ইসি নিয়ে সংলাপ: আইন করার পক্ষেই পাল্লা ভারী

ছবি: আব্দুল মান্নান
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার পথে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ; যাতে এখন পর্যন্ত প্রায় সব দলই আইন প্রণয়নের কথা বলেছে।

প্রায় মাসব্যাপী এ সংলাপে সার্চ কমিটির জন্য কয়েকটি দল নাম প্রস্তাব করলেও কেউ কেউ বলেছে এ প্রক্রিয়ার ‘কোনও দরকার নেই’।

সোমবার বিকাল চারটায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দলের সংলাপে অংশ নেওয়ার সূচি রয়েছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে এটিই হবে এবারের ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির শেষ সংলাপ, যা গত ২০ ডিসেম্বর সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

এভাবে সংলাপের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করেই কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসি নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, যে কমিশনের মেয়াদ ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে। এর আগেই নতুন ইসি নিয়োগ দিতে হবে রাষ্ট্রপতিকে।

শেষের পথে থাকা এ সংলাপ নিয়ে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু আশা করছেন রাষ্ট্রপতি তাদের দাবিগুলো বিবেচনা করবেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দেশে নির্বাচন নিয়ে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়ে। সেটা দূর করার একটিই সমাধান, তা হল সংবিধানের আলোকে ইসি গঠনে একটি স্থায়ী আইন করা।

“আইনটি হলে রাষ্ট্রপতি যে সংলাপ করছেন, তা প্রতি পাঁচ বছর পরপর করার দরকার পড়ে না। সবার মতামত নিয়ে যদি আইন করা হয় তবেই একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।“    

সার্চ কমিটি গঠনের এ সংলাপকে সফল বলে মনে করছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “যারাই সংলাপে অংশ নিয়েছে সবাই বিভিন্ন দাবি করেছে, তবে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে কেউ আপত্তি করেনি।

“নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি কী পরামর্শ দেবে সেটা দেখার বিষয়। অনেকে সংলাপ বর্জন করলেও আপাতত সার্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে এ সংলাপ সফল হবে।”

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির হাতে। সুনির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে তা গঠনের কথা থাকলেও তা এখনও প্রণীত হয়নি।

সংলাপ শেষ হচ্ছে ১৭ জানুয়ারি, তারপরই ‘সার্চ কমিটি’  

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে ইসি নিয়োগ দেওয়ার পর আবদুল হামিদও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসছেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল এখন তিন ডজনের বেশি। বর্তমান কমিশন গঠনে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি হামিদ। এক মাস ধরে ৩১টি দলের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।

এবারও প্রায় এক মাস ধরে চলা এ সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয় ৩২টি দলকে। ২৪টি দলের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা শেষ হয়েছে। বিএনপিসহ সাতটি দল সাড়া দেয়নি।

তারা বলছে, সংলাপ ‘অর্থহীন’। সংলাপ বর্জন করা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) আগের সংলাপগুলোতে তাদের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

অন্যদিকে গণ ফোরাম ও বিকল্প ধারা বাংলাদেশ সংলাপে অংশ নিলেও দল দুটির শীর্ষ নেতা কামাল হোসেন চৌধুরী এবং একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বঙ্গভবনে যাননি।

সোমবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই সংলাপ, যা বঙ্গভবনের ভাষায়, ‘নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা’।

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, সংলাপ শেষ হওয়ার পর সার্চ কমিটি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হবে।

আইন চায় সবাই

রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নেওয়া প্রায় সব দলই সাংবিধানিক সংস্থা ইসি গঠনে সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নের কথা জোরালোভাবে বলেছে। সরকারও আইন প্রণয়নের পক্ষে। তবে এবার সময় না থাকায় তা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

গত ২৮ নভেম্বর সংসদে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চলমান একাদশ জাতীয় সংসদের আগামী দুটি অধিবেশনের মধ্যে তিনি ইসি গঠন সংক্রান্ত আইন সংসদে তুলতে পারবেন। সংলাপ শুরু হওয়ার পরও আইনমন্ত্রী বলেছিলেন এবারও সার্চ কমিটি হবে। কেননা আইন আনতে সময় লাগবে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে সার্চ কমিটি নিয়ে আলোচনার চেয়ে এবার আইন প্রণয়ন নিয়েই বেশি কথা হয়েছে। তবে কয়েকটি দল সার্চ কমিটির জন্য নামের তালিকা দিয়েছে।

সংলাপের শুরুর দিন জাতীয় পার্টি আইন প্রণয়নসহ তিন দফা দাবির সঙ্গে সার্চ কমিটির জন্য ৪-৫ জনের একটি তালিকা দিলেও নাম প্রকাশ করেনি তারা।

অপরদিকে বিকল্প ধারা সার্চ কমিটির জন্য লেখক-অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যবসায়ী রোকেয়া আফজাল রহমান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নাম প্রস্তাব করে।

সার্চ কমিটি গঠনের বিরোধিতাও এসেছে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাছ থেকে।

কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব

সংলাপে সার্চ কমিটির বিকল্প প্রস্তাবের পাশাপাশি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের কথাও বলেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল।

গণতন্ত্রী পার্টি সার্চ কমিটির পাশাপাশি একটি ‘বিশেষ কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেছে- প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে ওই কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে।

সার্চ কমিটি পাঁচটি নাম প্রস্তাব করবে কাউন্সিলের কাছে। কাউন্সিল নির্বাচন কমিশনারদের নাম সংক্ষেপ করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন।

সরকারি দলের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি আইন প্রণয়নের সুপারিশের পাশাপাশি আপাত ব্যবস্থা হিসেবে ইসি গঠনে সংসদকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

দলটি চায় সার্চ কমিটি হোক সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিদের নিয়ে। নতুন ইসির পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুজন নারী রাখার সুপারিশও জানায় দলটি।

জাকের পার্টি নিবন্ধিত সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি-জেপি বলেছে, সার্চ কমিটি কোথা থেকে এল? সংবিধানে এর উল্লেখ নেই।

আলোচনায় নির্বাচনকালীন সরকার

সংলাপে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়েও প্রস্তাব এসেছে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ চায় সব দলকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হোক।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) নির্বাচনকালীন ‘অনির্বাচিত’ কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে।

১৪ দলের আরেক শরিক সাম্যবাদী দল প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘সংবিধান অনুযায়ী’ নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

খেলাফত মজলিশ সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে এসেছে বঙ্গভবনে।

গণফ্রন্ট সব দলকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেটির অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব তাদের।