কিশোরগঞ্জে চীনা সামগ্রী বিক্রি, চিকিৎসার নামে ‘প্রতারণা’

চীনে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারে চিকিৎসার নামে ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
মারুফ আহমেদ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জ, অক্টোবর ০৭ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- চীনে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারে চিকিৎসার নামে ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

সকল প্রকার রোগ নিরাময় করে জানিয়ে তিয়ানশি নামের এ প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসব সামগ্রী সাধারণ মানুষের মধ্যে অবাধে বিক্রি করছে।

তবে, এগুলোর জন্য সরকারের ওষুধ প্রশাসন, খাদ্য বিভাগ কিংবা বিএসটিআইয়ের কোনো অনুমোদন নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়ছেন।

এছাড়া চিকিৎসা ক্ষেত্রে ওষুধ ও সহায়ক খাবার ব্যবহারে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের প্রয়োজন হলেও তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবস্থাপত্র দেয়।

জনস্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছামতো দেয়া তিয়ানশির এসব পণ্য সাধারণ মানুষ তা কিনছে উচ্চমূল্যে।

কিশোরগঞ্জের জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য সংশ্লিষ্টরা এ ব্যবসা বেআইনি বলে জানিয়েছেন। এছাড়া তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করেন তারা।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শহীদি মসজিদের ইমাম ও জামিয়া ইমদাদীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আনোয়ার শাহ তিয়ানশি থেকে ৬৬ হাজার টাকায় একটি ম্যাজিক বিছানা ক্রয় করেন।

কয়েকশ’ পাথর বসানো ওই চাদর ব্যবহারে শরীরের ব্যাথাসহ বহু রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় বলে তাকে বলা হয়। এছাড়া ৮ হাজার টাকায় উচ্চ রক্তচাপরোধক চিরুনিও কেনেন তিনি।

কিন্তু পণ্য দুটি কিনে কোনো উপকারই পাননি। তিনি প্রতারনার শিকার হয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

একই ধরনের চাদর কিনে পরে আবার ফেরত দিয়ছেন বলে জানান কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়া কাঞ্চন।

একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জালাল উদ্দিন, কৃষি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম, শোলাকিয়া এলাকার বৃদ্ধা নীলুফা আক্তার,কাদিরজঙ্গল গ্রামের মিয়া বকস্, পুমদি গ্রামের সঞ্জিত চন্দ্র শীল এবং নীলগঞ্জ গ্রামের কিতাব আলী।

এরা তিয়ানশি থেকে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগের ওষুদ কেনেন চড়া দামে। কিন্তু ব্যবহার করে কোনো উপকার হয়নি বলে দাবি করেন।

জেলা শহরে প্রাণকেন্দ্র শহীদি মসজিদের পিছনে একটি বড় একতলা বাড়িতে অবস্থিত তিয়ানশির কার্যালয়। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি এখানে চলে রোগী দেখা, ওষুধ বিক্রি, সদস্যদের উদ্বুদ্ধকরণসহ নানা কার্যক্রম।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অনেকটা এমএলএম পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহ করে ক্রমবর্ধমান মুনাফা ও লোভনীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে মানুষকে তিয়ানশির বিপণন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। বিক্রয় কাজে দক্ষতা ও সদস্য অন্তর্ভুক্তির সাফল্য অনুযায়ী একজন সদস্য ফার্স্ট স্টার থেকে শুরু করে এইট স্টার র‌্যাংক বা তারও উপরে যেতে পারে।

র‌্যাংক অনুযায়ী পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ল্যাপটপ, বিদেশ ভ্রমণ, প্রাইভেট কার, বাড়ি, বিলাসবহুল নৌযান এমনকি বিমান পর্যন্ত রয়েছে।

জেলায় সংগঠনের সার্বিক দায়িত্ব পরিচালনা করছেন সেভেন স্টার র‌্যাংকধারী মো. জামাল উদ্দিন। রোগী দেখা, রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম তিনিই পরিচালনা করেন।

কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদীয়া মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র মো. জামাল উদ্দিনের বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার পানুর গ্রামে।

তিয়ানশির রোগ নির্ণয়ের ধরন ও ওষুধের মান সম্পর্কে জামাল উদ্দিন বলেন, “আমি কোম্পানির নিজস্ব পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় করে থাকি, যা শতভাগ নির্ভুল। এখানে চিকিৎসা গ্রহণ করে সকল রোগের নিরাময় সম্ভব এবং এখানকার ওষুধের কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।”

এ ব্যাপরে ওষুধ প্রশাসন ময়মনসিংহ অঞ্চলের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মো. ওয়াহেদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিয়ানশির এ ধরনের ওষুধ সামগ্রী বিক্রির কোনো অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারণার মাধ্যমেই এ কার্যক্রম চলছে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কিশোরগঞ্জ জেলা পরিদর্শক পূজন কর্মকার এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল মালেক তিয়ানশির পণ্যের কোনো অনুমোদন না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কিশোরগঞ্জ ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল হাই বলেন ওষুধ, খাদ্য বিভাগ ও বিএসটিআয়ের কোনো অনুমোদন ছড়া ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়া ওষুধ সামগ্রী ও ফুড সাপ্লিমেন্টের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া নিষিদ্ধ ও দণ্ডণীয় অপরাধ।

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হোসাইন সারোয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চিকিৎসার নামে অবাধে ওষুধ ও সহায়ক খাবার অবাধ ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।

“সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ছাড়া এবং উপযুক্ত চিকিৎসকের বাইরে কারো ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ধরনের বেআইনি কার্যক্রম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে,” বলেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/ডিডি/১৮১১ ঘ.