ফেইসবুক থেকে দূরে সরছে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্টরা

ছবি: রয়টার্স
অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মার্কিন সিনেটরদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হাজির হয়েছিলেন টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট এবং ইউটিউবের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তবে, চার ঘণ্টার প্রশ্ন-উত্তরে নজরে এসেছে ফেইসবুকের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ফেইসবুক। বিবিসি জানিয়েছে, সিনেটরদের সামনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা ফেইসবুকের তুলনায় নিজেদের আলাদা প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও, “ফেইসবুকের থেকে আলাদা হতে পারা কোনো রক্ষাকবচ নয়”-- বলা হয়েছে তাদের।

সিনেটররা বলেন, “মান এমনিতেই গোল্লায় গেছে। আপনারা যে আলাদা, এটা বলা কোনো রক্ষাকবচ নয়।”

নিজের বক্তব্যের শুরুতেই মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল বলেন, “একই ক্ষতির গল্প আমরা বারবার শুনছি। মূল সমস্যা পরিষ্কার--বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা কামাতে শিশু কিশোরদের পুঁজি করছে। আপনারা যাই করেন সেটা ব্যবহারকারী বাড়ানোর জন্য, বিশেষ করে শিশুদের আকৃষ্ট করে তাদের আপনাদের অ্যাপে ধরে রাখার জন্য। ”

“এবার জবাবদিহিতা থাকবেই - এখন সময় পাল্টেছে।”

সামাজিক মাধ্যমের ‘অ্যান্টিডোট’ স্ন্যাপচ্যাট

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাবের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ফেইসবুক, দাবি উঠেছে কঠোর নীতিমালা ও আইনের। তবে স্ন্যাপচ্যাট বলছে তারা একই শ্রেণিতে পড়ে না।

“স্ন্যাপচ্যাট তৈরিই হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমের অ্যান্টিডোট হিসেবে।”-- মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক জননীতিবিষয়ক ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেনিফার স্টাউট। “আমরা নিজেদের ক্যামেরা কোম্পানি বলে ব্যাখ্যা করি”-- যোগ করেন তিনি।

নিজেদের সামাজিক মাধ্যম বলতে নারাজ টিকটকও। সিনেটরদের প্রতিষ্ঠানটির জননীতি বিভাগের প্রধান মাইকেল বেকারম্যান বলেন, “টিকটক ফলোয়ার নির্ভর সামাজিক মাধ্যম নয়। আপনি টিকটক দেখবেন, এবং নিজেই টিকটক বানাবেন।”

উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময়ে অ্যালগরিদম নিয়ে বিতর্কিত হয়েছে টিকটকও; অভিযোগ উঠেছে টিকটকের অ্যালগিরদম কিশোর বয়সীদের নেতিবাচক কন্টেন্ট দেখায়।

মাদকাসক্তের গল্প!

সম্প্রতি মার্কিন সিনেটের এক সাবকমিটিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ফেইসবুকের সাবেক ডেটা অ্যানালিস্ট ফ্রান্সেস হাউগেন। ফেইসবুকের বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে সরবরাহও করেছিলেন তিনি। ফেইসবুকের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দৈনিকটি জানায়, কিশোর বয়সীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ইনস্টাগ্রামের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে জেনেও সেটি অগ্রাহ্য করে গেছে ফেইসবুক।

সিনেটে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হাউগেন জানান, ফেইসবুকের নিজস্ব গবেষণাই এই সমস্যাকে “একজন মাদকাসক্তের গল্প” বলে আখ্যা দিয়েছে-- যেখানে শিশুরা অখুশি হয়েও অ্যাপের ব্যবহার থেকে নিজেদের থামাতে পারে না।”

তবে ফেইসবুক প্রধান মার্ক জাকারবার্গ বরাবরই দাবি করে আসছেন যে তার প্রতিষ্ঠান নেতিবাচক কন্টেন্ট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। “নিরাপত্তা, সুস্থ জীবন আর মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেই” বলে ফেইসবুক কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক পোস্টে দাবি করেছেন তিনি।

আইন যখন রক্ষাকবচ!

বিবিসি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সেন্সরশিপ এবং ভুয়া তথ্যের প্রচার নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন আইনপ্রণেতারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ‘সেকশন ২৩০’ আইনটি সামাজিক মাধ্যমগুলোকে মামলা হওয়া থেকে রক্ষা করছে বলে মনে করছেন অনেকে।

প্রাথমিক অবস্থায় আইনটি বিবেচিত হয়েছে ‘বিটি’ এবং ‘কমকাস্টে’র মতো ইন্টারনেট সেবাদাতাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে। বর্তমানে আইনটি ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মামলা হওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

আইনটি পরিবর্তনের সময় এসেছে বলে দাবি তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের একাধিক সদস্য। সামাজিক মাধ্যমগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন বলে সোচ্চার হয়েছেন অনেকেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সেকশন ২৩০ সংশোধনের কথা বলেছিলেন।