ভারতের প্রতিরক্ষাপ্রধান ও স্ত্রী হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত

ভারতের প্রথম চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত ও তার স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াত তামিল নাড়ুতে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর এমআই সেভেনটিন ভি৫ হেলিকপ্টারটি বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কুন্নুরের গভীর জঙ্গলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর আগুন ধরে যায়। কপ্টারের ১৪ জন আরোহীর মধ্যে বাঁচতে পেরেছেন কেবল একজন।

দুর্ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর এক টুইটে হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়।

সেখানে বলা হয়, “গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, দুর্ভাগ্যজনক ওই ঘটনায় জেনারেল বিপিন রাওয়াত, মিসেস মধুলিকা রাওয়াত এবং হেলিকপ্টারে থাকা আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।”

আরোহীদের মধ্যে বেঁচে গেছেন কেবল গ্রুপ ক্যাপ্টেন বরুন সিং। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ওয়েলিংটনের সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

''

৬৩ বছর বয়সী জেনারেল রাওয়াত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রধান বা চিফ অব ডিফেন্স স্টাফের দায়িত্ব নিয়েছিলেন; সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করতেই পদটি সৃষ্টি করা হয়।

নতুন সৃষ্ট সামরিক বিষয়ক বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এই চার তারকা জেনারেল।

বুধবার সকালে দিল্লি থেকে আকাশ পথে কোইমবাটোরের সুলুর সেনাঘাঁটিতে গিয়েছিলেন জেনারেল রাওয়াত। দুপুরে সেখান থেকে নীলগিরির ওয়েলিংটনের ডিফেন্স স্টাফ কলেজে যাওয়ার পথে তার হেলিকপ্টার কুন্নুরে দুর্ঘটনায় পড়ে। তার পিএসও, সিকিউরিটি কমান্ডো এবং বিমানবাহিনীর সদস্যরা ছিলেন ওই হেলিকপ্টারে। 

টেলিভিশনে দেখানো ভিডিওতে পাহাড়ের ধারে ছড়ানো ছিটানো কপ্টারের ধ্বংসাবশেষ জ্বলতে দেখা যায়। গাঢ় ধোঁয়া আর উপড়ানো গাছের কারণে উদ্ধারকর্মীদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল।

ছবি: ইনডিয়ান এক্সপ্রেস

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কৃষ্ণস্বামী নামে কুন্নুরের এক বাসিন্দা আনন্দবাজারকে বলেছেন, “প্রথমে একটা কানফাটানো আওয়াজ শুনতে পেলাম। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেলাম, হেলিকপ্টারটি প্রচণ্ড গতিতে প্রথমে একটি গাছে ধাক্কা মারল। তারপরই দেখতে পেলাম একটা আগুনের গোলা। পরমুহূর্তেই সেটা সজোরে আরও একটি গাছে ধাক্কা মারল।

“দেখলাম, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই কপ্টারটি থেকে দুতিন জন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের গোটা শরীরই পুড়ে গিয়েছে ততক্ষণে।”

রাশিয়ার তৈরি এমআই সেভেনটিন ভি৫ হেলিকপ্টারটি ঠিক কী ধরনের সমস্যায় পড়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিমান বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটি এ বিষয়ে একটি জরুরি বৈঠকও করেছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদী এক টুইটে বলেছেন, সেনাবাহিনীর কাজে বিপুল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার সেবার কথা ভারত কখনও ভুলবে না। 

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বিকালে দিল্লিতে জেনারেল রাওয়তের বাসভবনে ছুটে যান। সেখানে তিনি প্রতিরক্ষা প্রধানের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। বৃহস্পতিবার তার পার্লামেন্টে এ বিষয়ে বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে।  

''

১৯৫৮ সালের ১৬ মার্চ ভারতের উত্তরাখণ্ডের পৌড়ীর এক গঢ়ওয়ালি রাজপুত পরিবারে বিপিন রাওয়াতের জন্ম। তার পূর্বপুরুষদের অনেকেই সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তার বাবা লক্ষ্মণ সিং রাওয়ত ছিলেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল।

সিমলার সেন্ট এডওয়ার্ড স্কুলে পড়াশোনার পর খড়কভাসলার ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি ও দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে ১১ গোর্খা রাইফেলস ব্যাটালিয়নে যোগ দিয়েছিলেন বিপিন রাওয়াত।

তার চাকরিজীবনের বড় একটা সময় কেটেছে জম্মু ও কাশ্মীরে। বাহিনীতে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শক্ত পাল্লার কমান্ডার হিসেবে। শেষের দিনগুলোতে তিনি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে মনোযোগ দিয়েছিলেন।

ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত ও তার স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াত

নরেন্দ্র মোদীর সময়ে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান এই জেনারেল। সেই দায়িত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার একদিন আগে তাকে ভঅরতের প্রথম ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ নিযুক্ত করা হয়।

১৯৯৯ সালে কার্গিলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের পরে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করতে একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদনে একজন ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অ্যাডভাইজার’ নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, যিনি সকল বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন।

এর ধারাবাহিকতায় চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ নামের ওই নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। তিন বাহিনীর প্রধানরাও ডিপার্টমেন্ট অব মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের প্রধান হিসেবে রাওয়াতের কাছে জবাবদিহি করতেন।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেলে দিল্লিতে সামরিক মর্যাদায় জেনারেল বিপিন রাওয়ত এবং তার স্ত্রী মধুলিকার শেষকৃত্য হবে। তার আগে বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত চলবে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।