কুয়েট শিক্ষকের মৃত্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা চলছে: ছাত্রলীগ নেতা

খুলনা প্রেস ক্লাবে বক্তব্য দিচ্ছেন কুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক সেলিম হোসেনের মৃত্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান।

তার অভিযোগ, ওই শিক্ষকের মৃত্যুকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘কুচক্রী মহল’ নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছে।

খুলনা প্রেসক্লাবে শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন।

মঙ্গলবার দুপুরে ক্যাম্পাসের বাসায় শৌচাগারে অচেতন হয়ে পড়ার পর ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও লালন শাহ হলের প্রভোস্ট সেলিমকে হাসপাতালে নেওয়া হয়; সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই দিন বাসায় ফেরার আগে তাকে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঞ্ছিত করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে; যদিও তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটি গঠনের দুদিন বাদে বৃহস্পতিবার দুই সদস্য কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এদিকে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সিন্ডিকেট সভা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে; এরপর আবাসিক শিক্ষার্থীদের বিকাল ৪টার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন কুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান।

ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস বিভাগের অধ্যাপক সেলিম হোসেনের অকাল মৃত্যুতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, সেলিম হোসেন ১১ মাস আগে কুয়েটের লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। যখনই কোনো নতুন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ পান, তখন ছাত্রকল্যাণ কমিটির পক্ষ থেকে প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে হলের ফাইনাল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

ওইদিন অধ্যাপক সেলিম হোসেনের সঙ্গে দেখা করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সেজান বলেন, “শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিতি হওয়া এবং হলের নানা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানানোর জন্য মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় প্রাধ্যক্ষ নিজ কার্যালয়ে একটি মিটিং নির্ধারণ করেন।

“ক্লাস শেষ করে পূর্বনির্ধারিত মিটিংয়ে যোগ দিতে শিক্ষার্থীদের আনুমানিক ৪০ মিনিট বিলম্ব হয়। পরে পথে প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা হয় এবং তাকে বিলম্বের কারণ জানানো হয়। তখন তিনি আমাদের তার কার্যালয়ে আসতে বলেন।”

সেজান বলেন, “এরপর প্রাধ্যক্ষ তার কার্যালয়ের তালা খুললে শিক্ষার্থীরা তার অনুমতি সাপেক্ষে ভেতরে প্রবেশ করে। সব শিক্ষার্থীর স্থান সংকুলান না হওয়ায় সেলিম হোসেন সিনিয়রদের ভেতরে বসতে এবং জুনিয়রদের কিছুক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। সিনিয়রদের সঙ্গে তার শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তিনি বাইরে অপেক্ষমাণ ছাত্রদের ডেকে ভেতরে আনেন।

“এ সময় তিনি তাদের বলেন, ‘আমার তো আড়াইটায় ল্যাবে কাজ আছে; আমি সন্ধ্যায় হলে গিয়ে তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হব।’ এরপর তিনি বিদায় নিয়ে বের হন।” 

লিখিত বক্তব্যে সাদমান নাহিয়ান সেজান আরও বলেন, “আমরা জানি না শিক্ষক সেলিম হোসেনের মৃত্যুর সঠিক কারণ কী। তবে মৃত্যুসনদ অনুসারে জেনেছি, তিনি স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি হলের অভিভাবক। হল সংক্রান্ত কথাগুলো তার কাছে পেশ করার জন্যই তো আমরা সেখানে গিয়েছিলাম।

“আমাদের এই দেখা করাটাকেই কেন্দ্র করে একটা পক্ষ আমাদের অপরাধী বানানোর চেষ্টা করছে।”

শিক্ষক সেলিম হোসেনের মৃত্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সঙ্গে কারা জড়িত, এমন প্রশ্নের জবাবে সেজান বলেন, “প্রথমত এখানে অনেকগুলো সংগঠনই তাদের মতো করে রাজনীতি করছে। শিক্ষকদের একটা অংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের একটা অংশ এবং শিক্ষার্থীদের একটা অংশ আছে। প্রত্যেকে ব্যক্তিগত কিছু স্বার্থের জায়গা থেকে এগুলো করছে।”

সেজান বলেন, “সামনে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, কর্মকর্তাদের সংগঠনের নির্বাচন। এ জন্য তারা সবাই সবার জায়গা থেকে এটাকে ইস্যু বানিয়ে কথা বলছে।

“একইসঙ্গে আমাদের সংগঠনের অন্য অংশের কিছু নেতাকর্মী এবং ভিন্ন মতাদর্শের কিছু শিক্ষার্থীও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।”

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উপ-গণযোগাযোগ ও তথ্য সম্পাদক জামিউর রহমান, সহ-সম্পাদক আহসানুল আবেদীন, উপ-পাঠাগার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কুয়েট শিক্ষকের মৃত্যু: তদন্ত কমিটি থেকে সরে গেলেন দুই শিক্ষক

কুয়েট বন্ধ ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ  

কুয়েট শিক্ষকের মৃত্যু: লাঞ্ছনার অভিযোগ, তদন্তে কমিটি

এদিকে অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যুতে কুয়েট শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার ১০টা থেকে ১ ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা।

এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষকরা কালোব্যাজ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বার বাংলা ভাস্কর্যের পাদদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে বিশ্ববিদালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে স্মারকলিপি দেন। এর আগে বুধবার থেকে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছেন।

অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যুর পর একটি ভিডিও গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সেখানে তাকে অনুসরণ করে কয়েকজন ছাত্রকে তার কক্ষে যেতে দেখা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বে একদল ছাত্র ক্যাম্পাসের রাস্তায় অধ্যাপক সেলিমকে জেরা করেন। পরে তাকে অনুসরণ করে তড়িৎ প্রকৌশল ভবনে তার কক্ষে যায়। তারা আধা ঘণ্টার মতো অধ্যাপক সেলিমের সঙ্গে ছিলেন এবং পরে অধ্যাপক সেলিম বের হয়ে বাসার দিকে যান।

অধ্যাপক সেলিমের কক্ষে ওই ছাত্ররা তাকে লাঞ্ছিত করে থাকতে পারেন, যা তাকে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বলে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

অধ্যাপক সেলিমকে বুধবার রাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাঁশগ্রামে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়।