মিয়ানমারে পুলিশের ব্যাপক দমনাভিযান, গ্রেপ্তার ৪৭০

মিয়ানমারের শহর ও নগরগুলোতে সামরিক শাসন বিরোধী প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান পরবর্তী সবচেয়ে ব্যাপক দমনাভিযান চালিয়েছে পুলিশ।

শনিবারের এ দমনাভিযানে কয়েকশত প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার, গুলি ও অন্তত একজন আহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।

জতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের দূত অভ্যুত্থানকারীদের থামাতে ‘প্রয়োজনীয় যে কোনো ব্যবস্থা নিতে’ জাতিসংঘকে আহ্বান জানানোর একদিন পর সহিংসতার এ ঘটনা ঘটেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে।

এ দিন রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার দায়ে মিয়ানমারের জাতিসংঘ দূতকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কিন্তু জান্তাকে এখনও মিয়ানমারের নতুন সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি জাতিসংঘ।      

প্রতিবাদ থামাতে এ পর্যন্ত সবচেয়ে দৃঢ় উদ্যোগ নিয়ে শনিবার সকাল থেকেই দেশটির শহর ও নগরগুলোতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গনে সচরাচর যে সব স্থানগুলোতে প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয় সেখানে অবস্থান নেয় পুলিশ। লোকজন জড়ো হওয়া শুরু করার পরপরই ধরপাকড় শুরু হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এ সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও আটক করা হয়।

লোকজন আবার শ্লোগান দিতে দিতে ও গান গাইতে আশপাশ থেকে বের হয়ে আসে। পুলিশ তাদের দিকে এগিয়ে এলে তার আবার আশপাশের গলিতে ও ভবনে ঢুকে পড়ে। তাদের দমাতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে, স্টান গ্রেনেড ফাটায় ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

পুলিশ মুগুরধারী কিছু লোককেও সেখানে মোতায়েন করে বলে জানিয়েছেন তারা। 

কিছু বিক্ষোভকারী রাস্তার অপর পাশ থেকে সড়ক অবরোধ ছুড়ে মারে। পরে লোকজনের সংখ্যা কমে গেলেও স্থানীয় সময় সন্ধ্যার আগেও পুলিশ প্রতিবাদকারীদের বিভিন্ন দলকে তাড়া করছিল ও ওপরের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পুলিশ সারাদিন ধরে অসংখ্য লোককে আটক করে ও বেশ কয়েকজনকে পেটায়।

রাষ্ট্রায়ত্ত এমআরটিভি টেলিভিশন জানিয়েছে, সারা দেশ থেকে ৪৭০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের আগে পুলিশ তাদের সতর্ক করেছিল বলে জানিয়েছে তারা।

“কোনো কারণ ছাড়াই লোকজন রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে কারা প্রতিবাদ আয়োজনের সঙ্গে জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে,” বলেছে এমআরটিভি।

অধিকার আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ‘অ্যাসিসট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার’ বলেছে, গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে বিশ্বাস তাদের, কারণ ১০টি প্রিজন বাসের প্রত্যেকটিতে ৪০ থেকে ৫০ জন করে নিয়ে ইয়াঙ্গনের ইনসেইন কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

যাদের আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আছেন বলে তাদের গণমাধ্যম সংস্থাগুলো ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন। 

“লোকজন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাচ্ছিল কিন্তু তারা অস্ত্র নিয়ে আমাদের হুমকি দেয়,” রয়টার্সকে বলেন তরুণ আন্দোলনকারী শার ইয়ামোনে।

“প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলা এই সামরিক হুমকির অবসানের জন্য আমরা লড়াই করছি,” বলেন তিনি।      

দেশের অন্যান্য শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর মান্দালয় ও উত্তর থেকে দক্ষিণের বিভিন্ন শহরেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা ও গণমাধ্যম জানিয়েছে।

মান্দালয় থেকে যাদের আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে মিয়ানমার পার্লামেন্টের এনএলডির সদস্য উয়িন মিয়া মিয়াও আছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। পার্লামেন্টে এনএলডির যে দুই জন মুসলিম সদস্য রয়েছেন মিয়া মিয়া তাদের একজন।

মধ্যাঞ্চলীয় শহর মনুইয়াতে এক নারী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম সেভেনডে নিউজ ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা জানিয়েছেন। এর আগে সেভেনডে ও আরও দুটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই নারী মারা গেছেন বলে জানানো হয়েছিল। 

এর আগে শহরটির একজন প্রতিবাদকারী জানিয়েছিলেন, একদল বিক্ষোভকারীকে ঘিরে ফেলার পর পুলিশ জলকামান থেকে পানি ছুড়েছিল। 

“তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে জলকামান ব্যবহার করেছে, তাদের মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়,” রয়টার্সকে বলেছেন প্রতিবাদকারী আয়ে আয়ে তিন্ত।

এক আন্দোলনকারীর ভিডিও ফিডে দেখা গেছে, পরে প্রতিবাদকারীদের বিশাল একটি মিছিল জান্তা বিরোধী শ্লোগান দিয়ে শহরটি সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করছে।

একজন প্রতিবাদকারী রয়টার্সকে জানিয়েছেন, জনতা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক লোকজনের মুক্তি দাবি করেছে। 

নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ব্যাপক জয় পেলেও তার স্বীকৃতি না দিয়ে সেনাবাহিনী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখল করে। নির্বাচিত নেত্র্রী সু চি ও এনএলডির অধিকাংশ নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারবন্দি করে রাখে। এর পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

চলতি সপ্তাহে সু চিকে গৃহবন্দি থেকে অজ্ঞাত একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এনএলডির কর্মকর্তারা এমনটি বলেছেন বলে শুক্রবার দেওয়া উদ্ধৃতিতে জানিয়েছে স্বনির্ভর বার্তা সংস্থা ‘মিয়ানমার নাও’ ওয়েবসাইট। তারপর থেকে সু চি কোথায় আছেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। 

অভ্যুত্থানের পর থেকে তিন সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিন সামরিক শাসন বিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। কোনো কোনো দিন বিক্ষোভে লাখ লাখ প্রতিবাদকারী যোগ দিয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলো অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে, কয়েকটি দেশ সীমিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।

দেশটির সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেছেন, প্রতিবাদ মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষ গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করছে এবং পুলিশ রবার বুলেট ব্যবহারের মতো ন্যূনতম শক্তি ব্যবহার করছে।

তারপরও প্রতিবাদ সমাবেশগুলোকে ঘিরে সহিংসতায় এ পর্যন্ত তিন বিক্ষোভকারী ও একজন পুলিশ নিহত হয়েছেন।

রোববারও প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।