ফ্লয়েড হত্যা: যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসীদের ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের নিপীড়নে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভের আগুন। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে সরব রয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে গত সপ্তাহে জর্জ ফ্লয়েডকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে গলায় হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রাখার পরই শ্বাসরোধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার মোবাইল ফুটেজ সামনে আসতেই জ্বলে ওঠা আগুন এখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে অভিবাসীদের মধ্যে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জর্জ ফ্রয়েডকে বর্বরোচিতভাবে হত্যার ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন যদি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতো তাহলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। এছাড়া, আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবার পরও নাগরিকদের এমন অবস্থায় শান্ত হবার আহ্বানে কোন বক্তব্য দেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং তিনি টুইটে এমন সব মন্তব্য করেছেন যা আন্দোলনকে আরো উস্কে দেওয়ার শামিল। আর এভাবেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবারো চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন ট্রাম্প।”

নিউ ইয়র্কে শ্রমিক-অধিকার বিষয়ক শিক্ষক ও অভিবাসীদের মর্যাদা নিয়ে কাজ করা পার্থ ব্যানার্জি বলেন, “আমরা হিংসায় বিশ্বাসী নই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ প্রশাসনের কোন কোন পর্যায়ে আচরণ এতটাই বর্ণবিদ্বেষমূলক যে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে ক্রোধের মাত্রা চরমে উঠেছে। রাজপথে তারই নগ্ন প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিং-কে হত্যার পর যে ধরনের পরিস্থিতি সারা আমেরিকায় সৃষ্টি হয়েছিল, এবারও তেমনই দেখা যাচ্ছে।”

ফিলাডেলফিয়ার ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের অধ্যাপক ও সমাজকর্মী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, “নানা কারণে মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষেরা বহু বছর থেকেই নানাভাবে বঞ্চিত-অবহেলিত এবং বর্ণ-বৈষম্যের শিকার। এমন অবস্থায় দীর্ঘ লকডাউনে ওই শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্রোধের মাত্রা বেড়েছে। এরই মধ্যে জর্জ ফ্রয়েড হত্যার বিষয়টি প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে সর্বমহলে।”

রাজধানী ওয়াশিংটনের কাছে ম্যারিলেন্ডে বসবাসরত লেখক-বিজ্ঞানী আশরাফ আহমেদ বলেন, “গত কয়েকদিনে যে অরাজকতা ঘটে চলেছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সময় এসেছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মজ্জাগত ত্রুটিগুলোকে আত্মসমালোচনা করে সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়ার। অন্যথায় এই সামাজিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা করোনাভাইরাসের মহামারীকেও ম্লান করে দেবে।”

সিয়াটলে বোয়িং কোম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ আলী বলেন, “১৯৯০ সালে ইরাক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিলাম। সে সময়েও দেখেছি এমন কিছু লোক, যারা কখনোই কোন আন্দোলনে অংশ নেননি। তারা আন্দোলনের মূল চেতনাকে নস্যাতের অভিপ্রায়ে অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিল। এর ফলে অধিকারবঞ্চিত মানুষদের দাবি আদায়ের পথ আবারো মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তাই সত্যিকারের আন্দোলনকারিদের চোখ-কান খোলা রেখে মাঠে থাকা উচিত।”

ডেমোক্রেট রাজনীতিক ও জর্জিয়া স্টেট সিনেটর শেখ রহমান বলেন, “চলমান আন্দোলনে সামাজিক দূরত্ব লংঘনের যে দৃশ্য আমরা দেখেছি তা থেকে আশংকা রয়েছে শিঘ্রই মহামারীতে আরও কঠিন রূপ নেয়ার।”

রিপাবলিকান রাজনীতিক ও নিউ হ্যমশায়ার স্টেটের রিপ্রেজেনটেটিভ আবুল খান বলেন, “শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সবারই কাম্য। কিন্তু কারফিউ লংঘনসহ অগ্নি-সংযোগ আর লুটতরাজের ঘটনাবলিতে সবাই ব্যথিত যে এবারও বৈষম্য অবসানের স্থায়ী ব্যবস্থা আর হবে না।”

সাউথ ক্যারলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শফিকুর রহমান বলেন, “ভয়ংকর একটি পরিস্থিতির আশংকা করছি। এ থেকে উত্তরণে ওই হত্যায় জড়িত ৪ পুলিশ অফিসারকেই গ্রেপ্তার ও কোর্টে সোপর্দ করা জরুরি।”

‘আমেরিকা ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ এর প্রেসিডেন্ট এবং নিউ জার্সির মনমাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গোলাম মাতব্বর বলেন, “ফ্রয়েডকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা সভ্য সমাজের কাছে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমন পাশবিকতায় লিপ্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্য দিয়েই সৃষ্ট উত্তাপের শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটতে পারে।”

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!