ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য আছে, কিন্তু ব্যবহারকারীরাই ‘জানেন না’

হৃদরোগসহ কয়েকটি রোগের ঝুঁকি বাড়ানো ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে প্রবিধানমালা হলেও এর ব্যবহার যেখানে হচ্ছে, সেই বেকারি মালিকরাই এ বিষয়ে কিছু না জানার কথা বলছেন।

আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস। গবেষণায় শিল্পে উৎপাদিত এই তেলে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে।

ভেজিটেবল অয়েল বা উদ্ভিজ্জ তেল (পাম, সয়াবিন) যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আংশিক হাইড্রোজেনেশন করা হলে তরল অবস্থা থেকে মাখনের মতো অর্ধ-কঠিন মারজারিন বা কঠিন ডালডা বা বনস্পতি উৎপন্ন হয়।

গরু বা খাসির মাংস, দুধ, ঘি, মাখনের মতো প্রাণিজ উৎসেও ট্রান্সফ্যাট থাকে। তবে তা পরিমাণে খুবই কম।

শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস হলো ডালডা বা বনস্পতি। বাংলাদেশের বেকারিগুলোতে তেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ডালডা।

গবেষকরা বলছেন, ডালডা ব্যবহার করে তৈরি বিস্কুট, কেক, পাউরুটি খেয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে মানুষের।

বেকারি মালিকরা বলছেন, ট্রান্সফ্যাট এবং এর ক্ষতির বিষয়টি জানা নেই তাদের।

ডালডায় মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট: গবেষণায় তথ্য

ট্রান্সফ্যাট: হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও  

হার্ট দিবসের অনুষ্ঠানে ‘ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা’ দ্রুত চূড়ান্ত করার দাবি

ট্রান্সফ্যাট কেন ক্ষতিকর?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেলে ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি ২ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

তবে ডালডার মধ্যে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রারিক্ত উপস্থিতি বোঝা যায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের করা একটি গবেষণায়।

২০১৮ সালে করা ওই গবেষণায় দেশের শীর্ষ চারটি ব্র্যান্ড তীর, পিওর, পুষ্টি ও সেনার ২৪টি নমুনা নেওয়া হয়। পর্তুগালের ন্যাশনাল হেলথ ইনস্টিটিউট ফুড কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির সহায়তায় সেসব নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

এতে দেখা যায়, ২৪টি নমুনার মধ্যে মাত্র দুটিতে ২ শতাংশের কম ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে ৯২ শতাংশ নমুনায়।

নমুনা বিশ্লেষণে প্রতি ১০০ গ্রাম নমুনায় ১১ গ্রাম ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। এটা সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৬৯ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৯ গ্রাম পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতি বছর ১৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। আর প্রতি বছর সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে সৃষ্ট হৃদরোগে।

বাংলাদেশে হৃদরোগে প্রতি বছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ মারা যায়। ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে কতজন মারা গেছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে উচ্চহারে হৃদরোগ, হৃদরোগজনিত মৃত্যু, স্মৃতিভ্রংশ এবং স্বল্প স্মৃতিহানির মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ট্রান্সফ্যাটে ক্ষতির দিক তুলে ধরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,“ট্রান্সফ্যাট এক ধরনের চর্বি। এটি খাবারে বেশি থাকলে রক্তে এলডিএল (লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন) কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়।

“ট্রান্সফ্যাট খেলে এলডিএল বাড়ে, এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়লে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার বিরাট ঝুঁকি তৈরি হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, বেকারি পণ্য, ভাজাপোড়া, কেক তৈরিতে যে তেল বা ডালডা ব্যবহার করা হয় তাতে ট্রান্সফ্যাট বেশি থাকে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে এর ব্যবহার কমাতে হবে।

জানেন না বেকারি মালিকরা

বাংলাদেশ রুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, সারাদেশে বেকারির সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি।

ঢাকার তেজগাঁওয়ের মমতাজ বেকারি, ব্রাইট কনফেকশনারি, বন্ধু বেকারি এবং মহাখালীর লিজা বেকারির মালিক এবং কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ডালডা ব্যবহার করেন। তবে এতে থাকা ট্রান্সফ্যাটের ক্ষতির বিষয়টি জানেন না।

মহাখালীর লিজা বেকারির মালিক মোহাম্মদ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের বিস্কুট, পাউরুটি এবং কেক তৈরিতে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, ডালডা, বাটার অয়েল, ঘি ব্যবহার করেন। তবে যে পরিমাণ তেল ব্যবহার করেন তার ৯০ শতাংশই ডালডা।

মোহাম্মদ আলী জানান, ২০০ কেজি বিস্কুট তৈরিতে ১৩০ কেজি ময়দার সঙ্গে ৪০ কেজি ডালডা মেশানো হয়। বাকি ৩০ কেজি ডিম এবং অন্যান্য উপকরণ।

ডালডার বিকল্প থাকলেও দাম বেশি হওয়ার কারণে তা ব্যবহার করেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে ডালডা কতটুকু ক্ষতিকর জানি না। সব তেলই তো ক্ষতি করে। ডালডা বন্ধ করে দিলে হয়ত ঘি দিয়ে বিস্কুট বানাতে হবে। তখন দাম অনেক বেড়ে যাবে।”

নরসিংদীর মাধবদীর নাজমা বেকারির মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ফোর ডটকমকে বলেন, বিস্কুট ও কেক তৈরিতে ডালডা, মার্জারিন ব্যবহার করেন তিনি। তবে এগুলোর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তারা।

বাংলাদেশ রুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সভাপতি মোহাম্মদ জালাল  উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ট্রান্সফ্যাট যে ক্ষতিকর তা বেকারি মালিকদের কেউ জানায়নি। বিষয়টি তারও জানা নেই।

“ডাক্তার সাহেবরা যেটা বলছেন এই ফ্যাট ক্ষতিকর, কিন্তু আমাদের কেউ আগে অবহিত করে নাই। এর বিকল্প কী হবে, সেটাও আমাদের কেউ জানায় নাই।”

তিনি জানান, পুরো বেকারি ইন্ডাস্ট্রিতে যে পরিমাণ চর্বি ও তেল ব্যবহার করা হয় তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই ডালডা। ডালডার ব্যবহার কমাতে চাইলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।

“ডালডার ব্যবহার কমিয়ে দিলে বিস্কুট শক্ত হয়ে যাবে। তখন মানুষ তা খাবে না। বিকল্প দিলে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

আরেক সংগঠন বাংলাদেশ অটো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফেকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুর রহমান ভূইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নে দাবি করেন, বড় কোম্পানিগুলো বেকারিপণ্য তৈরি করে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে। সেখানে ডালডার পরিবর্তে পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়।

“আমাদের অটোমেটিক মেশিনে ডালডা ব্যবহার করা হয় না। আমরা পাম অয়েল ব্যবহার করি। ডালডা ব্যবহার করা হয় বেকারিগুলোতে। তারা কেক, বিস্কুট মুচমুচে করার জন্য ডালডা ব্যবহার করা করে।”

নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা কী?

খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর একটি প্রবিধানমালা প্রবর্তন করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে এই প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই প্রবিধানমালা কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্টদের জানাতে কিছুটা সময় নিয়েছেন।

“তাদের অংশগ্রহণে এই প্রবিধানটা যেন আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি সেজন্য আমরা সময়টা নিয়েছিলাম। তাদের জানানো হবে যে এই রেগুলেশনে টোটাল ফ্যাটের ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট ব্যবহার করতে পারবে না। তারাও যেন প্রস্তুতি নিতে পারে।”

মঞ্জুর আহমেদ বলেন, প্রাণিজ উৎস থেকে যে ট্রান্সফ্যাট আসে, তা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকরা হবে।

“ডালডা একটা আইটেম যেটাতে অনেক বেশি ট্রান্সফ্যাট থাকে। আমাদের রেগুলেশন চালুর হওয়ার পর ডালডা এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে ডালডায় ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট না থাকে।”

তিনি জানান, ট্রান্সফ্যাটের ব্যবহার কমাতে ঈদের পর অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক হবে। ৩১ ডিসেম্বরের পর প্রবিধানমালা কার্যকর হলে পরীক্ষায় ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।