ভ্রমণ কাহিনি: সহস্র চূড়ার শহর

চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ যা ভলতাভা নদী দ্বারা বিভক্ত। এটি ‘সিটি অব দ্য থাউজ্যান্ড স্পায়ারস’ নামে পরিচিত।

চেক প্রজাতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত নাম চেকিয়া, পূর্বে বোহেমিয়া নামে পরিচিত, মধ্য ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এটি দক্ষিণে অস্ট্রিয়া, পশ্চিমে জার্মানি, উত্তর -পূর্বে পোল্যান্ড এবং পূর্বে স্লোভাকিয়া সীমান্তে অবস্থিত।

প্রাগ শহরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রাগ ক্যাসল, যা প্রাগ থেকে প্রতিটি পোস্টকার্ডে প্রদর্শিত হয়। এটি ভলতাভা নদীর উপর অবস্থিত। পর্যটকদের আনাগোনায় বেশ মুখরিত ছিলো ব্রিজটি।  এটি ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ব্রিজের একটি। ৬২১ মিটারের এ ব্রিজটিতে রয়েছে ৩২টি ইউনিক পয়েন্টস যার প্রত্যেকটিতে একটি করে পুরনো মূর্তি রয়েছে।

প্রাচীর দিয়ে ঘেরা অঞ্চলে চেক প্রজাতন্ত্রের অন্যতম চমৎকার আকর্ষণ ধর্মীয় ভবন ‘সেন্ট ভিটাস ক্যাথেড্রাল’। এটির হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস রয়েছে এবং ঠিক সে কারণে আপনি প্রতিটি স্থাপত্যশৈলী নিও-গথিক শৈলী থেকে আধুনিক স্থাপত্যের তিনটি উপাদান খুঁজে পেতে পারেন। এলাকাটি ঘুরে দেখলে আপনি সুন্দর বাগান, গির্জা, বেলভেদেয়ার, আল্পস এবং গোল্ডেন স্ট্রিট থেকে উত্তরে ইতালিয় নবজাগরণের দুর্দান্ত কাজ পাবেন। মজার জিনিস যা ভুলে যাওয়া যায় না তা হলো দুর্গ প্রহরীকে হাসানোর চেষ্টা করা।

ওল্ড টাউন- আপনি যদি এ শহরে হারিয়ে যান তাহলেই এ শহরটি সম্পর্কে সহজে জানতে পারবেন এবং দেখতে পারবেন। ওল্ড টাউনের ছোট ছোট রাস্তার গোলকধাঁধায় কোনো মানচিত্রের প্রয়োজন নেই, এটি কোনোভাবে সাহায্য করে না। বিপুল সংখ্যক পর্যটকদের কারণে তাদের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিছুটা ক্লান্তিকর হতে পারে, তবে এটি এখনও মূল্যবান। কারণ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গির্জা, প্রাসাদ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ভবনগুলোর মতো প্রচুর দর্শনীয় স্থান পাওয়া যায়।

আমি ঠিক এভাবেই শহরটি ঘুরে দেখেছি। জার্মানির পর এটি ছিলো আমার প্রথম একক ভ্রমণ। দুইদিনের মধ্যে আমি পুরো শহরটি ঘুরে দেখে শেষ করেছি। আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো শহরের ছোট ছোট অলিগলি। আমি যখন হাঁটা শুরু করেছি আর থামতে পারিনি। শত বছরের পুরনো বিশাল বিশাল ভবন ছিলো রাস্তার পাশে যা আমাকে খানিক সময়ের জন্য একশ বছর আগের অনুভূতি দিয়েছিলো।

শহর দেখা শেষে ঘুরে আসি শহরের মাঝে অবস্থিত প্রাগ টাওয়ারে। যেখান থেকে পুরো শহরের সুন্দরতম দৃশ্য চোখে পড়বে। ১৫০ ফিটেরও বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট এ টাওয়ারটিতে উঠতে আমাকে প্রায় ১০০ চেকিস করুন পে করতে হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ ছাড়েরও ব্যবস্থা ছিলো।

‘মিউজিয়াম অব আলকেমিস্ট’ প্রাগ শহর থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে। এ মিউজিয়ামটি প্রথম দেখায় যে কেউ ভয় পাবেন। একদম ভূতুড়ে শব্দের সঙ্গে অন্ধকার কক্ষের মেঝেতে জাদুকরদের কালো নকশা আপনাকে অন্যরকম একটি অনুভুতি দেবে, যা সরাসরি না দেখলে বিশ্বাস করানো অসম্ভব। এ মিউজিয়ামের প্রায় সবগুলো প্রদর্শনীতে আপনি একটা রোমাঞ্চ খুঁজে পাবেন। মিউজিয়ামের সৌজন্যে ছিলো ম্যাজিকাল পানীয়ের ব্যবস্থা যা আমাকে খুব অবাক করেছিলো।

প্রথম দিনের ভ্রমণ শেষে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে রওনা দেই প্রাগের অন্যতম আকর্ষণীয় জাতীয় জাদুঘর দেখার উদ্দেশ্যে। সাত বছরের দীর্ঘ সংস্কার থেকে সতেজ, প্রাগের ন্যাশনাল মিউজিয়াম বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বকারী অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা রয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থে লক্ষ লক্ষ আইটেম খনিজবিজ্ঞান, প্রাণীবিদ্যা, নৃতত্ত্ব এবং প্রত্নতত্ত্ব, সেইসঙ্গে শিল্প এবং সঙ্গীত। শুধু কীটতত্ত্ব নমুনা সংগ্রহ সংখ্যা পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি। চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাচীনতম জাদুঘর, এটি ১৮৯১ সালে তার বর্তমান অবস্থানে যাওয়ার আগে ১৮০০ এর প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

একটি উপভোগ্য অনুষ্ঠান হলো প্রত্নতত্ত্ব প্রদর্শনী যাতে ১ম এবং ২য় শতকের রোমান শিল্পকর্মের বিশাল সংগ্রহ, সেইসঙ্গে অসংখ্য ব্রোঞ্জ এবং আদি লৌহ যুগের সন্ধান সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম। আপনার পরিদর্শন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আরেকটি চমৎকার যাদুঘর হলো জাতীয় প্রযুক্তি যাদুঘর, এটিতে দেশটির অনেক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির নথিপত্র আছে, বছরের পর বছর ধরে এখানে নির্মিত যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রপাতি প্রদর্শন, অটোমোবাইল থেকে বিমান পর্যন্ত । এটিই ছিলো প্রাগে আমার সর্বশেষ দর্শনীয় স্থান।

দুইদিনের ভ্রমণ শেষে আমি রাতের বাসে জার্মানিতে ফিরি। জার্মানির খুব কাছে হওয়ায় আমার সময় লেগেছিলো ড্রেসডেন থেকে মাত্র ২ ঘণ্টা। খুব অল্প খরচ এবং অল্প সময়ে সবচেয়ে প্রাচীনতম এ সুন্দর শহরটি ঘুরে এসেছিলাম। মোটামুটি ২০০ ইউরোর মতো বাজেট হলে এ শহরটি খুব ভালোভাবে ঘুরে আসা যায়। যে শহর দেখলে সত্যিই মন জুড়িয়ে যায় তার মধ্যে প্রাগ একটি। এই শহরের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমি কোনদিন ভুলব না।

লেখক: শিক্ষার্থী, এডভান্সড ফাংশনাল ম্যাটারিয়ালস, টেকনিশ্চে ইউনিভার্সিটি কেমনিটজ, জার্মানি

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!

আরও পড়ুন