জুমের ‘ভালো ফলনে’ পাহাড়ে কৃষকের হাসি

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর জুম ধানের ফলন ভালো হওয়ায় হাসি ফুটেছে পাহাড়ি কৃষকের।

সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এখন সোনালি রঙের পাকা জুমধান; মৌ মৌ গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। জুমধান কাটার ধুম পড়েছে সবখানে।

সম্পূর্ণ প্রকৃতির আবহাওয়ায় নির্ভর সনাতন পদ্ধতির এ চাষাবাদে এ বছর আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় ফলন ভাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

সমতলের ধান চাষের থেকে জুমক্ষেতে চাষ পদ্ধতি আলাদা। পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে জুম পদ্ধতিতে চাষের জন্য জঙ্গল কেটে আগুন পোড়ানো হয়।

তারপর সেখানে কিছু দূরে দূরে ছোট ছোট গর্ত করে ধানসহ নানান সবজির বীজ একসাথে পুঁতে দেওয়া হয়।

পাহাড়ি জমিতে মার্চে জঙ্গল পুড়িয়ে এপ্রিলে রোপন করা ধান ভাদ্র মাসে পেকে ওঠে।

চার মাস পরিশ্রমের পর এখন জুমক্ষেতে ধান কাটার ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। নতুন ধান ঘরে ওঠার এই সময়ে আনন্দের শেষ নেই জুমিয়া পরিবারের। এরপর কেউ কেউ নিজেদের মত পালন করে নবান্ন উৎসব।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ও জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা এম এম শাহ নেওয়াজ বিডিনিউিজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, জুমচাষ প্রাকৃতিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর নির্ভর। এপ্রিলে এক পশলা বৃষ্টির পর জুমক্ষেতে বিভিন্ন বীজ বপন করা শুরু করেন জুমিয়ারা।

এ বছর দেরিতে বৃষ্টিপাত হলেও নিয়মিত ব্যবধানে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে জুমের ফলন এবং বিভিন্ন ফসল ভাল হয়েছে।

এখন পুরোদমে জুমের ধান কাটা চলছে। পাশাপাশি আনুষঙ্গিক আরও বিভিন্ন ফসল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান এ কৃষি কর্মকর্তা।

সব মিলিয়ে জেলার সব জায়গা থেকে জুমধানের ফলন ভাল হওয়ার খবর পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

ধান ছাড়া পাওয়া যায় বিভিন্ন ফসলও

বান্দরবান সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে মঙ্গলবার চিম্বুক পাহাড়ে যামিনী পাড়া গিয়ে দেখা গেছে- একটি জুমক্ষেতে জুমধান কাটচ্ছেন চারজন ম্রো নারী। সবার পিঠে রয়েছে কাটা ধান জমা করার একটি করে থুরুং (ঝুরি)।

এ সময় কথা হয় জুমচাষি চামপয় ম্রো’র সঙ্গে। তিনি বলেন, “তিন হাড়ি (এক হাড়ি ১০ কেজি) বীজ ধান লাগানো হয়েছে। গত বছর তুলনায় ফলন ভাল হয়েছে; আবহাওয়া ভাল ছিল। ছেলেমেয়ে নিয়ে ছয়জনের সংসারে বছর খোরাকি ধান পাওয়া যাবে।

“জুমক্ষেতে ধান ছাড়াও বিভিন্ন সবজি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, মরিচ, আখ, তুলা, তিল, ঢেঁড়স, বেগুন আরও বিভিন্ন ফসল পাওয়া যায়।”

একটা জুমক্ষেত থাকলে বাজার থেকে তেল ও লবন ছাড়া আর কিছুই কিনতে হয় না বলে জানান চামপয়।

বান্দরবান শহরে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী পাউলেং ম্রো জানান, সপ্তাহে একদিন ক্লাস হওয়ায় বাড়িতে এসেছেন। এই সুযোগে মাকে ধান কাটার কাজে সহযোগিতা দিচ্ছেন।

“চার জন সদস্য তিন দিন ধরে কাটছি। আরও দুদিন হলে কাটা শেষ হয়ে যাবে।”

সেখানে তাইলেং ম্রো নামে আরেক জুমচাষি জানান, এ বছর ফলন নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু চিম্বুক পাহাড়ে আগে যে পরিমাণে জুমচাষ হত তা এখন কমে আসছে। আম, পেঁপে ও বিভিন্ন জাতের কুলসহ লাভজনক ফসলের বাগান করছে অনেকেই।

তবে জুমক্ষেতে এক সাথে অনেক ফসল পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এখনও জুমচাষ করে।

রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নে মংঞো খুমী পাড়ায় কথা হয় কয়েকজন জুমচাষির সঙ্গে।

এ পাড়ার অংলে খুমী বলেন, পাড়ার পাশেই একটা ঢালু জায়গায় তিনিও ৩ হাড়ির ধান জুমচাষ করেছেন। অর্ধেক ধান পেকেছে। অর্ধেক পাকেনি। জুমে মিশ্র ফলসগুলোও ভাল হয়েছে।

নাংলু খুমী ও লেংপা খুমী নামে দুজন জুমচাষি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পাড়া থেকে অনেক দূরে একজনে পাঁচ হাড়ির ধান করে জুমচাষ করা হয়েছে। ফলনও ভাল এসেছে। ধান পাকতে শুরু করেছে এমন সময় থেকে শুকরের পাল এবং বানরের দল এসে ধান নষ্ট করছে। জুমঘরে থেকে সবসময় পাহারা দিয়ে রাখতে হয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ম্রো ভাষার লেখক ও তরুণ গবেষক ইয়াঙান ম্রো জানান, ম্রো ও খুমীদের মধ্যে একসময় সবাই জুমচাষি ছিলেন। বনজঙ্গলে উৎপাদন পদ্ধতির বিকল্প না থাকাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে জুমচাষ করত। কিন্তু তাদের মধ্যে এখন দুর্গম এলাকার বাসিন্দা ছাড়া চাষির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

“জুমক্ষেত থেকে ধান ছাড়া সারা বছরের তরকারি পাওয়া যায়। এই সুবিধার কথা চিন্তা করে এখনও চিম্বুক পাহাড়ে অনেকে জুম চাষ করে থাকে।”

তবে আগে যেভাবে বড় এলাকাজুড়ে জুমচাষ করা হত; এখন সেভাবে হয় না বলে জানান ইয়াঙান।

এ বছর সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে জুমচাষের আবাদ হয়েছে জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এম এম শাহ নেওয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এসব জমিতে হওয়া ককরো, গ্যালন, পিডি, চাকমা চিকন, বিনি, বড়ো ধানের স্থানীয় ঐতিহ্য রয়েছে। তবে বর্তমারে এগুলোর ফলন কম।

‘‘ফলন বাড়ানোর জন্য নুতন উচ্চ ফলনশীল জাত প্রচলনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কৃষকরাও সাদরে গ্রহণ করছে। প্রদশর্নী ও প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় বিগান-৪৮ জাতের ৩২৮ হেক্টর জমিতে এবং ৮৩ নামের একটা উচ্চ ফলনশীল ধান এক হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।”

তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে মোটিভেশন করে কাজ করানো যায় তাহলে উচ্চ ফলশীল জাতের ধান লাগানো যায়।’’

তবে দিন দিন জুমের উপযোগী পাহাড় কমে যাচ্ছে মন্তব্য করে এ কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, এক বছর এক পাহাড়ে জুমচাষের পর আবার একই পাহাড়ে ঘুরে আসতে হয়। মাটির ঊর্বরতার জন্য মাঝখানে কয়েক বছর বিরতি দেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

‘‘তাতে করে পাহাড়ে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। বিভিন্ন ফসলের উফসী জাতগুলো প্রচলনের চেষ্টা করা হচ্ছে; যাতে অল্প জমিতে উৎপাদন বেশি থাকে।’’

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের পরিচালক মংনুচিং মারমা জানান, প্রতিবছর জুম ফসল ঘরে তোলা শেষে এই প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। একেক বছর একেক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে করা এই নবান্ন উৎসবে জুমের ফলস প্রদশর্নী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানোর আয়োজন করা হয়ে থাকে।

এ বছরও অনুষ্ঠান আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

ধান ও ফসল রাখার জন্য জুমঘর

জুমচাষিরা জানান, প্রত্যেক জুমক্ষেতে একটি করে জুমঘর রয়েছে। সেখানে ধান এবং জুমের বিভিন্ন ফসল জমা করে রাখা হয়। ধান মাড়াইয়ের কাজও চলে সেখানে। ফসল ঘরে না উঠা পর্যন্ত প্রায় তিন মাস যাবত জুমঘরে অবস্থান করেন চাষিরা।

সামনে একটা ছাদহীন মাংচার মত রেখে সম্পূর্ণ গাছ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় জুমঘর। যেখানে শুকানো হয় ধান।

পশুপাখি ও বন্যপ্রাণি আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য জুমঘরে বসে পাহারা দিতে হয় চাষিদের।