছি, কাজের চাপও বেড়ে গেছে। বিশ্রাম আর বিনোদনের সুযোগ দুটাই কমেছে। চাপটা যে বেড়ে গেছে, সেটা টের পাচ্ছি।”

মনোবিদরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বড় প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। মহামারী পরিস্থিতি যেমন নতুন রোগী তৈরি করছে, তেমনি পুরনো রোগীদের জটিলতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিলুফার আক্তার জাহান জানালেন, আগে থেকেই কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা ছিল এমন রোগী তারা এখন বেশি পাচ্ছেন।

“আগে থেকে যারা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল, ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে ছিল, তাদের মানসিক সমস্যা এখন বেড়ে গেছে। সুস্থ হতে বেশি সময় লাগছে তাদের। তাদের ভোগান্তি বেড়ে গেছে।”

মানসিক সমস্যা নিয়ে নতুন কিংবা পুরনো রোগী যারাই আসছেন, তাদের বেশিরভাগের ওপরই করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।

“বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করে কোনো সমস্যা পেলাম না। পরিবারে কোনো অশান্তি নাই, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন নাই। অথচ তাদেরও ভালো হতে সময় লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা ডিপ্রেশনে ভোগেন, তাদের সংখ্যা এখন বেশি।”

এ ধরনের সমস্যার পেছনে মানসিক চাপ কিংবা ‘স্ট্রেস’ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে নিলুফার আক্তার বলেন, কোভিডের একটা দুশ্চিন্তা মানুষের মধ্যে কাজ করছে।

“স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেশাগত দিক দিয়ে অনেকের বেতন কমে গেছে, অনেকে চাকরি হারিয়ে আমাদের কাছে আসছেন। এগুলো কোভিডের পরোক্ষ প্রভাব।”

নিলুফার আক্তার বলেন, কোভিডে আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠার পর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে, এমনও তারা পাচ্ছেন।

“করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসায় এখন মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। ভারতে উদ্ভূত করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের বিস্তারে দেশে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার সময়টায় রোগীর খুবই চাপ ছিল।”

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় দেড় বছর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল-কলেজে ক্লাস শুরু হলেও এখনো তা নিয়মিত হয়নি। সরাসরি পাঠদান বন্ধ রয়েছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, হতাশার মত মানসিক সমস্যা নিয়ে বেশি আসছে জানিয়ে এই মনোবিদ বলেন, “টিনএজ গ্রুপের মধ্যে স্কুল বন্ধ থাকায় মানসিক চাপ বেড়ে গেছে এবং তারা একটু বেশি এসেছে।”

বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি সোসাইটির সভাপতি মাহমুদুর রহমান মনে করেন, করোনাভাইরাসের ভয় এবং তা থেকে আত্মরক্ষায় সচেতন হতে গিয়ে অনেকে চাপে পড়েছেন। আক্রান্ত হওয়ার পরের ভোগান্তিও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর করোনাভাইরাস মহামারীর নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এখন মানসিক সমস্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিছু গবেষণাতেও এটি এসেছে।

“মানুষ যখন অনিশ্চয়তায় পড়ে, হতাশায় পড়ে, তখন মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। অনেকের আয়-রোজগার কমে গেছে। জীবনসংগ্রাম বেড়ে গেলে তো মানসিক সমস্যা বাড়বেই, সেটাই হয়েছে।”

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি কয়েক দফায় লকডাউনও দিতে হয়েছে সরকারকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাসা থেকেও কর্মীদের কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।

তাতে পারিবারিক ‘রুটিন ভেঙে পড়ায়’ অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যও নড়বড়ে হয়ে গেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের এই অধ্যাপক।

“বাচ্চারা রাত করে ঘুমাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠছে দেরিতে। খাওয়ার সময় ঠিক থাকছে না। লেখাপড়া করতে চাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বেশি ডিপ্রেশনে পড়েছে। মহামারীর মধ্যে ডিপ্রেশন-অ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে।

“আর একবার মানসিক সমস্যা হয়ে গেলে এগুলো চলতে থাকে। কারণ চিন্তা-ভাবনা, আচরণ বদলে যায়। অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়া পুরোপুরি সেরে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।”

কোভিড-১৯’এর মানসিক প্রভাব  

কোভিড: শরীর সারার পর মন বাঁচানোর লড়াই

কোভিড-১৯: ‘মানসিক সমস্যা তৈরি হয়’ এক-পঞ্চমাংশ রোগীর

বিষণ্নতা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ায় কোভিড: গবেষণা  

কোভিড: এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেও ভয়

মহামারীর বিধি-নিষেধ শিথিলের পর খোলা হাওয়ায় বের হওয়ার সুযোগ মিলেছে শিশুদের।

সুরক্ষা কীভাবে

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান মনে করেন, মানসিক সমস্যাকে ‘রোগ’ হিসেবে চিকিৎসা না করায় বেশি ভুগতে হচ্ছে। পারিবারিক কলহ, রাগ, ঝগড়া, সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদ, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শুরুতে মানসিক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করার ওপর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “যে মানসিকভাবে চাপে পড়েছে, তার চিকিৎসা দরকার। কিন্তু সে ধরনের চিকিৎসার জন্য তো মানুষ খুব কম যায়।

“আবার লোকে পাগল বলবে ভেবে মানসিক সমস্যার বিষয়টি অনেক পরিবার স্বীকার করতে চায় না। এটাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। মূল কারণকে উপেক্ষা করে চলা হয়।”

নাগরিকের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রেরও যে দায় রয়েছে, তা স্মরণ করে দিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, “দেশের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সবার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি কী হচ্ছে? ধনীরা ধনী হচ্ছে, গরিবরা গরিব থেকে যাচ্ছে।

“আয়ের বৈষম্য দূর করতে হবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বেকারত্ব দূর করতে হবে। জীবনে বাঁচার এবং ভালো থাকার নিশ্চয়তা আগে থাকতে হবে।”

মনোবিদ মাহমুদুর রহমান বলেন, “অপরাধ দমনে মানুষকে উৎপাদনক্ষম কাজে লাগাতে হবে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। মানুষ যেন আত্মহত্যার চিন্তা না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

“মানুষ যেন আনন্দপূর্ণ জীবন পায়, প্রতিটি বয়সী মানুষের জন্য একটি কর্মসূচি লাগবে। সেটার জন্য বাজেট লাগবে। কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ থাকলে দ্রুত তার চিকিৎসা করাতে হবে।”

মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সমস্যার দিকে না তাকিয়ে সমাধানের চিন্তা করে আনন্দময় পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। গান, চলচ্চিত্র, বই পড়া কিংবা বাগান করার মতো বিনোদনমূলক কাজে ব্যস্ত হতে বলছেন।

এছাড়া মানসিক চাপ না বাড়াতে এবং হতাশ না হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের সুস্থ রাখতে সবাইকে সহানুভূতিশীল হওয়া, ইতিবাচক চিন্তা করা এবং কাউকে অবজ্ঞা না করার তাগিদ দিয়েছেন।

“তবে এসব পরামর্শ সবার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেখতে হবে কার সমস্যা কত বেশি জটিল,” বলেন মাহমুদুর রহমান।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিলুফার জাহান বলেন, সঠিক সময়ে মানসিক রোগের যথাযথ চিকিৎসা না হওয়ায় দেশে এই সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

“যারা এখনও মানসিক রোগমুক্ত আছেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়- এমন জিনিসগুলো করতে হবে। যারা অসুস্থ আছেন, তাদের চিকিৎসা নিতে হবে।

“চিকিৎসা নেওয়ার পরও অনেকের অবস্থার অবনতি হয়, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। উপার্জন হয়, এমন কাজে তাদের জড়িত করা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।”

বংশগতভাবেও কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন জানিয়ে নিলুফার জাহান বলেন, “বাবা-মায়ের কেউ অসুস্থ থাকলে সন্তানদের মাঝে সেটা আসার সম্ভাবনা থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিবেশটা বন্ধুত্বপূর্ণ রাখতে হবে।”

জীবন-যাপনে সময় মানার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই মনোবিদ বলেন, “দিনে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো, ৭-৮ ঘণ্টা পেশাগত কাজ, বাকি সময় বিশ্রাম, বিনোদন, সামাজিক কাজ, আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নেওয়া- এগুলো প্রতিদিনের রুটিনে রাখা উচিত।

“প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াকে আমরা উৎসাহিত করি। এভাবে চললে মানসিক রোগ থেকে মুক্ত থাকা যাবে। কোনো বিষয়ে চাপ পড়লে সেটা সমাধান করতে হবে।”