নাগাল্যান্ডে ভুল করে শ্রমিক হত্যার ঘটনায় সহিংসতা বাড়ছে

ভুলবশত জঙ্গি ভেবে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১৪ জন সাধারন মানুষ হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রত্যন্ত উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ডে সহিংসতা বাড়ছে।

বিক্ষোভকারীরা ভারতীয় বাহিনীর একটি ক্যাম্পের চারপাশের এলাকায় আগুন দিয়েছে, ছুড়ে মেরেছে পাথর। নতুন করে সহিংতায় ঘটনার পরদিন গুলিতে এক ব্যক্তি নিহতও হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

নাগাল্যান্ডের মন জেলায় শনিবার রাতে ওটিং গ্রামে নিরাপত্তারক্ষীরা সন্ত্রাস দমন অভিযান চালানোর সময় স্থানীয় জঙ্গি সংঠন এনএসসিএন-এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিরীহ সাধারণ নাগরিকদের উপর গুলি চালায় বলে অভিযোগ আছে।

ওটিং গ্রামের একদল কয়লা শ্রমিক একটি পিক-আপ মিনি ট্রাকে করে বাড়ি ফেরার সময় এ ঘটনার শিকার হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামের স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের খুঁজতে গিয়েছিলেন। তারা বেশ কয়েক ঘন্টা ফিরে না আসায় পরে ট্রাকে তাদের লাশ দেখতে পান গ্রামবাসীরা।

এতে সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয়রা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরদিন রোববার মন জেলায় সাধারণ মানুষেরা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেছে।

ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি শিবির থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “বাইরে বিক্ষুব্ধ জনতা পাথর ছুড়ে মারছে।”

নাগাল্যান্ডের কোনিয়াক ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নোকলেম কোনিয়াক ফোনে রয়টার্সকে বলেছেন, “কিছু সময় আগেই আসাম রাইফেলসের গুলিতে একজন নিহত এবং দুইজন আহত হয়েছেন।” কোনিয়াক মন জেলার প্রভাবশালী ছাত্র ইউনিয়ন।

সহিংসতায় সর্বশেষ মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনার ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর বাস। এসব গোষ্ঠীর অনেকগুলোই বিদ্রোহী তৎপরতায় লিপ্ত। নয়া দিল্লি ওই অঞ্চলের সম্পদ লুট করছে এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ভুল করে সাধারন মানুষকে নিশানা করার অভিযোগ প্রায়ই করে থাকে নাগাল্যান্ডের লোকজন। সর্বসম্প্রতি শনিবারে ১৪ শ্রমিক হত্যার ঘটনায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে নাগাল্য়ান্ডে।

ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, “গ্রামে গুলির ঘটনার খবর ছড়িয়ে যেতেই শত শত আদিবাসী সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাম্প ঘিরে ফেলে। তারা আসাম রাইফেলস বাহিনীর গাড়ি পোড়ায় এবং সশস্ত্র সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।”

এরপর আসাম রাইফেলস পাল্টা আক্রমণ করে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের হামলায় ৮ বেসামরিক নাগরিকসহ নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্যও নিহত হয় বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর নিন্দা, তদন্তের নির্দেশ, অমিত শাহের শোক:

ভুল করে সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেফিউ রিও।

রোববার সকালে টুইটারে তিনি বলেছেন, “মন এর ওটিঙে যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।“

ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) তদন্ত করবে এবং আইন মোতাবেক বিচার পাবেন মানুষ। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে শান্তির আবেদন জানাচ্ছি।”

ওদিকে, শোকপ্রকাশ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার রাতের ওই ঘটনার খবরে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত বলে জানিয়েছেন। টুইটে তিনি লেখেন, “ওটিঙের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় শোকাহত। মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। রাজ্য সরকার সিট গঠন করেছে। পুরো ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করবে, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবার যাতে সুবিচার পায়।”

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রোববার নাগাল্যান্ডে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে শ্রমিক হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেছেন। নিহতদের পরিবারের জন্য আন্তরিক সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি।

ঘটনাটি এরই মধ্যে দেশ জুড়েই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গোটা ঘটনায় প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করে বলেছেন, হৃদয়বিদারক ঘটনা। ভারত সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে।

ওদিকে, অসম রাইফেলস বলছে, নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্ভাব্য গতিবিধির খবর পেয়েই তারা অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। সেইসঙ্গে তারা জানিয়েছে, কী কারণে প্রাণহানি হযেছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য ‘কোর্ট অফ এনকোয়ারি’ হচ্ছে। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।