সকালের নাস্তায় প্রদাহনাশক খাবার

সকালের নাস্তাটা কেমন হল সেটার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে সারাদিন দেহ-মন কেমন যাবে।

এসময় স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়াটা সহজ। কারণ ইচ্ছাশক্তি থাকে। তবে কোনো খাবারগুলো এসময় স্বাস্থ্যকর পছন্দ?

চারদিকে শতসহস্র স্বাস্থ্য উপদেশের ভীড়ে দ্বিধান্তিত হয়ে যাওয়াটা খুবই সম্ভব। এক্ষেত্রে যে খাবারগুলো প্রদাহ কমানোর ক্ষমতা রাখে সেগুলো হতে পারে নিরাপদ পছন্দ।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘রিয়েল নিউট্রিশন’য়ের প্রতিষ্ঠাতা এমি শাপিরো বলেন, “প্রদাহ হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া, যা দেখা দেয় তখনই যখন কোনো কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেন, “এসময় শরীর বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদান, ‘অ্যান্টিবডি’, ‘প্রোটিন’ নিঃসরণ করে। এতে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। তবে এমন প্রদাহ যদি লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে তবে কোষ ও অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

সব প্রদাহই যে খারাপ তা কিন্তু নয়। কারণ প্রদাহ শরীরকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোরই একটি প্রতিক্রিয়া।

‘ফিনিক্স ভিগান ডায়েটিশিয়ান’য়ের কর্ণধার রায়ান গেইগার বলেন, “প্রদাহ বা ‘ইনফ্লামেইশন’ দুই ধরনের, ‘অ্যাকিউট’ আর ‘ক্রনিক’।”

শরীরের কোনো স্থানে কেটে গেলে সেখানে হয় ‘অ্যাকিউট ইনফ্লামেইশন’। আর ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ হল, অনেকদিন ধরে চলতেই থাকে।

এ থেকে দেখা দেয় অবসাদ, ব্যথা, অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা। কারণ দীর্ঘদিনের প্রদাহ শরীরের সুস্থ কোষের ক্ষতি করে।

আর ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ থেকে সৃষ্টি হয় অন্যান্য ‘ক্রনিক’ বা দূরারোগ্য ব্যধি। যেমন- হৃদরোগ, বাত ইত্যাদি।

সকালে প্রদাহনাশক খাবার খাওয়ার উপকারিতা

শাপিরো বলেন, “খাবারের ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’, ভিটামিন, খনিজ উপাদানগুলো প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখে। আবার খাবারে যদি চিনি, প্রক্রিয়াজাতকরণের উপাদান, রাসায়নিক উপাদান বেশি থাকে তবে তা প্রদাহ বাড়িয়ে দিতে পারে।”

গেইগার বলেন, “সকালে পুষ্টিকর খাবার খেলে আপনার কর্মশক্তি, জ্ঞানীয় ক্ষমতা বাড়বে, শরীরে একটা ফুরফুরে ভাব থাকে। পাশাপাশি অন্যান্য বেলাতেও স্বাস্থ্যকর খাবারই আপনি বেছে নেবেন।”

“আবার দিনের শুরুতেই যদি চিনিতে ভরপুর প্রক্রিয়াজাত ‘কার্বোহাইড্রেইট’ ধরনের খাবার খান তবে রক্তে শর্করার মাত্রা প্রথমে বেড়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর কমেও যাবে হুট করে। ফলে সারাদিন ক্ষুধাভাব, কি যেন খাই এমন মনে হবে।”

তাই সকালটা শুরু হোক প্রদাহনাশক নাস্তা দিয়ে।

ওটমিল, বাদাম

শাপিরো বলেন, “ওটমিল হল ‘গ্লুটেন’ মুক্ত শষ্য-জাতীয় খাবার যাতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভোজ্য আঁশ। এটি কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে, বজায় রাখবে রক্তে শর্করার ভারসাম্য।”

বাদাম, বিশেষ করে কাঠাবাদাম হজমক্রিয়াকে মন্থর করে এবং যোগায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। আর এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টও মেলে। এই খাবারে মিষ্টি স্বাদ আনতে জামজাতীয় বিভিন্ন ফল যোগ করতে পারেন। জাতজাতীয় ফল যেমন, ‘রাস্পবেরি’, ‘ব্লুবেরি’, ‘গোজি বেরি’ ইত্যাদিতে থাকে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ যা প্রদাহ কমায়।

ফলের সঙ্গে আমন্ড বাটার

শাপিরো বলেন, “যে কোনো আস্ত ফলে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট মেলে যা শরীরকে মুক্তমৌলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। এতে ভোজ্য আঁশও থাকে যা শরীর থেকে বর্জ্য অপসারন করে।”

তিনি পরামর্শ দিতে গিয়ে আরও বলেন, “এর সঙ্গে বাদামের মাখন যোগ করতে পারেন, বিশেষ করে আমন্ড বাটার। এতে আছে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। সবই শরীরকে রোগবালাই থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক।”

টক দই আর ফল

শাপিরোর ভাষায়, “টক দইয়ের স্বাস্থ্যকর ব্যাক্টেরিয়া প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখে, হজমে সাহায্য করে এবং দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখে। এর সঙ্গে যদি ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’য়ের ভরা ফল খাওয়া যায় তবে আপনার সকালের নাস্তা হবে শক্তিশালী। সাধারণ এই নাস্তা থেকে মিলবে প্রোটিন, আঁশ আর অসংখ্য পুষ্টি উপাদান।”

ডিম আর সবজি

“ডিমে আছে ভিটামিন ডি, প্রোটিন, ওমেগা থ্রি আর ‘চোলিন’। প্রোটিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে প্রদাহকেও নিয়ন্ত্রণে রাখে। তার যোগ করুন সবুজ শাকসবজি যাতে নেই কোনো চিনি আর আছে ভরপুর আঁশ,” বলেন শাপিরো।

গেইগার বলেন, “ডিম যারা খান না তারা ‘টফু’ বেছে নিতে পারেন, সঙ্গে যোগ করতে পারেন হলুদ। হলুদে আছে ‘কারকিউমিন’ নামক সক্রিয় উপাদান, যার প্রদাহনাশক গুণাগুণ অনন্য।”

প্রোটিন ভরা স্মুদি

কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবেন তা নিয়ে যদি সংশয় বাঁধে। তবে সহজ উপায় হলো সবগুলো এক করে স্মৃদি বানিয়ে ফেলা।

শাপিরো বলেন, “ফল, সবজি, পানি সঙ্গে চিনি নেই এমন যেকোনো বাদামের দুধ একসঙ্গে ‘ব্লেন্ডার’য়ে নিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন স্বাস্থ্যগুণে ভরপুর এক গ্লাস স্মুদি। আঁশ, ভিটামিন, খনিজ, ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’, ওমেগা থ্রি সবই মিলবে ওই এক গ্লাস থেকে।”

গেইগারের পরামর্শ হলো, “সঙ্গে সুযোগ থাকলে অ্যাভোকাডো যোগ করা নিতে পারেন। এতে স্মুদিতে ‘ক্রিম’-জাতীয় স্বাদ আসবে আর সকল পুষ্টি উপাদান আরও শক্তিশালী হবে।”

অ্যাভোকাডোতে আছে ‘ক্যারোটিনয়েড’ আর ‘টোকোফেরলস’। দুটোই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে অত্যন্ত উপকারী।

আরও পড়ুন

ওজন কমাতে স্বাস্থ্যকর বিকল্প খাবার  

যেসব খাদ্যশস্য ওজন কমাতে সহায়ক  

স্বাস্থ্যকর অভ্যাস থেকে প্রদাহ