সন্তানকে কার কাছে রেখে অফিসে যাবেন?

অনেক দম্পতি আছেন যারা দুজনই কর্মজীবী। চাকরি বা জীবিকার কারণে দিনের বড় একটা সময় বাসার বাইরে থাকেন তারা। এক্ষেত্রে যাদের সন্তানের বয়স কম সেইসব মা-বাবা দুশ্চিন্তায় পড়েন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীকে চাকরি ছেড়ে বাসায় থাকতে হয়। মা হওয়ার পর কর্মস্থল থেকে বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান মায়েরা। বিনা বেতনে ছুটি নিতে পারেন আরও কিছুদিন। কিন্তু এরপর কী হবে সে চিন্তায় অস্থির থাকেন মায়েরা।

এ অবস্থায় অনেক মা-বাবা গৃহকর্মী খোঁজেন। সন্তানকে গৃহকর্মীর কাছে রেখেও চিন্তার শেষ নেই। সন্তান ঠিকঠাক খেয়েছে তো? কোনো বিপদ হলো না তো? আপনি হয়তো সন্তানকে বড় করতে চান অন্য এক উপায়ে। অথচ কাজের স্বার্থে ছোট সন্তানকে বাড়িতে রেখে যেতে হবে গৃহকর্মীর কাছে।

আপনি হয়তো কোনভাবে একজন গৃহকর্মী জোগাড় করেন এবং তার কাছে সন্তানকে রেখে নিজের কাজে মনোযোগ দেন। আসলেই কি আপনি তখন নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন? সম্ভবত না। আবার কেউ কেউ হয়তো যৌথ পরিবারে থাকেন। আগে যৌথ পরিবারগুলোতে দাদা-দাদি, নানা-নানিরা দেখেশুনে রাখতেন সন্তানদের। কিন্তু বিশেষ করে শহর অঞ্চলে বর্তমানে অনেক পরিবারে এ সুযোগটা থাকে না।

আবার তাদের কাছেও অনেক সময় মায়েরা তাদের সন্তানকে রেখে নিশ্চিন্ত মনে কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে অফিস থেকে ফিরে যখন কোন মা দেখেন যে তার সন্তান সেই সকালে পরানো ডায়াপারটা এখনও বিকেল পর্যন্ত পরে আছে, স্বাভাবিক কোনো মায়েরই মন ঠিক থাকবে না। অথবা বাড়িতে ঢুকেই দেখলেন যে আপনার শাশুড়ি অথবা মা যে কিনা আপনার সন্তানের দেখাশোনা করেন সে আপনার সামনে সন্তান সম্পর্কে হাজারো অভিযোগ নিয়ে হাজির হলেন- 'তোমার বাচ্চা খায় না, তোমার বাচ্চা ঘুমায় না, তোমার বাচ্চা আমার কোন কথা শোনে না, এই বাচ্চা আমি কীভাবে সামলাবো আমি জানি না, তোমাদের বাচ্চা বাবা তোমরাই দেখো, মেয়ে মানুষের বাচ্চা রেখে বাইরে কাজ করা ঠিক না…' ইত্যাদি।

বিশ্বস্ত কোন গৃহকর্মীর কাছে সন্তান রেখে গিয়েও দেখলেন তার শরীর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ঠিকমতো খাচ্ছে না, সারাক্ষণ কোনো না কোনো অসুখে ভুগছে, দেখা দিচ্ছে অপুষ্টি। আবার সন্তান যখন কথা বলছে তখন ঠিক আপনার বাসার গৃহকর্মী যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষাতে কথা বলছে। কিংবা আপনি বাড়িতে ফিরে আপনার ছোট্ট কথা না বলতে পারা শিশুর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দেখছেন লাল লাল দাগ হয়ে আছে। আপনি বলতে পারবেন না এ দাগগুলো কোথা থেকে এলো। হতে পারে আপনার অগোচরে আপনার শিশু গৃহকর্মীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছে, হয়তো না।

অনেক কর্মজীবী মা ডে-কেয়ার সেন্টারে তার সন্তানকে রেখে কাজে যান। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ডে-কেয়ার সেন্টার এখনও অপ্রতুল। আবার বাংলাদেশে এখনও কর্মজীবী নারীদের ভেতর সন্তানকে ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখার ব্যাপারে অনীহা দেখা যায়। অনেক ডে-কেয়ার সেন্টার শুধু ব্যবসায়িক চিন্তাকে কেন্দ্র করে তৈরি, সেক্ষেত্রে কিছু কিছু দিক খেয়াল রাখতে পারেন-

১ .একটি ভালোমানের ডে-কেয়ার অবশ্যই সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত হবে।

২. ডে-কেয়ারে যারা কেয়ারগিভার হবেন তারা সবাই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে।

৩. সারাদিন সন্তান কী কী খাবে এবং কী কী খেলবে এবং কী কী অ্যাক্টিভিটিস তার হবে সেগুলোর একটা তালিকা আপনাকে দেওয়া হবে।

৪. সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৫. যে কোন সময় সন্তানের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা অথবা দেখা করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৬. এক বা একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যদি শিশুদের কোন ধরনের সমস্যা হয় তাহলে যেন তাৎক্ষণিক সেই সমস্যার সমাধান দিতে পারেন।

৭. শিশুদের শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে ডে-কেয়ার সেন্টারকেই।

এছাড়া একটা ডে-কেয়ার সেন্টারের জানতে হবে একটা শিশুর মা-বাবার কী কী চাহিদা আছে এবং তা পূরণ করার ক্ষমতা তাদের আছে কিনা। শুরুতে সব ধরনের কথা খোলাখুলি আলোচনা করে নিতে হবে। যেহেতু একটা ডে-কেয়ার সেন্টার নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে সেবা দিয়ে থাকে, তাই তাদের উচিত সবকিছু খোলামেলা আলোচনা করে নেওয়া।

মা-বাবার উচিত সন্তান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ডে-কেয়ার সেন্টারকে দেওয়া। যেমন আপনার সন্তান কী পছন্দ করে, কী কী খায়, কোনটা তার প্রিয় খেলনা, সন্তানের কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কিনা ইত্যাদি। যাতে তারা আপনাকে সঠিক সেবা দিতে পারে, জবাবদিহিতা থাকে এবং যদি কখনও ভুল হয় তাহলে আপনি প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিতে পারেন।

ডে-কেয়ার সেন্টারের নামে অনেক গুজব রয়েছে, তাই যাচাই বাছাই করে নিন, সব সংস্থা এক নয়। আমাদের দেশে এখন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অফিসের সঙ্গে ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা রাখছেন। তারা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সন্তানকে আপনার ক্যারিয়ারের অন্তরায় না ভেবে নিজের শক্তি ভাবুন।

আবার অনেক গৃহিণী মায়েরা সারাদিন কাজ শেষে বাসায় থাকেন, তারাও চাইলে প্রতিবেশীদের ‘বেবি সিটিং’ করে অর্থ উপার্জন করতে পারেন, এটা বিদেশে হর-হামেশাই হয়। এক্ষেত্রে নিজেদের ভেতর একটি সমঝোতা-নামা লিখিয়ে নিয়ে কাজ শুরু করা যেতে পারে। একে বলে ‘মাদার টু মাদার হেল্প’। এটি অনেক সম্মানজনক কাজ। বিদেশে ‘বেবি সিটিং’ মায়েদের অনেক চাহিদা। 

লেখক পরিচিতি: প্যারেন্ট এডুকেটর, ওমেন উইদাউট বর্ডারস

এ লেখকের আরও লেখা

শিশুর বই পড়ার অভ্যাস কীভাবে গড়বেন  

শিশুর জেদ কীভাবে সামলাবেন  

শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে ১৭ পরামর্শ  

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!