ভারতীয় তরুণের বাংলাদেশে সাড়ে তিনশ মাইল সাইকেল সফর

‘নিরাপদে চালান, জীবন বাঁচান’- এই মন্ত্র ছড়িয়ে দিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক তরুণ বাইসাইকেল চালিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে গেছেন।

গেল শীতে বাংলাদেশে এসে ও ফিরতি পথ মিলিয়ে ৫৬৫ কিলোমিটার অর্থাৎ সাড়ে তিনশ মাইল পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁতে থাকেন দিব্যেন্দু ঘোষ। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণের সাইকেলের প্রতি ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। ‘সেইফ ড্রাইভ, সেইভ লাইফ’ স্লোগানে সাইকেলে বাংলাদেশ-ভারতের পতাকা লাগিয়ে গত বছর ডিসেম্বরের শীতে সেই ভ্রমণের গল্প বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন দিব্যেন্দু।

এই দ্বিচক্রযান চালানোর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মাথার মধ্যে একটা চিন্তা আসল যে সাইকেল থেকে তো দূষণ হয় না। আর মোটরবাইক যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে, দূষণ যেভাবে বাড়ছে… বাংলা তো আর বাংলা থাকছে না।

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

“এভাবে যদি মোটরবাইক বেড়ে যায়, ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে মানুষ; প্রত্যেক দিন পথে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।”

নিজ লোকালয়ের মানুষকে সচেতন করবেন ভেবে সাইকেল নিয়ে পথে নেমে পড়েন বনগাঁর এই তরুণ।

“আমি সাইকেল নিয়ে আমার শহর থেকে কাছাকাছি কুড়ি-ত্রিশ কিলোমিটার রাইড দেওয়া শুরু করি।”

দিব্যেন্দু বলেন, “আমি এক দিনে (গত নভেম্বরে) সুন্দরবন ঘুরে এলাম। আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলের মধ্যে যেটুকু সুন্দরবন আছে। এই সুন্দরবন থেকে চলে আসার পরে দেখলাম, আমাদের বনগাঁ শহরেই প্রচুর মানুষ এই সাইকেল নিয়ে ভাবতে শুরু করল, আমি ফেইসবুকে সাইকেল নিয়ে পোস্ট করলেও ভালো সমর্থন পাচ্ছি।”

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ‘সেইফ ড্রাইভ, সেইভ লাইফ’ প্রচারণা নজরে আসে তার। ‘বাইকের সাথে সাইকেলের সংঘর্ষ’, ‘বাইকে চাপা পড়ে মৃত্যু’, ‘লরিতে চাপা পড়ে বাইকচালকের মৃত্যু’ এমন দু্র্ঘটনায় রাশ টানতে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এই প্রকল্প চালু করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

“সেই খানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, আমি যদি বাংলাদেশে গিয়েও এই ‘সেইফ ড্রাইভ, সেইফ লাইফ’ বার্তাটা পৌঁছে দিতে পারি… ওটাও তো আমার বাংলা,” বলেন দিব্যেন্দু।

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলাতেই ছিল দিব্যেন্দুর প্রপিতামহের ভিটে; ১৯৪৭ সালের আগে ওপার বাংলায় পাড়ি জমান তারা। পূর্বপুরুষের সেই জনপদের ভেতর দিয়েও সাইকেল চালিয়ে গেছেন দিব্যেন্দু।

বাংলাদেশে এই সাইকেল সফরের প্রস্তুতি পর্ব কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার কিছু বাংলাদেশি বন্ধুর সাথে কথা হত। ওরা আমাকে উৎসাহ দেয়। বলে দাদা আপনি আসেন। আপনার কাজটা করতে আমরা সহযোগিতা করব।”

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

বাংলাদেশি বন্ধুদের কথা মতো বাংলাদেশের বৃহত্তম সাইকেল চালিয়ে সংগঠন বিডিসাইক্লিস্টের ফেইসবুক গ্রুপে একটি পোস্ট দিয়ে সেখানে সবার ‘সমর্থন’ পেয়ে অভিভূত এই ভারতীয় তরুণ বলেন, “ওরা আমাকে রীতিমতো ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে যায়। আমাকে একটা দিনও বাইরে থাকতে হয়নি। আমাকে বাইরে খেতে হয়নি। আমি বাংলাদেশে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। প্রায় দুশ-আড়াইশ বন্ধুর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে।”

নিজের সাইকেল, ব্যাগে কাপড় আর প্রচারণার জন্য কিছু বই নিয়ে বাংলাদেশে এই ভ্রমণ ছিল দিব্যেন্দুর প্রথম ‘বিদেশ সফর’।

ভিসা ও কাস্টমসে কোনো জটিলতা পোহাতে হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথমে আমি টুরিস্ট ভিসা করি। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসে কথা বলে জানতে পারি, সাইকেলের জন্য আলাদা কাগজ লাগে না। যেহেতু সাইকেল একটা ইকো ফ্রেন্ডলি যান।”

এরপর এই পরিবেশবান্ধব যানের সামনে-পেছনে দুই দেশের পতাকা লাগিয়ে গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর শুরু হয় যাত্রা।

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

সেদিনের স্মৃতি মনে করে দিব্যেন্দু বলেন, “আমার বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের লোকজন, আরও যারা আমাকে ভালোবাসেন প্রত্যেকে এসেছিল ফুল নিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে।

“আমি পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছাই। সেখানে পেট্রাপোল থানার মেজবাবুর সহযোগিতায় আমি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বেনাপোল স্থল বন্দরে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে যখন দেখে আমার সাইকেলে দুই দেশের পতাকা লাগানো, ওরা আমাকে ভীষণভাবে সহযোগিতা করে।”

বাংলাদেশে ঢোকার পর কোন কোন পথে ঘুরেছিল দিব্যেন্দুর সাইকেলের চাকা, সে প্রশ্নের জবাবে এই তরুণ বলেন, “বেনাপোল থেকে যশোর, যশোর থেকে মাগুরা… ৩১২-৩১৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে ঢাকা গিয়ে পৌঁছি।

“বনগাঁ থেকে বেনাপোল। বেনাপোল থেকে আমি প্রথমে চাঁচড়াতে চলে যাই। চাঁচড়াতে বন্ধুর বাড়িতে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করি। চাঁচড়াতে সাইকেল চালানো শুরু করে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে মাগুরা পুলিশ লাইনের সামনে পৌঁছাই। পরদিন ভোরবেলা ওখান থেকে আবার যাত্রা শুরু করি, আমার গন্তব্য রাজবাড়ী। গোয়ালন্দঘাট পার করে আমি রাজবাড়ী পৌঁছাই।”

রাজবাড়ীতে রাত পার করে ভোরে আবার শুরু হয় পথে পথে সাইকেল চালানো।

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

দিব্যেন্দুর সঙ্গে ছিল নিরাপদ সড়ক নিয়ে চালক, পথচারী ও যাত্রীদের জন্য উত্তর ২৪ পরগণার পরিবহন দপ্তর প্রকাশিত একটি সচেতনতামূলক বই, যা তিনি এই সফরে অনেকের হাতে তুলে দেন।

“আমি সর্বমোট ২৪০টা বই বিতরণ করেছি। তিনশ বই নিয়ে গিয়েছিলাম। কুড়িটা বই সাইকেলের চাপে ঠিকঠাক নেই। আর ৪০টা বই আমি ফেরত নিয়ে এসেছি। সবার হাতে আমি চেষ্টা করেছি বইটা পৌঁছে দিতে।”

“আমি চেয়েছি পুলিশ লাইন যেগুলো আছে, পুলিশ কর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তা যারা আছেন তাদের হাতে বইগুলো তুলে দিতে, বিশেষত রাস্তায় দাঁড়িয়ে যারা ডিউটি করে এবং ছাত্রছাত্রী যারা,” বলেন দিব্যেন্দু।

সাইকেল চালিয়ে ‘প্রায় ২১টি নদী’ পেরিয়ে গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার  বনশ্রীতে পৌঁছান তিনি।

ঢাকার ব্যস্ততম সড়কে সাইকেল চালিয়ে শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরান ঢাকাও চষে বেড়ান দিব্যেন্দু। দেখা করেন শাহবাগ থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও।

সবার কাছেই ‘সেইফ ড্রাইভ, সেইভ লাইভ’ বার্তা দিয়েছেন জানিয়ে দিব্যেন্দু বলেন, “ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহবাগ থানার যিনি ওসি, আমি তার হাতেও বইটা তুলে দিয়েছি।”

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনে গিয়েও নিজের এই সফরের কথা জানান। কমিশন থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর লেখা একটি ‘অভিনন্দন’ চিঠিও দেশে ফেরার পর ১৯ জানুয়ারি হাতে পান এই ভারতীয় তরুণ।

তার ফিরতি যাত্রাপথ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের বন্ধুদের পরামর্শেই।

নদীপথে সেই যাত্রার কথা মনে করে দিব্যেন্দু বলেন, “ওরা আমাকে বলল, ঢাকা সদরঘাট থেকে বরিশাল পর্যন্ত লঞ্চের যাত্রাটা অসাধারণ যাত্রা। সেদিন পূর্ণিমা রাত ছিল। লঞ্চে করে আমি বরিশাল পর্যন্ত আসি। প্রায় সাতটা-আটটা নদী, প্রথমে বুড়িগঙ্গা, এরপর ধলেশ্বরী, তারপর পদ্মা। সারা রাত লঞ্চে করে নদীতে ভাসলাম… নদী যেন ডাকছে।”

বরিশাল থেকে সাইকেল চালিয়ে একটু ঘুরপথে অবশেষে বেনাপোলে ফেরেন জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই তরুণ সাইক্লিস্ট বলেন, “বরিশাল থেকে আমি প্রথমে পৌঁছাই ঝালকাঠি, প্রায় কুড়ি কিলোমিটার। এরপর আমি চলে যাই পিরোজপুর, ৪৯ কিলোমিটার। এরপর চলে যাই বাগেরহাট জেলায়। এর মধ্যে আবার অনেকগুলো উপজেলাও পড়েছে। ওখান থেকে চলে যাই খুলনা। ওই দিন মোট আমি ১৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালাই।

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

“খুলনাতে সাইক্লিস্ট বন্ধুরা ছিল। ওরা আমার রাত্রিযাপন খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। সারা রাত ঘুম হয় না… গল্প-গানবাজনা সবাই মিলে। ভোর ৪টা যখন বাজে তখন স্নান করে আমি বেরিয়ে পড়ি আমার দেশের উদ্দেশে।”

১৩ ডিসেম্বর নিজ দেশে ফেরেন দিব্যেন্দু; ওপারে বন্ধু ও স্বজনরাও ছিল তার ফেরার অপেক্ষায়।

দিব্যেন্দু বলেন, “খুলনা থেকে বেনাপোল হচ্ছে আবার ৭৫ কিলোমিটার, গ্রামের রাস্তা দিয়ে। আমি এই ৭৫ কিলোমিটার রাস্তা সাইকেল চালিয়ে দেশে ফিরি। আমি যখন বর্ডারে ঢুকছি দেখি আমার বন্ধুরা, পরিবারের লোকজন, কবি-সাহিত্যিক দাঁড়িয়ে আছে, অভূতপূর্ব দৃশ্য!”

বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যাওয়ার সময় হয়েছে আমার ৩৬০ কিলোমিটারের মতন। আর ফেরার সময় আমি সাইকেল চালিয়েছি ২০৫ কিলোমিটার।

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

“প্রত্যেকটা জেলা ও উপজেলায় আমি ভালো সমাদর পেয়েছি। আমি কথা বলতে চাইলে মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বলেছে সানন্দে। আমি বিদেশি বলে যে আমাকে প্রত্যাহার করবে তা করেনি। আমি কখনই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনি বাংলাদেশে। প্রত্যেকে আমাকে দাদা-ভাইয়ের মতো, ছেলের মতো স্নেহে-ভালোবাসায় কথা বলেছে।”

ঢাকাতে প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার ‘একটু বেশি’ বলেই মনে হয়েছে দিব্যেন্দুর।

তিনি বলেন, “আমার যেটা মনে হয়েছে জনসংখ্যাও অনেক বেশি। সমস্ত রাস্তার মোড়গুলোতে হয়ত ট্রাফিক সিগনাল নেই, কিন্তু পুলিশ হাত দিয়ে নিজে সিগনাল করছে। আমার অসাধারণ লাগল, বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু পুলিশের ওই হাত দিয়ে দেখানো সিগনাল মানছে।

“হেলমেটটা কিন্তু খুব কম মানুষ ব্যবহার করে। বাইকাররা কিন্তু হেলমেট খুব কম ব্যবহার করে। ঢাকার বাইরে সদর যেগুলো খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বেনাপোল, যশোর এসব জায়গায় দূষণ একেবারেই নেই। বাইকের সংখ্যা কম। গ্রামের মানুষজন সাইকেল চালাচ্ছে।”

ছবি – দিব্যেন্দু ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গে সাইকেলের প্রতি আগ্রহ কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের ফেইসবুক পেইজ রয়েছে।

“বিভিন্ন পার্কগুলোতে সাইকেল ভাড়া দেওয়া হয়। সাইকেল নিয়ে বড় বড় পার্ক ঘুরে দেখা যায়। অ্যাপ দিয়ে সাইকেল বুক করে অফিসে যাওয়া যায় এক টাকার বিনিময়ে।”

এছাড়া ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সবুজ সাথী প্রকল্পের অধীনে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের সাইকেল দিয়ে আসছে।

বাংলাদেশে সাইকেল সফর ‘ভালোভাবে’ করতে পারায় এপারের সাইক্লিস্ট বন্ধুদের ধন্যবাদ জানিয়ে দুই দেশের মানুষের জন্য দিব্যেন্দু ঘোষ বলেন, “বলছিল না যে মোটরবাইক এড়িয়ে যেতে হবে সম্পূর্ণরূপে। সেটা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু মানুষ প্রয়োজনের অধিক ব্যবহার করে ফেলছে।”

মহামারী কেটে গেলে দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলে সাইকেল চালিয়ে যাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “একেকটা সাইকেল একেকটা জীবনের কথা বলে। চাকা সৃষ্টিকে রক্ষা করে। সাইকেল চালান, পরিবেশ বাঁচান।”