মিষ্টান্ন খাওয়ার অভ্যাস থেকে পেটে মেদ

ছবি: রয়টার্স।
‘ডেজার্ট’য়ে শুধু চিনি নয় সঙ্গে থাকে মাখন, তেল ও চর্বি।

পেটের চর্বি ঝরানো এবং তাতে পুনরায় চর্বি জমা ঠেকানো বেশ কঠিন।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা আর নিয়মিত শরীরচর্চার পরও পেটের চর্বি যেন যেতেই চায় না। তখন হয়ত প্রশ্ন জাগে ভুলটা কোথায় হচ্ছে?

সম্ভাব্য সমস্যার মূল হতে পারে ‘ডেজার্ট’ খাওয়ার অভ্যাস।

পুষ্টিবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ অ্যামান্ডা সেভিলা।

সেই প্রতিবেদনের আলোকে জানানো হল বিস্তারিত। 

অস্বাস্থ্যকর চর্বির মাত্রা বেশি: ‘ডেজার্ট’ খাওয়ার সময় বেশিরভাগ মানুষ চিন্তিত থাকেন তাতে থাকা চিনির পরিমাণ নিয়ে। তবে ওই খাবারেই যে কি পরিমাণ চর্বি থাকে সে ব্যাপারে তুলনামুলক চিন্তা থাকে কম।

সেভিলা বলেন, “ডেজার্ট’ খাওয়ার সময় আপনি হয়ত ভাবছেন শুধু তো ‘কার্বোহাইড্রেট’ই খাচ্ছি। কিন্তু ওই খাবারে থাকা মাখন, তেল থেকে চর্বি পেটে যাচ্ছে। আর সুস্বাদু ওই খাবারগুলো খাওয়ার সময় খুব সহজেই পরিমাণের ব্যাপারটা ভুলে যাওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “নারিকেল তেল, ‘আভোকাডো’ ইত্যাদির চর্বি হয়ত স্বাস্থ্যকর, তবে সেটাও পরিমাণের বেশি খেলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আপনার লক্ষ্য হবে ‘ট্রান্স ফ্যাট’ কমানো। যার উল্লেখযোগ্য উৎস হল ‘হাইড্রোজেনেইটেড’ তেল ও মাখন। এই ধরনের চর্বি একদিকে যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় অপরদিকে শরীরে প্রদাহ হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ায়। ‘ডেজার্ট’ ধরনের খাবারে খুব সুক্ষ্মভাবে লুকিয়ে থাকে এই ‘ট্রান্স ফ্যাট’ এবং আশঙ্কাজনক মাত্রায়।”

প্রাকৃতিক মিষ্টি কম, প্রক্রিয়াজাত চিনি বেশি: এই ব্যাপারটার সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষগুলো বেশ পরিচিত হলেও প্রক্রিয়াজাত চিনি যে কতভাবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে তার হিসেব রাখাটা মুশকিল।

আখের চিনি, ‘মোলাসেস’, সাদা চিনি, উচ্চমাত্রার ‘ফ্রুক্টোজ’যুক্ত কর্ন সিরাপ ইত্যাদি সবই প্রক্রিয়াজাত চিনি।

সেভিলা বলেন, “প্রক্রিয়াজাত চিনি মানুষকে আসক্ত করে ফেলে। কারণ মস্তিষ্কে অনেকগুলো সুখকর অনুভূতি সৃষ্টিকারী ইন্দ্রিয়ে এটি আলোড়ন তৈরি করতে পারে। তাই শরীরের চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ার পরও মানুষ সেই অনুভূতি ফিরে পেতে বার বার তা গ্রহণ করতে থাকে।”

‘অপরদিকে প্রক্রিয়াজাত চিনি সরাসরি পেটের ওপর প্রভাব ফেলে। শরীরে চর্বি জমায় সহায়ক ভূমিকা রাখে এ ধরনের চিনি। চট করেই বাড়িয়ে দিতে পারে রক্তে ‘ইনসুলিন’য়ের মাত্রা। আর ‘ইনসুলিন’য়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকেই শরীর চর্বি সংরক্ষণের ইঙ্গিত মনে করে।”

ভুল সময়ে ‘ডেজার্ট’: শহরের বেশিরভাগ মানুষই রাতের খাবার খায় দেরিতে। আর তার কিছুক্ষণ পরই ঘুমাতে যায়।

আবার সুস্বাদু ‘ডেজার্ট’টা খাওয়া হয় আরও আয়েশ করে সময় নিয়ে। ফলে ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে রাতের খাবার আর তার কিছু সময় পর খেলেন ‘ডেজার্ট’।

সেভিলা বলছেন, “ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে ‘ডেজার্ট’ খাওয়ায় দুটি ঘটনা সৃষ্টি হল। প্রথমত শোবার আগে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত চিনি খেলেন। আর দ্বিতীয়ত, এত খাবার হজম করতে শরীর যখন ব্যস্ত থাকবে তখন আপনার প্রশান্তির ঘুম আসবে না। আর ওজন কমার জন্য ঘুম অত্যন্ত জরুরি অংশ।”  

সেভিলা আরও বলেন, “সারাদিন ক্যালরি গুনে খাওয়ার পরিশ্রম এখানে বৃথা হয়ে যেতে পারে নিমেষেই। কারণ দিনের শেষ অংশে এসে ‘ডেজার্ট’ খাওয়ার সময় আপনার মনবল দুর্বল হওয়া খুবই সহজ।”

আবেগতাড়িত খাওয়া: ওজন কমানোর চিন্তা থাকুক আর না থাকুক, আবেগের বশবর্তী হয়ে খাবার গ্রহণের মাত্রা ভুলে যাচ্ছেন কি-না সেই চিন্তাটা সবার থাকা উচিত।

সেভিলা বলেন, “মনকষ্ট, মানসিক চাপ ইত্যাদি সামলাতে যে খাবারগুলো বেছে নেওয়া হয় সেগুলো সিংহভাগই হয় প্রক্রিয়াজাত চিনিতে ভরপুর। কারণ ওই চিনি আপনাকে সাময়িক আনন্দ দেয়। ফলে তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে উঠে। আর সেসময় ওজন কমানো, ক্যালরির হিসেব আপনার মাথার আসবে না। আর আসলেও আপনি বলবেন, চুলোয় যাক স্বাস্থ্য।”

ভোজ্য আঁশের ঘাটতি: পেটের চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে শরীরের ভোজ্য আঁশের চাহিদা মেটানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওজন কমানো আর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আঁশ সরাসরি সম্পৃক্ত। এই ভোজ্য আঁশ শরীরের ভেতরে ‍পুষ্টি উপাদানগুলো ভাঙে, পেট ভরা রাখে লম্বা সময়। আর অন্ত্রে থাকা ‘মাইক্রো ব্যাক্টেরিয়া’ সুস্থ ও সক্রিয় রাখে।

এজন্য প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিয়ে যথাসম্ভব সরাসরি প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসা খাবার বেশি খাওয়া উচিত। কারণ খাবার তার প্রাকৃতিক রূপে শরীর প্রবেশ করলে তা শরীর সহজে হজম করতে পারে।

অপরদিকে প্রক্রিয়াজাত খাবারে ভোজ্য আঁশ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

জোর করে খাওয়া: কোনো খাবার প্রিয় হলে তা পেটে জায়গা না থাকলেও জোর করে খাওয়ার দোষে দোষী করা যাবে হয়ত পৃথিবীর সবাইকেই। এই জোর করে খাওয়াটা শরীরের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।

প্রয়োজনে ‘ডেজার্ট’ পরের বেলায় খান। আবার এখনই খেলে যে পুরোটাই খেতে হবে সেটাও তো জরুরি নয়। সামান্য খেয়ে তুলে রাখুন, কয়েক ঘণ্টা পর কিছু ক্ষুধা লাগলে খান।

ভিন্নতা থাকা চাই: চর্বি, প্রক্রিয়াজাত চিনি ও কার্বোহাইড্রেইট ইত্যাদি ছাড়াও ‘ডেজার্ট’ হতে পারে।

সেভিলা বলেন, “আপনি যদি মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন, তবে ‘ডেজার্ট’য়ে ফল বেছে নিতে পারেন। ফল হল প্রকৃতির দেওয়া ‘ক্যান্ডি’, যেখান থেকে মিলতে পারে ভোজ্য আঁশ, আমিষ, সামান্য চর্বি, ভিটামিন ও খনিজসহ অসংখ্য পুষ্টি উপাদান।”

“ফল থেকে সন্তুষ্টি না আসলে পুরোপুরি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি ‘ডেজার্টে’য়ের ওপর জোর দিন। চিনির বদলে মধু আছে এমন ‘ডেজার্ট’ বেছে নিন। রান্নার জন্য নারিকেল তেল ব্যবহারের চেষ্টা করুন।

আরও পড়ুন

পেটের মেদ কমানোর খাবার  

পেটে মেদ জমার অন্য কারণ  

পেটের মেদ কমিয়ে ভালো থাকুন  

পেটের মেদ না কমার কারণ  

মেদ কমানোর সহজ পন্থা