তালেবানের হাতে ‘মার খাচ্ছেন’ আফগান সাংবাদিকরা

আফগানিস্তানে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে তালেবানের হাতে আটক, মারধর ও বেত্রাঘাতের শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন দেশটির সাংবাদিকরা।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ছবিতে কাবুলে গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ছাড়া পাওয়া এতিলাতরোজ সংবাদপত্রের দুই সাংবাদিকের ক্ষতবিক্ষত শরীর ও তাদের দেহে চাবুকের দাগ দেখা গেছে।

এদের একজন তকি দারিয়াবি বিবিসিকে বলেছেন, তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর বেধডক মারধর করা হয়েছিল।

বুধবার আফগানিস্তানে কর্মরত বিবিসির সাংবাদিকদেরও বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও নিতে দেওয়া হয়নি।

ওইদিন দারিয়াবি ও এতিলাতরোজের আলোকচিত্রী সাংবাদিক নেমাতুল্লাহ নাকদি কাবুলে নারীদের বিক্ষোভ কভার করতে গিয়েছিলেন।

তাদের দু’জনকে আটক করে একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়; সেখানে তাদেরকে লাঠি, বৈদ্যুতিক তার ও চাবুক দিয়ে পেটানো হয় বলে অভিযোগ।

ছবি রয়টার্স

কয়েক ঘণ্টা পর তালেবান এ দু’জনকে ছেড়ে দেয়। কেইনবা তাদেরকে আটক করা হয়েছিল, আর কেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি তারা।

“তারা আমাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যায় এবং আমার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধে। তারা আমাকে আরও বাজেভাবে মারতে পারে, এমনটা ভেবে নিজেকে মার খাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিই আমি। এ কারণে আমি এমনভাবে মেঝেতে শুয়ে পড়ি, যেন শরীরের সামনের অংশ রক্ষা পায়।

“তারা ৮জন ছিল এবং সাধারণ লাঠি, পুলিশের লাঠি, হাতের কাছে যা যা পেয়েছে তাই দিয়ে আমাকে পিটিয়েছে। আমার মুখে যে দাগ সেগুলো জুতার, তারা আমার মুখে লাথি মেরেছিল।

“আমি অচেতন হয়ে পড়ার পর তারা থামে। তারা আমাকে অন্য একটি ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে আটক রাখার সেল ছিল। তারা আমাকে সেখানে ছেড়ে যায়,” বলেন দারিয়াবি।

মারধরে অচেতন হয়ে পড়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর ছাড়া পান তিনি।

“হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল, অথচ তারা আমাকে দ্রুত হাঁটতে তাড়া দিচ্ছিল। সেসময় আমার খুব ব্যথা হচ্ছিল,” বলেছেন এই সাংবাদিক।

নেমাতুল্লাহ নাকদি জানান, তিনি যখন বিক্ষোভের ছবি তুলতে শুরু করেন, তালেবান যোদ্ধারা তখন তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

“এক তালেবান সদস্য আমার মাথায় তার পা তুলে দিয়েছিল, আমার মুখ কংক্রিটে ঠেসে ধরেছিল। তারা আমার মাথায় লাথি মারে। আমি ভেবেছিলাম, তারা আমাকে মেরে ফেলতে যাচ্ছে,” ফ্রান্সভিত্তিক এক বার্তা সংস্থাকে এমনটাই বলেছেন এতিলাতরোজের এ আলোকচিত্রী সাংবাদিক।

ছবি রয়টার্স

কেন মারা হচ্ছে, তা জানতেও চেয়েছিলেন নাকদি। উত্তর এসেছে, “তোমার কপাল ভালো যে তোমার শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে না।”

এতিলাতরোজের সম্পাদক জাকি দারিয়াবি বলেছেন, বুধবার তাদের ৫ সহকর্মীকে তালেবান যোদ্ধারা ৪ ঘণ্টা আটকে রেখেছিল।

“এদের মধ্যে দুইজনকে বেধম পেটানো হয়,” বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বৃহস্পতিবার এমনটাই বলেছেন তিনি।

আহত দুই সাংবাদিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের দুই সপ্তাহ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন।

আফগান বার্তা সংস্থা টোলো জানিয়েছে, তালেবান তাদেরও এক ক্যামেরাম্যানকে তিন ঘণ্টা আটকে রেখেছিল।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে, কেবল দুই দিনেই তালেবান ১৪ সাংবাদিককে আটক করে। পরে অবশ্য সবাইকে ছেড়েও দেয় তারা।

“আফগানিস্তানে গণমাধ্যম অবাধে ও নিরাপদে কার্যক্রম চালাতে পারবে বলে তালেবান আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা যে মূল্যহীন, তা দ্রুতই প্রমাণ করছে তারা। আমরা তালেবানের কাছে তাদের আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে, সাংবাদিকদের আটক ও মারধর বন্ধ করে তাদের কাজ করতে দিতে এবং গণমাধ্যমকে দমনপীড়নের ভয় ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে অনুরোধ করছি,” বলেছেন সিপিজে’র এশিয়া কর্মসূচির সমন্বয়ক স্টিভেন বাটলার।

গত মাসে ঝড়ের বেগে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তালেবান কয়েকদিন আগে তাদের পুরুষসর্বস্ব অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছে; এরপর থেকে তারা আফগানিস্তানে অনুমোদনহীন বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বলেছে, বিচার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া যে কোনো বিক্ষোভই ‘অবৈধ’।   

তালেবানের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার এক সদস্য বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে বলেছেন, সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো হামলা-নির্যাতনের ঘটনারই তদন্ত হবে।

কট্টর ইসলামপন্থি গোষ্ঠীটির নতুন মন্ত্রিসভার এ সদস্য অবশ্য নিজের নাম প্রকাশে রাজি হননি।