প্রবাসীর স্মৃতিচারণ: আমার মেয়েবেলা

গ্রামে জন্মেছি, গ্রামে বড় হয়েছি। ভাবতে ভালো লাগে এরপর পড়াশোনার জন্যে ঢাকা, দেশ বিদেশ করে, বিদেশেই স্থিত। গ্রামের সে শৈশব-কৈশোরের মেয়েবেলার ভাবনা ও স্মৃতি থাকে আমার মন জুড়ে। মা হয়েছি, হয়েছি শিক্ষক।

আমার মেয়ে তার মেয়েবেলা পেরিয়ে এখন প্রায় বড়দের পর্যায়ে, কলেজের পাঠ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবে। আমি পড়াই কিশোর বয়সী কলেজের শিক্ষার্থীদের। আমার মেয়ে আর ছাত্রীদের মেয়েবেলা আমি দেখি প্রতিদিন। মনে পড়ে আমার নিজের মেয়েবেলার কথাও।

শৈশবে প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াতাম। বাড়ির আঙিনা, আশেপাশের ছোট বড় গাছপালা, তাতে ধরে থাকা ফুল ফল, স্কুলে যাওয়ার মেঠো পথ, পথের ধারের বুনোফুল, পাঠের বই, একসঙ্গে বেড়ে উঠা পড়ার ও খেলার সঙ্গীদের ভালোবাসা এসব নিয়ে আমার মেয়েবেলার গল্প ।

শুরুর দিকে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম না।  প্রায় সব বিষয়ে অকৃতকার্য হই।  তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি।  বাবা মা চিন্তিত। হঠাৎ একদিন প্রতিবেশী এক গৃহশিক্ষক এসে বাবা মাকে বললেন, পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটি ভালো। ওখানে দিন, পড়াশোনায় আগ্রহ পাবে আপনাদের মেয়ে। যেমন কথা, তেমন কাজ। বাবা-মা আমাকে ওই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলেন।

স্কুলটি ছিল ছোটমত লম্বা একটি মাটির ঘর, টিনের চাল। চার-পাঁচটি কামরা। প্রতিটি কামরা একেকটা শ্রেণিকক্ষ। শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠ ছেড়ে দৌড়ে শ্রেণিতে। পড়াশোনায় আমরা সবাই মনোযোগী। সরল সহজ সুন্দর শিক্ষকদের আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদানের একটা নমুনা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ার প্রতিযোগিতা গড়ে তোলা। শুরু হয়ে গেল পড়ার প্রতি আকর্ষণ।  তারপর থেকে আর ফেইল করিনি। এরপর স্কুলটির পাশ দিয়ে যখনই যাই আপন আপন লাগে।

শৈশব ও কৈশোরে যে বাড়ির আঙিনায় বেড়ে ওঠেছি। নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার পোড়াদিয়া গ্রামে।

মনে পড়ে আমজাদ স্যারের কথা।  যিনি আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতে কাউকে না কাউকে পড়াতেন।  ভোর ৫টায় দরজায় কড়া নাড়ছেন একজন। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের আমজাদ স্যার। কড়া নেড়ে বলতেন, “ওকে উঠিয়ে দিন. পড়তে বসতে হবে”।  পুরো গ্রামের বাচ্চাদের তিনি যেন এক অবধারিত অবিভাবক।

আমজাদ স্যারের কথা যেমন ভালোলাগা থেকে মনে পড়ে, তেমনি কোনও কোনও শিক্ষকের অন্যরকম আচরণের  কথাও ভোলা যায় না।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি । তখন আমাদের শ্রেণির অনেকেই প্রতিবেশী একজন স্কুলশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়। আমি রাস্তা পার হয়ে একা যেতে ভয় পেতাম বলে আমার তার কাছে পড়তে যাওয়া হয়নি। তিনি আমার মতো একটি ছোট্ট শিশুকে একদিন ক্লাসে পেটে পেন্সিলের খোঁচা দিয়েছিলেন।  কী যে লজ্জা পেয়েছিলাম!  বুঝতে পেরেছিলাম, তার কাছে পড়তে না যাওয়ার কারণে  তিনি  হয়তো এ আচরণটি করেছেন। প্রতিবাদ করার মতো সাহস হয়নি তখন। উনি প্রায়ই বিরূপ আচরণ করে গেছেন, সবসময় ভয়ে জড়সড় থাকতাম। 

আমরা বেড়ে ওঠেছি একান্নবর্তী পরিবারে। মা আমার নানার একমাত্র কন্যা ছিলেন বলে আমার মামারা তার বোনকে ভাইদের সঙ্গেই রেখে দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে আমরা নানাবাড়িতে বড় হই। সেখানে ছয়-সাত পরিবারের আলাদা আলাদা ঘর, একটি উঠোন, এক ঘরে সবার খাওয়া দাওয়া, যেন প্রতিবেলায় মিলেমিশে এক  মহাউৎসব। আমরা মামাতো-ফুফাতো ৮ জন প্রায় সমবয়সী ভাইবোন ছিলাম। একে অপরের যেন বন্ধু, আবার পরস্পরে তুমুল প্রতিযোগিতা- পড়াশোনায় কে কার চেয়ে ভালো করবে।

একজন আরেকজনকে  আগলে রাখাতেও কমতি ছিল না।  আমি আর আমার  এক মামাতো বোন একই শ্রেণিতে পড়তাম। আমার সমবয়সী বোনটি অতটা মনোযোগী ছিল না পড়াশোনায়। আমরা যদি কোথাও ঘুরতে যেতাম, ও প্রথমে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলতো, ও ভালো ছাত্রী, শ্রেণীতে প্রথম। আমি দেখতাম ওর মুখটা আলোয় ভরে যেত। ওই বয়সে এ এক গায়ে শিহরণ ওঠা ভালোলাগা কাজ করতো।

আমার মা একজন অগ্রসর চিন্তার আধুনিক মানুষ। পড়াশোনা বেশি একটা করেননি।  তিনিও গ্রামে বড় হওয়া মানুষ।  তবে আমার মেয়েবেলায় আমাদেরকে যে কথাগুলো মা বলতেন, তার কয়েকটা এখানে বলতে চাই।

চন্ডিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমার পড়াশোনা এ স্কুলে। নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার চন্ডিপাড়াগ্রামে এই স্কুলটি। ছবিটি বর্তমানে তোলা। আগের টিনের চালের মাটির ঘরের স্কুলটি পরিবর্তিত হয়ে ডান পাশের হলুদ রঙের ভবনটি নির্মিত হয়েছে।

আমার বয়স তখন ১২ বা ১৩।  সেই বয়সেই মা আমাকে মেয়েদের  হরমোনজনিত পরিবর্তনে ঋতুচক্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছিলেন।  রক্তপাতে ভয় না পেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “যখনই দেখবে তোমার ঋতুচক্র দেখা দিয়েছে, আমাকে বলবে। আমি তোমার জন্য ব্যবস্থা নেবো"।  ঋতুচক্রের প্রথম দিনে, মাকে জানিয়েছিলাম।

এ প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর মেয়েবেলার একটি ঘটনা বলি। আমার বন্ধুটি  শারীরিক এ পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনো পূর্ব ধারণা লাভ করার সুযোগ পায়নি পরিবারের কারো থেকে। যখন ওর প্রথম ঋতুচক্র দেখা দিয়েছিল, সেদিন ও ভীষণ ভয় পেয়েছিল। এই দিক থেকে আমি ছিলাম ভাগ্যবান।

আমার মাকে ঘিরে আরো একটি ঘটনা বলি।  আমার বয়স তখন ১৪-১৫ হবে।  মা প্রায়ই গল্পে গল্পে বলতেন, এ বয়সে অনেককেই ভালো লাগবে তোমার, তোমাকেও অনেকে অনেক কিছু বলবে, কিন্তু কাউকে পছন্দ করার সময় এখন না।  যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, নিজের পছন্দটা তখন আরো ভালো করে বুঝতে পারবে। বিশাল জায়গায় অনেক বিচিত্র মনের মানুষদের সাথে মেলামেশা হবে। কে তোমাকে ভালোবাসে, সম্মান দেয় এসব বুঝবে। তখন ঠিক মানুষটাকে পছন্দ করে নিবে। তাহলে ভুল হবে না।

আমার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। বাবাকে সারাক্ষণ বাড়িতে কোনো না কোনো বই পড়তে দেখতাম। বাবা তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়তেন।  মা অনেক সময় অনুযোগ করে বলতেন, "সারাদিন বই পড়লে সংসার কে করবে"?  বাবা শুধু হাসতেন। সকাল বিকাল দুপুর বাবার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শেক্সপিয়ার আরো কত কবির কবিতা শুনতাম। মনে হতো আহ্,  সবকিছু কত সুন্দর, আনন্দের। তখন থেকেই সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অন্যরকম একটা টান তৈরি হয়। 

বাবা যখনই বাইরে থেকে আসতেন, আমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার মুখের উপর থেকে কাঁথা সরিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলতেন, “আমার মা, আমার চাঁদ "।

আরও একটু বড় হলাম।  অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ি।  হঠাৎ করে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে। গৃহশিক্ষক রেখে পড়ার মত সামর্থ্য আমাদের নাই। গৃহশিক্ষকের কাছে আমার গণিত পড়াটা জরুরী। মা আমাদের এক আত্মীয়কে অনুরোধ করলেন আমাকে গণিতে সহযোগিতা করতে। তিনি তখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তেন, ঢাকায় কোন একটি কলেজে। ছুটিতে প্রায়ই গ্রামে চলে আসতেন। আমাকে তিনি বিনা বেতনে পড়িয়েছিলেন খুব আন্তরিকতার সাথে। প্রতিদিন বিকেলে ঠিক সময় মতো উপস্থিত হতেন। যতক্ষণ ধরে পড়া যায় পড়তাম। সময় হিসেবে করতেন না ।

পোড়াদিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমার পড়াশোনা এ স্কুলটিতে। নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার পোড়াদিয়া গ্রামে এ স্কুলে।

স্কুলের বন্ধুদের ভালোবাসায় ঘেরা ছিলাম। আমরা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়তাম। নবম শ্রেণিতে পড়ি।  এক ছেলে সহপাঠী আমার থেকে একবার একটি বই ধার নিলো। কোনো কারণে আমাকে না পেয়ে আমার সহপাঠী একটি মেয়ে বন্ধুকে বইটা দিয়ে বললো আমাকে পৌঁছে দিতে। পরে শুনতে পেয়েছিলাম, ওই ছেলেটি আমার বইয়ের ভেতরে একটি চিঠি দিয়েছিল যেটি আমার মেয়েবন্ধুটি দেখেছিল। মেয়েবন্ধুটি আমাকে বইটি দিয়েছিল চিঠিটি সরিয়ে নিয়ে। আর ওই ছেলেটিকে বলেছিল- এরকম আর করবে না, ওর মন বিক্ষিপ্ত হবে, পড়ার ক্ষতি হবে।  

মেয়েবেলায় সারা বছরই আমার হাঁটুতে ক্ষত থাকতো। সময়টা পুরো মাধ্যমিক জুড়ে।  বিকেলগুলোতে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরেই খাবার খেতাম। ততক্ষণে আমার খেলার সাথীরা জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো আমার জন্য। আমি বলতাম, হাতের লেখা দুটো লিখে আসি। ওরা অপেক্ষা করতো। তারপর বাড়ির পাশের সমতল জমিগুলোতে চলতো গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, বউচি, হাডুডু ইত্যাদি সকল খেলা। বিকেলের মিষ্টি রোদে বাড়ির বাইরের উঠোনে মা-মামীরা দাঁড়িয়ে আমাদের খেলা দেখতেন প্রায়ই।  মনে হতো তাদের মনটাও আমাদের মতো উচ্ছ্বল। শীতের বিকেলে খুব দ্রুত সূর্য অস্ত যেত বলে খেলা ছেড়ে বাড়িতে আসতে পারতাম না সন্ধ্যার আগে কোনও দিনও। মা বাড়ির বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে উঁচুস্বরে ডাকতেন। ফিরতে দেরি হয়ে যাওয়াতে বহুদিন মায়ের হাতের পিটুনিও খেয়েছি।

গণিত ও  ইংরেজি বিষয় শিক্ষকদের কাছে আলাদাভাবে পড়াটা অনেকের জন্য দরকারী।  আমার কাছের বন্ধুটি ইংরেজি শিক্ষকের কাছে স্কুলে প্রাইভেট পড়তো। ওর বাড়ি ছিল আমাদের ওই ইংরেজি শিক্ষকের বাড়ির কাছেই। একদিন স্যার ওকে ডেকে উনার বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট পড়তে বললেন। আমার বন্ধুটি যায়নি, ওর ভীষণ ভয় কাজ করছিলো। কারণ ওই স্যার স্কুলে প্রাইভেট পড়ানোর সময় প্রায়ই আমার বন্ধুকে টেবিলের নিচে পা দিয়ে খোঁচা দিতো। সেদিনই ও বুঝতে পেরেছিল উনি কেন বাড়িতে পড়তে যেতে বলেন। তার বাড়িতে ওর না যাওয়ার কারণে প্রত্যেক ক্লাসে পড়া না পাড়ার অজুহাতে ওই শিক্ষক আমার বন্ধুটিকে বেত্রাঘাত করতেন। আমরা কাছের দুই বন্ধু জানতাম ব্যাপারটি। একবার ভাবলাম স্কুলে অন্য স্যারকে বলে দেব। আমার বন্ধুটি অনুরোধ করলো, এতে করে ওর আরো ক্ষতি করবেন উনি। আমাদেরকেও বিভিন্নভাবে হেনস্থা করতে পারেন। আমার বন্ধুটি বেঁচে নেই। ওর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি মনে পড়লে এখনো অসহ্য লাগে।

আরেকটু বড় হলাম।  ঢাকার একটি কলেজে পড়ি। খুব নামকরা অন্য একটি কলেজের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে জীববিদ্যা পড়তে যাই। পড়ানোর সময় শিক্ষকটি তার চতুর্পাশে ঘিরে মেয়েদের বসাতেন। শিক্ষকটি নিজ থেকেই বলতেন তুই এখানে বস, তুই আমার পাশে বস ইত্যাদি।  একবার আমাকে বসতে বলা হলো। বসলে পরে যে ধাক্কাটি আমি খেয়েছিলাম, শিক্ষকটি খুব নিপুণভাবে তার কনুই দিয়ে আমার শরীর ও স্তন স্পর্শ করেছিলেন। আমি বুঝতে পেরে উনার থেকে দূরে সরতে লাগলাম। বাড়ি ফেরার পথে আমার খুব কাছের এক বন্ধুকে বললাম। ওর তখন আমার কথাটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল। ওই শিক্ষকের কাছে জীববিদ্যা পড়ার ইতি ওখানেই।

লেখক পরিচিতি: পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দ্রেসদেন বিশ্ববিদ্যালয়, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোমবিশ্ববিদ্যালয়ে। পোস্ট ডক্টরেট সম্পন্ন করেছেন জার্মানির দ্রেসদেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্টকহোমে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!

আরও পড়ুন