হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়ল ‘সবচেয়ে বড়’ ধূমকেতু নিউক্লিয়াস

ধূমকেতুটির নাম বেশ খটমটে, সি/২০১৪ ইউএন২৭১; আরেক নাম বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন। হাবল টেলিস্কোপে এর তুষারাবৃত কঠিন কেন্দ্রভাগ বা নিউক্লিয়াসের পরিসর মেপে দেখার পর নাসার জ্যোতির্বিদরা বলছেন, এতবড় নিউক্লিয়াস এর আগে দেখেননি তারা। 

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন ধূমকেতুটির নিউক্লিয়াসের ব্যাস প্রায় ৮০ মাইল; যা না কি যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের চেয়েও বড়।

চেনাজানা বেশিরভাগ ধূমকেতুর চেয়ে বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন এর নিউক্লিয়াস আকারে প্রায় ৫০ গুণ বড়।

এর আগে দেখা সবচেয়ে বড় ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসটি ছিল ৬০ মাইল বিস্তৃত; যা ২০০২ সালে আবিষ্কার করেছিল গবেষণা সংস্থা লিংকন নিয়ার-আর্থ এস্টেরয়েড রিসার্চ (লিনিয়ার)। 

নতুন দেখা ধূমকেতুটির নিউক্লিয়াসে জমা থাকা ৫০০ ট্রিলিয়ন টন ভর হতবাক করেছে বিজ্ঞানীদের। যে কোনো সাধারণ ধূমকেতুর চেয়ে এই ভর একশ হাজার গুণ বেশি। 

বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন ধূমকেতুটি ঘণ্টায় ২২ হাজার মাইল বেগে গড়িয়ে যাচ্ছে সৌরজগতের প্রান্ত থেকে।

নাসা বলছে, এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সবচেয়ে বেশি কাছে এলেও বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন সূর্য থেকে এক বিলিয়ন মাইল দূরে থাকবে। ওই দূরত্ব মোটামুটি শনি গ্রহের কাছাকাছি। আর ওই দূরত্ব পর্যন্ত পৌঁছতে লেগে যাবে ২০৩১ সাল।  

যেভাবে দেখা যাবে ধূমকেতু নিওওয়াইজ

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলসের প্ল্যানেটরি সায়েন্স ও অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক এবং ‘দ্য অ্যাস্ট্রোপিজিকাল জার্নাল লেটার’ গবেষণাপত্রের লেখক ডেভিড জিইউট বলেন, “আমরা শুরু থেকে ধারণা করে আসছিলাম এটা বিশাল কিছু হবে আকারে; কারণ এটা দূর থেকেও দারুণ উজ্জ্বল। এখন তো দেখতে পাচ্ছি, এটা সত্যিই তাই।”

চিলির চেরো টলোলো ইন্টার-আমেরিকান অবজারভেটরিতে ‘ডার্ক ইমেজ সার্ভে’ থেকে সংরক্ষিত ছবি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সি/২০১৪ ইউএন২৭১ ধূমকেতুটি আবিষ্কার করেন জ্যোতির্বিদ পেদ্রো বার্নাডিনেলি ও গ্রে বার্নস্টাইন। তাদের নামেই এ ধূমকেতুকে বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন বলা হচ্ছে।  

২০১০ সালের নভেম্বর মাসে ধূমকেতুটি যেভাবে নজরে আসে; তাকে রীতিমত দৈবযোগ বলছে নাসা।

ওই সময় সি/২০১৪ ইউএন২৭১ সূর্য থেকে তিন বিলিয়ন মাইল দূরে ছিল; যা প্রায় নেপচুনের দূরত্বের কাছাকাছি। তখন থেকেই পৃথিবী ও মহাকাশের টেলিস্কোপে নজর রেখে চলেছে ধূমকেতুটির ওপর।

“এটা সত্যিই বিস্ময়কর বস্তু। সূর্য থেকে এখনও দূরে থাকার পরও এটি ভীষণ সক্রিয়”, বললেন গবেষণাপত্রের মুখ্য লেখক ও তাইপের ম্যাকাও ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলজির মান-টো-হুই।

তিনি বলেন, “আমরা ধারণা করেছিলাম এই ধূমকেতু আকারে একটু বড়ই হবে; কিন্তু নিশ্চিত কিছু বলার জন্য আমাদের আরও ভালো তথ্যপ্রমাণ দরকার ছিল।”

আর সে কারণে এ বছর ৮ জানুয়ারি হাবলে ধূমকেতুটির পাঁচটি ছবি তোলে তার গবেষণার দলটি।

চারদিকে ঘিরে থাকা ধুলোর মেঘ থেকে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রকে আলাদা করে এর আয়তন মেপে নেওয়াটাই ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। ধূমকেতুর বাকি অংশ এর কেন্দ্রে থেকে বেশ দূরে থাকায় হাবলে দেখে ওই সমস্যা মেটানো যাচ্ছিল না। উল্টো টেলিস্কোপে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি দেখা যেত ধূমকেতুটির কেন্দ্রের দিকে।

এরপর হুইয়ের গবেষক দল একটি কমপিউটার মডেল বানায় ধূমকেতুর অবয়বের; আর সেটা হাবলে তোলা ছবির সাথে মেলানোর চেষ্টা করে। এরপরই কেন্দ্র থেকে ধূমকেতুর বাকি অংশ আলাদা করে স্পষ্ট হয় তাদের কাছে।

উজ্জ্বলতার সব রকম উপাত্ত চিলির আটাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাবমিলিমিটার অ্যারে (আলমা) রেডিও টেলিস্কোপ দিয়েও তুলনা করে দেখেন গবেষকরা। তাতে কাছাকাছিই ফল মেলে।

তবে আগে যেমন ভাবা হয়েছিল, এ ধূমকেতুর কেন্দ্র তারচেয়েও অন্ধকার বলে জানালেন জিইউট।  

মহাকাশের যেখানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ধূমকেতুর বাসা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ওর্ট ক্লাউড, সেখান থেকে এই ধূমকেতুর জন্ম হয়েছে বলেছে অনুমান করছেন জ্যোতির্বিদরা। এক মিলিয়ন বছর ধরে সূর্যর দিকে ছুটে যাচ্ছে এই ধূমকেতু।

এমন বিশাল আকারের ধূমকেতু সূর্য ও কোনো গ্রহের দিকে তখনই ছুটে যায় যদি তাদের কক্ষপথ কোনো পাশ দিয়ে চলে যাওয়া নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণ টানের কারণে বিচ্যুত হয়। বিষয়টিকে জ্যোতির্বিদরা তুলনা করেন গাছে ঝাঁকি দিলে আপেল ঝরে পড়ার সঙ্গে।

ধূমকেতু বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন ৩০ লাখ বছর উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করে সূর্য থেকে অর্ধেক আলোকবর্ষ দূরে পৌঁছেছে।

সূর্য থেকে এখন দুই বিলিয়ন মাইলেরও কম দূরে রয়েছে এ ধূমকেতু; আর সৌরজগতের সমতলে প্রায় খাড়াভাবে ছুটে চলেছে। এই দূরত্বে ধূমকেতুটির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে প্রায় ৩৪৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

বার্নাডিনেলি-বার্নস্টাইন পর্যবেক্ষণ করে ওর্ট ক্লাউডে থাকা ধূমকেতুগুলোর আকার ও মোট ভর নিয়ে সম্যক ধারণাও পাচ্ছেন গবেষকরা।  তাদের অনুমান ওর্ট ক্লাউডের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে ২০ গুণ বিস্তৃত হতে পারে।

''

ওর্ট ক্লাউড নিয়ে ১৯৫০ সালে প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন ডাচ জ্যোতির্বিদ জান ওর্ট। যদিও ওর্ট ক্লাউড এখন পর্যন্ত একটি অনুমান হিসেবেই রয়েছে। অগুণতি ধূমকেতু মিলে ওর্ট ক্লাউড বেশ অস্পষ্ট ও দূরে বলে একে ঠিক মত পর্যবেক্ষণ করা যায় না।

ধারণা করা হয়, নাসার এক জোড়া ভয়েজার মহাকাশযান ৩০০ বছরেও ওর্ট ক্লাউডের ভেতরে পৌঁছাতে পারবে না। আর ওর্ট ক্লাউড পেরিয়ে যেতে লাগতে পারে ৩০ হাজার বছর।