জেমির চোখে বাছাইয়ে ব্যর্থতা, স্বস্তি, প্রাপ্তি

বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে কোচ জেমি ডে। ফাইল ছবি
৮ ম্যাচ ৬ হার, ২ ড্র। প্রাপ্তি কেবল ২ পয়েন্ট। প্রাক-বাছাইয়ে বাংলাদেশ লড়াই শেষ করেছে আরও একবার গ্রুপের তলানিতে থেকে। অবশ্য আপাত স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে এএফসির নতুন সিদ্ধান্ত। এতে এশিয়ান কাপের তৃতীয় ও চূড়ান্ত বাছাইয়ে প্লে-অফ খেলতে হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের বাছাইয়ের দ্বিতীয় ধাপে দলের পারফরম্যান্স ও প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্নটা ঠিকই থেকে যাচ্ছে।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ও ২০২৩ এশিয়ান কাপের বাছাইয়ের দ্বিতীয় রাউন্ড বাংলাদেশ শুরু করেছিল আফগানিস্তানের কাছে ১-০ গোলে হেরে। শেষেও সঙ্গী হয়েছে ওমানের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হারের বিষাদ। মাঝে প্রাপ্তি বলতে কলকাতার সল্ট লেকে ভারতের বিপক্ষে ১-১ ড্র এবং কাতারের দোহায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১-১ ড্র।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশের সবশেষ জয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সেবার লেবাননের মাঠে ৪-০ গোলে হেরে আসার পর ফিরতি লেগে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল দল। এরপর সময়ের ডানায় চেপে পেরিয়ে গেছে ১০টি বছর; জয় এখনও অধরা।

এবারের দ্বিতীয় ধাপে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের নিয়মিত, অনিয়মিত মিলিয়ে খেলেছে চার দল-বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। চার দলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শ্রীলঙ্কার উপরে। ৮ ম্যাচ এক জয় ও চার ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট ভারতের। এক জয় ও তিন ড্রয়ে ৬ পয়েন্ট আফগানিস্তানের। ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে উত্তর কোরিয়া সরে দাঁড়ানোয় শ্রীলঙ্কা ৬ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে। সবগুলোতে হেরে খুলতে পারেনি পয়েন্টের খাতা।

‘ই’ গ্রুপের পাঁচ দলের মধ্যে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে সবার পেছনে থাকা দল বাংলাদেশ; ১৮৪তম। কাছাকাছি ছিল আফগানিস্তান (১৪৯তম)। বেশ কিছুটা দূরে ভারত (১০৫তম)। ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল কাতার (৫৮তম) ও ওমান (৮০তম)। গ্রুপে সবচেয়ে কম গোল (৩টি) দিয়ে বেশি গোল হজম (১৯টি) করা দলও বাংলাদেশ।

এই তিন গোলের কোনোটিই আসেনি মূল স্ট্রাইকারের পা থেকে। সল্ট লেকে ভারতের বিপক্ষে গোল করেছিলেন উইঙ্গার সাদ উদ্দিন, ওমানের বিপক্ষে প্রথম লেগে ৪-১ ব্যবধানে হারা ম্যাচে মিডফিল্ডার বিপলু আহমেদ এবং সবশেষ কাতারে আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে ১-১ ড্র ম্যাচে সমতা ফিরিয়েছিলেন ডিফেন্ডার তপু বর্মন।

বাছাইয়ে আট ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১টি ম্যাচ বাংলাদেশ খেলার সুযোগ পেয়েছিল নিজেদের মাঠে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচে ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক কাতারের কাছে ২-০ গোলে হেরেছিল দল।

নিজেদের শেষ তিন ম্যাচে ভারত, আফগানিস্তান ও ওমানের বিপক্ষে খেলার কথা ছিল ঘরের মাঠে। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ফিফা ও এএফসি সিদ্ধান্ত পাল্টে সবগুলো ম্যাচ নিয়ে যায় দোহায়। ফলে প্রতিপক্ষের মাঠে ও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে মোট ৭টি ম্যাচ খেলতে হয়েছে দলকে।

‘কাতার পর্বে’ খেলা তিন ম্যাচে জেমি পাননি পূর্ণ শক্তির দল। আগের ম্যাচগুলোয় কখনও চোটের কারণে তপু বর্মন, কখনও মাশুক মিয়া জনির খেলা হয়নি। কিন্তু এবার কাতারে যাওয়ার আগেই দলে হানা দিয়েছিল চোট। ফরোয়ার্ড নাবীব নেওয়াজ জীবন হাটুঁর চোটে ছিটকে গিয়েছিলেন আগে।

ক্যাম্প শুরুর পর ফরোয়ার্ড সাদ উদ্দিন, গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা, ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষ বাদ পড়েন চোটের শিকার হয়ে। করোনাভাইরাসে আক্রান্তে হয়ে দলের সঙ্গী হতে পারেননি ফরোয়ার্ড মাহবুবুর রহমান সুফিল। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শুরুর দিকে কাতারে যেতে পারেননি ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ ইব্রাহিমও।

কাতারে যাওয়ার পর চোটে পড়ে ভারত ও ওমানের বিপক্ষে খেলতে পারেননি মিডফিল্ডার সোহেল রানা। ওমানের বিপক্ষে চোটে খেলা হয়নি জনির; কার্ডের কারণে নিষিদ্ধ ছিলেন অধিনায়ক জামাল ভূইয়া, ডিফেন্ডার রহমত মিয়া ও মিডফিল্ডার বিপলু।  

বাছাইয়ের দ্বিতীয় ধাপে প্রত্যাশার ছিটেফোঁটা প্রতিদান দিতে পারেননি ফরোয়ার্ডরা। কোচ জেমির ৪-৩-২-১ বা ৪-৩-৩ রক্ষণাত্মক কৌশলও সফল হয়নি খুব একটা। তারপরও খুশি এই ইংলিশ কোচ। বাছাইয়ের পারফরম্যান্স নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন সন্তুষ্টির কথা। বাকি দলগুলোর সঙ্গে পার্থক্য জানাতেও অবশ্য ভোলেননি।

“আমি মনে করি, সবগুলো ম্যাচে ছেলেরা খুবই ভালো পারফরম করেছে এবং এই ম্যাচগুলো থেকে অনেক কিছু শিখেছে। প্রতিপক্ষের মাঠে ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের ছাড়া খেলা দলের জন্য সহায়ক নয়।”

“বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মানের পার্থক্যটা যে খুব বেশি, বাছাই মূলত সেটাই দেখাল। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামোর পরিবর্তন না করলে এই ব্যবধান কখনও ঘোঁচানো যাবে না।”

২০১৮ বিশ্বকাপ ও ২০১৯ এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে প্লে-অফের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখের ছিল না বাংলাদেশের। সেবার তলানিতে থেকে গ্রুপ পর্ব শেষ করার পর প্লে-অফে ভুটানের নিজেদের মাঠে ড্রয়ের পর অ্যাওয়ে ম্যাচে ৩-১ গোলের ভরাডুবি হয়েছিল। ২০১৬ সালের ওই বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ১৬ মাসের জন্য নির্বাসনে গিয়েছিল দল! এবার দলকে পেরুতে হচ্ছে না প্লে-অফের বৈতরণী। জেমিও ভাবতে বসেছেন এশিয়ান কাপের বাছাই নিয়ে।

“দেখব অগাষ্টে বাছাইয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরা কাদেরকে পাই। এশিয়ান কাপের বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ পাওয়ায় আমি খুশি। ছেলেরা এটা পাওয়ার যোগ্য। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করতে হলে এবং আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে বাকি বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে কোচিং করাতে হবে।”

২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হাল ধরার পর ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামো, এর পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকবারই বলেছেন জেমি। জয়হীন থেকে বাছাই শেষের পরও বললেন একই কথা। জেমি শুধু বলতে পারেন, দিতে পারেন পরামর্শ। বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের।

ওমান ম্যাচে বিপলু আহমেদ ( বাঁ দিক থেকে প্রথম), রহমত মিয়া (চতুর্থ), মাশুক মিয়া জনি (পঞ্চম) ও জামাল ভূইয়াকে (সপ্তম) পাচ্ছে না বাংলাদেশ।