কবি ভূত

মুন্নি নবম শ্রেণিতে পড়ে। গল্পের বই পড়তে খুব ভালোবাসে সে।

তাদের স্কুলে একটা বড় লাইব্রেরি আছে। অনেক রকমের বই আছে সেখানে। রূপকথার গল্প, হাসির গল্প, ভূতের গল্প, গোয়েন্দা গল্প আরও কত কি! মুন্নি প্রতি সপ্তাহে একটা করে বই নিয়ে আসে লাইব্রেরি থেকে। এবার আনলো একটা ভূতের বই।

রাতে ঘুমানোর আগে বই পড়া মুন্নির অভ্যাস। বই পড়তে পড়তে একসময় তার ঘুম এসে যায়। সে ঘুমিয়ে পড়ে। অনেক সময় বইটা খোলাই পড়ে থাকে। আজও এমন হলো। বইটা খোলা রেখে মুন্নি ঘুমিয়ে পড়লো।

বইটা ছিল ভূতের বই। আট-দশ রকমের ভূতের গল্প আছে এতে। এমন একখানা ভূতের হঠাৎ শখ হলো বাইরে বেরিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করার। বইয়ের মধ্যে থাকতে থাকতে হাড়গুলো একেবারে কড়কড় করে ব্যথা করছে। বই থেকে বেরিয়ে এসে হাত-পা টানটান করে দু'চার মিনিট ব্যায়াম করে নিল ভূতটা। তারপর সারা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো।

ঘুরতে ঘুরতে মুন্নির পড়ার টেবিলের ওপর একটা মিছরির বয়াম দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ভূতটার জিভে জল চলে এলো। সে বয়াম থেকে একটা মিছরির দানা বের করে চেটে চেটে খাওয়া শুরু করলো। উফ্ কি শক্ত রে বাবা! তার দাঁতে কি আর সেই জোর আছে? এক দানা মিছরি খেতে খেতে কখন যে ভোর হয়ে গেল ভূতটা টেরই পেল না।

হঠাৎ খুট করে একটা আওয়াজ হতেই তাকিয়ে দেখে মুন্নি জেগে উঠেছে। এই রে, মেয়েটাতো বইটা বন্ধ করে দিল। এবার কী হবে? এবার সে ঢুকবে কী করে? মেয়েটা দেখতে পেলেতো চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে তুলবে। তারপর যে উত্তম মধ্যম পড়বে সেটা ভেবে ভূতটা সিটিয়ে গেল। মুন্নি যাতে দেখতে না পায় তাই তাড়াতাড়ি আলমারির পেছনে লুকিয়ে পড়লো।

মুন্নি ফ্রেশ হয়ে স্কুল ড্রেস পরে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় গল্পের বইটাও নিয়ে গেল। ঘরে এখন ভূতটা একা। আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এলো সে। এখন আর কিছুই করার নেই। ভূতটা তখন খাটের ওপর পা দুলিয়ে বসে মুন্নির চকলেটের বাক্সটা কোলের ওপর রেখে খেতে শুরু করলো।

মুন্নীর স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেল। পড়া এবং ঘুমের সময় ছাড়া মুন্নি এঘরে বেশিক্ষণ থাকে না। তাই সে রুমে এলো সন্ধ্যার পর। গণিত বাড়ির কাজ আছে। খাতা খুলে অংক করতে বসলো সে। হঠাৎ মনে হলো আলমারির পেছনে কিছু একটা নড়ছে। তাকাতেই চকিতে সরে গেল। মুন্নি একটু ভয় পেয়ে গেল। কে ওখানে?

আঁ-আঁমি বলতে বলতে ভূতটা আলমারির পেছন থেকে খানিকটা বেরিয়ে এলো। টিংটিঙে হাড্ডিসার ঢ্যাঙা মতো লোকটাকে দেখে মুন্নি ভয়ে চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু তার গলা দিয়ে আসলে কোন শব্দ বের হলো না। সঙ্গে সঙ্গে ভূতটা নাকি গলায় বলে উঠলো, ভঁয় পেঁয়ো নাঁ মুঁন্নি সোঁনা, আঁমি কোঁন চোঁর নাঁ, আঁমি অঁতি শাঁন্ত ভুঁত, কাঁরো ক্ষঁতি কঁরি নাঁ।

মুন্নি একটা ঢোক গিললো। এসব কি বলছে লোকটা পাগলের মতো। ভূতটা আরও বললো, বঁইয়ের ভেঁতর দিঁব্যি ছিঁলাম, কাঁল রাঁতে যঁখন বাঁইরে এঁলাম, তঁখন দেঁখি বঁইটা হাঁওয়া, তাঁইতো আর হঁলো নাঁ যাঁওয়া।

মুন্নি এবার একটু ধাতস্থ হলো। ভয়টাও একটু কমলো। ভূতটা আবার নাকি সুরে বললো, এঁকবার যঁদি বঁইটা পাঁই, তঁবে নিঁজের ঘঁরে ফেঁরত যাঁই।

মুন্নি বললো, বেরিয়ে এসো। ভূত তখন আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এলো। মুন্নি উঠে গিয়ে আলমারি  থেকে একটা লাল ওড়না বের করে দিয়ে বললো, এটা গায়ে পেচিয়ে নাও। তোমার কিম্ভুত চেহারা দেখে আমার ভয় লাগছে।

কোন প্রতিবাদ না করে ভূত ওড়নাটা পেচিয়ে একেবারে ঘোমটা দিয়ে নিল। তারপর বললো, আমি তোমার সব কাজ করে দেব। তুমি শুধু আমায় ফিরে যেতে সাহায্য কর। এই কান ধরছি আর কোনদিন বের হব না। হাড় কড়কড় করলেও না। এখানে থাকলে যে আমি না খেয়ে খেয়ে আরও শুকিয়ে যাব। চকলেট খেয়ে কি আর পেট ভরে।

মুন্নি আঁতকে উঠলো। তুমি আমার চকলেটগুলো খেয়ে ফেলেছো?

ভূতটা অপরাধীর মত বললো, তুমি রাগ করো না। এই ঘরে খাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না। তুমি চাইলে আমায় শাস্তি দিতে পার। তুমি বলো আমাকে কোন কাজটা করতে হবে? আমি করে দিচ্ছি।

মুন্নি বললো, আমার অংকগুলো করে দাও।

অ-অংক। ওরে ব্বাবা, ওটা আমি পারবো না। তার বদলে আমি তোমার জামা ইস্ত্রি করে দিতে পারি। অথবা মশারি টাঙিয়ে দিতে পারি।

ঠিক আছে তাহলে তাই কর। ভূত তখন জামা ইস্ত্রি করতে শুরু করলো।

মুন্নি জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা তোমার নাম কি? টিংকিরিটুংটাংকিংকিরিকংকা- ভূত বললো।

এই নামে ডাকবো? রেগে গেল মুন্নি।

না মানে, এটাইতো নাম আমার। সবাই এই নামেই ডাকে।

আমি ওসব টিংকিরি ফিংকিরি ডাকতে পারবো না। আমি বরং ‘লালু’ বলে ডাকবো।

ভূত খুশি হয়ে বললো, ঠিক আছে তাই ডাকো।

মুন্নি জানতে চাইলো, আচ্ছা তোমার তো অনেক ভূত বন্ধু আছে। কাকে তোমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে?

আমার একজন বাবুর্চি বন্ধু আছে। তার নামটাও অনেক বড়। তাই আর নাম বললাম না। সে খুব ভাল রান্না করে। আহা! এতো ভাল মিষ্টি বানায়। ইশ তোমাকে যদি খাওয়াতে পারতাম!

মুন্নি বললো, তোমরা সব ভূতই কি খুব ভাল? কোন দুষ্টু ভূত নেই?

লালু বললো, আছে তো। একবার কী হয়েছে জানো? একটা কবিতা সম্মেলনে গিয়েছি। সবাই স্বরচিত কবিতা পাঠ করবে সেখানে। আমি আবার একটু আধটু কবিতা লিখি। বেশ লাজুক শোনালো লালুর গলা। তো আমি একটা কবিতা লিখে অপেক্ষা করছি পাঠ করবো বলে, এমন সময় দুষ্টু ভূত জোর করে আমার কবিতাটা ছিনিয়ে নিল আর নিজের নামে পড়ে শোনালো। যা রাগ হয়েছিল আমার।

তারপর? মুন্নি খুব কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

লালু বললো, আমি তখন আরেকটা কবিতা লিখে ফেললাম। তারপর সম্মেলনে পড়ে শোনালাম,

চুরিবিদ্যা সেতো কোন ভাল বিদ্যা নয়

অন্যের লেখা চুরি করে কেউ কি বড় হয়?

নাই বা জানলো কেউ আমার পরিচয়

জানি একদিন হবেই হবে চোরের পরাজয়।

বাহ্ বেশ ভাল বলেছো তো। তারপর কী হলো?

সবাই যখন বুঝতে পেরেছিল দুষ্টু ভূত কোন কবিই নয়। তখন তাকে সম্মেলন থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেই সম্মেলনের পর আমি কয়েকজনকে অটোগ্রাফও দিয়েছিলাম। আবার লাজুক শোনালো লালুর গলা।

ঠিক তখনি মুন্নিকে রাতের খাবার খেতে ডাকলো তার মা। মুন্নি তার ব্যাগ থেকে ভূতের বইটা বের করে টেবিলের ওপর খুলে রেখে বললো, ঠিক আছে তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আমি যেন ঘরে এসে তোমাকে আর দেখতে না পাই। মুন্নি বের হয়ে গেল ঘর থেকে।

ফিরে এসে দেখলো মশারি টাঙানো হয়ে গেছে। লাল ওড়নাটা পড়ে আছে তার খাটের ওপর। মুন্নি বইটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে রাখলো। আজ বই না পড়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে।

পরদিন স্কুলে গিয়ে লাইব্রেরিতে বইটা ফেরত দেওয়ার সময় বইয়ের নামটা একবার দেখে রাখলো মুন্নি, ‘কবি ভূত’। মনে মনে ভেবে রাখলো শিঘ্রই বইটা কিনে তার ব্যাক্তিগত সংগ্রহে রাখতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!