একাকী জীবনেও সুখী হওয়া যায়

ছবি: রয়টার্স।
যুগলবন্দী প্রয়োজনীয় মনে করার ভাবনা বহুশতকের পুরানো। তবে যুগের বিবর্তনে সেই ধারা পাল্টাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘এম্পাওয়ার ইওর মাইন্ড থেরাপি’র মানসিক স্বাস্থ্য-বিষয়ক পরামর্শদাতা পলা ফ্লিডারমাউজ বলেন, “আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন হয়ত তার নিজেরই কোনো সমস্যা আছে কিংবা সম্পর্কে না জড়ালে জীবনের পরিপূর্ণভাবে সুখী হওয়ার কোনো উপায়ই নেই। এই ধারণার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে জুটি বাঁধার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক চাপ।”

রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেন, “তবে সবকিছু উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত একা থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেও জীবনের সার্থকতা আছে। আর মানুষ ক্রমেই তা উপলব্ধি করছে।”   

একাকী জীবন বেছে নেওয়ার পেছনে নানান কারণ থাকে। হতে পারে তিক্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত পছন্দ, কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া ইত্যাদি।

কারণটা যাই হোক মনে রাখতে হবে, একা থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও আপনি একা নন, অনেকেই আপনার মতোই একা থাকতে চান।

একাকী জীবনেও কিছু সম্পর্ক থাকে

মানুষ সামাজিক জীব একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। জুটি বাঁধাকে ‘না’ বললেও আপনার পরিবার, আশপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে কিছু সামাজিক সম্পর্ক থাকতেই হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

এজন্য পরিবার ও বন্ধুমহলের সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার সম্পর্ক থাকা জরুরি।

পলা ফ্লিডারমাউজ বলেন, “যে মানুষগুলো আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেই মানুষগুলোর জন্য সময় বের করুন। ফোনে কিংবা সরাসরি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। সম্ভাব্য জুটির সঙ্গে ‘ডেট’য়ে যাওয়ার আগ্রহ না থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে তো যেতেই পারেন। সেটা আপনার জন্যই আনন্দদায়ক হবে।”

জীবন থেকে কী চান?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্যা ওয়ার্কার হুইসপারার’য়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেচেল ইভান্স বলেন, “প্রতিটি মানুষের জীবনের কিছু চাওয়া থাকে, যা পরিণত হয় জীবনের লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাড়নাই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অবশ্যই আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আপনি একাই যথেষ্ট, জুটি বাঁধা জরুরি নয়।”

তিনি আরও বলেন, “লক্ষ্যে পৌঁছানো ও সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কতটুকু অগ্রগতি হল তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। জীবনে কী অর্জন করলেন, কী শিক্ষা পেলেন, কোন কাজে আপনি পটু, কোন কাজটা আপনার কলেবরের বাইরে সেই বিষয়গুলো মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। সবকিছুর মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল কোন কাজটা আপনাকে আনন্দ দেয় সেটাকে খুঁজে বের করা। এই দিকগুলোর আলোকে আগের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে।”

ইভান্স আরও বলেন, “এতকিছুর মাঝে ভাবনার খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। এভাবে সাজাতে পারেন ভাবনাগুলোকে, এই বছর স্বাস্থ্য, কর্মজীবন, সামাজিক জীবন, বন্ধুত্ব, ভ্রমণ এই বিষয়গুলোতে আপনি কী অর্জন করতে চান? আবার এই বিষয়গুলোকে আপনার নিজস্ব গুরুত্বের মাত্রা অনুযায়ী সাজাতে হবে। একা থাকার একটা মজার বিষয় হল কারও জন্য আত্মত্যাগের প্রয়োজনীয়তা নেই।”

নিজের শখগুলোর চর্চা

প্রেম কিংবা দাম্পত্য জীবন বজায় রাখতে সময়, আবেগ, শক্তি সবকিছুই খরচ করতে হয়। এখন সেই সম্পর্ক না থাকলে হাতে থাকলো বাড়তি সময়। সেই সময়ে অলস বসে থাকলে একাকিত্ব গ্রাস করতে বাধ্য।

ফ্লিডারমাউজ বলেন, “এই সময়গুলোতে একসময় প্রচণ্ড ভালোবাসতেন কিন্তু সময়ের অভাবে চর্চা করা হয়নি এমন শখগুলোর দিকে মনযোগ বাড়ান। এটা যে কোনো কিছুই হতে পারে। খেলাধুলা, রান্না, ছবি আঁকা, লেখালেখি ইত্যাদি।”

“এই শখের কাজগুলো থেকে নতুন সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হবেন যাদের শখ আপনার শখের সঙ্গে মেলে। একই শখ পোষণ করা এই মানুষগুলো সঙ্গেও সুন্দর একটা সময় কাটতে পারে।”

বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার্থে

‘হিউম্যান পোটেনশিয়াল এক্সাপার্ট’ এবং ‘দ্য রয়েল শামান ডটকম’য়ের প্রতিষ্ঠাতা মাখোসি নেজেসার বলেন, “জীবদ্দশায় কিংবা মরনোত্তর, একজন ব্যক্তির জীবনের উদ্দেশ্য আর সমাজে তার পরিচয়, এই বিষয়গুলো অনেকের কাছে অবহেলিত। অনেকেই সন্তান লালনপালন আর জীবনসঙ্গীকে তার জীবনে চলার পথে সহযোগিতা করার মাঝেই জীবনের অর্থ খুঁজে নেন। তবে এর বাইরে মানবসভ্যতা ও পৃথিবীর উন্নয়নের জন্যও জীবনের কিছু করে যাওয়ার চেষ্টা করে যেতে পারেন।”

“এজন্য আপনার মন মানসিকতার সঙ্গে মেলে এমন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে, সেসব প্রতিষ্ঠান কিংবা দল খুঁজে বের করুন। বড় অঙ্কের অর্থ দান করতে না পারলে যে কিছুই করা হল না, এমনটা ভাবলে ‍ভুল হবে। সেচ্ছাসেবক হিসেবে তাদের সঙ্গে কাজ করুন, সময় দিন।”

নিজের যত্ন নেওয়া

যখন একাকী জীবন পার করার সিদ্ধান্ত নেবেন তখন এটাও মেনে নিতে হবে যে আপনাকে পানি পানের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না। তাই নিজের যত্ন নেওয়া অসংখ্য উপদেশগুলো নিজেই নিজেকে দিতে শিখতে হবে।

ফ্লিডারমাউজ বলেন, “প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের যত্ন নেওয়া প্রাধান্য দেওয়া। আর যদি কেউ একাকী জীবন বেছে নেন তবে নিজেকে কীভাবে প্রাধান্য দেবেন সেটার মাত্রা নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে।”

প্রিয় রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া, পার্লারে যাওয়া, ভালো জামাকাপড় পরা, সাজগোজ, বেড়াতে যাওয়া, ব্যায়াম ইত্যাদি সবই হতে পারে নিজের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি।

 

আরও পড়ুন

আপনি একাকী! কারণ...    

ভ্রমণে যখন একা  

একাকিত্ব থেকে হৃদরোগ  

বাজে জীবনসঙ্গী হওয়ার ৭ লক্ষণ  

নিঃসঙ্গতা যখন মরণ ফাঁদ  

মানসিকভাবে উদাসীন সঙ্গীর লক্ষণ