ফিরে গেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা, শাবিতে অনশনকারীদের চিকিৎসা সেবা বন্ধ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক দল ফিরে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা।

আমরণ অনশনে বসা শিক্ষার্থীদের টানা পাঁচদিন চিকিৎসা সেবা দেওয়া সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশরা সোমবার ফিরে যান।

আন্দোলনকারীদের একজন মুখপাত্র আরিফুল ইসলাম মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, “আমরণ অনশন শুরুর একদিন পর বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় ওসমানী মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি দল অনশনকারীদের চিকিৎসা সেবা দিতে ক্যাম্পাসে আসেন। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে তারা অনশনকারীদেরকে কোনো মেডিকেল সাপোর্ট দিচ্ছেন না; তারা ফিরে গেছেন।”

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "অনশনরত শিক্ষার্থীদের সবার অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে।… তারা খিঁচুনি, ব্লাডে অক্সিজেন ও সুগার লেভেল কমে যাওয়া, ব্লাড প্রেশারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় পড়ছেন।

“কেন এই শিক্ষার্থীরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে মেডিকেল সাপোর্ট পাচ্ছেন না তা নিয়ে আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন।”

শাহজালাল ক্যাম্পাসে ওসমানী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নেতৃত্বে ছিলেন মো. নাজমুল হাসান।

তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকেই চিকিৎসা সেবা দিয়ে এসেছি। এখন শিক্ষার্থীদের ও আমাদের চিকিৎসকদের মধ্য থেকে কয়েকজনের করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় আমরা আপাতত সেবা বন্ধ রেখেছি। পরে আমরা কী করব, সেটা জানিয়ে দেব।“

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক অধ্যাপক মো. আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওখানে আমাদের অফিসিয়াল কোনো টিম ছিল না। সেখানে যারা কাজ করেছেন তারা স্বেচ্ছায় গিয়েছেন। কেন তারা ফিরে এসেছেন এটা আমরা জানি না। এটা আমাদের কোনো ব্যাপার না।”

এখন যারা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সবশেষ দুপুর পর্যন্ত, ভিসির বাসার সামনে অনশনে ছিলেন নয়জন, আর হাসপাতালে ১৯ জন।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ

এদিকে সোমবার রাত আড়াইটার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কয়েকটি মোবাইল অ্যাকাউন্ট কাজ করছে না।

সবগুলো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

একজন আন্দোলনকারী বলেন, “মোট ছয়টি অ্যাকাউন্টে প্রতিদিন টাকা আসত সাবেকদের পক্ষ থেকে। আমাদের অনশনকারী ভাইবোনদের জন্য তারা পাঠাতেন। সোমবার দুপুরের পর থেকে লেনদন করা যাচ্ছে না ওই অ্যাকাউন্টগুলোতে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি।” 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, "আমরা এ সম্পর্কে আবারও বিস্তারিতভাবে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানাব।”

এ বিষয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক করে সিলেট পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

আন্দোলনকারীদের অর্থ সহায়তা করায় তাদের আটক করা হয়েছে বলে সাবেক আরেক শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেছেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশের ভাষ্য জানা যায়নি।

খাবার ফিরিয়ে দিয়েছেন অনশনকারীরা

মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক তুলসী কুমার দাসের নেতৃত্বে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদল অনশনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা ফিরিয়ে দেন।

আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, "শিক্ষকরা দুপুর ১টার দিকে অনশনকারীদের জন্য খাবার নিয়ে আসছিলেন। কিন্তু অনশনকারীরা তা ফিরিয়ে দিয়েছে। তাদের খাবার রাখতে নিষেধ করেছে।”  

এ ব্যাপারে কথা বলতে তুলসী কুমার দাসকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে গত ১৩ জানুয়ারি রাতে আন্দোলনে নামেন ওই হলের শিক্ষার্থীরা।

তাদের তিনটি দাবির মধ্যে ছিল- প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগ, হলের অব্যবস্থাপনা দূর করে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ছাত্রীবান্ধব ও দায়িত্বশীল প্রভোস্ট নিয়োগ দেওয়া।

পরে গত রোববার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

এরপর ওইদিন বিকালে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েনের প্রতিবাদ করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয় পুলিশ।

ধাওয়া-পাল্টার এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাসহ অন্তত অর্ধশত আহত হন।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দিলেও তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার তাদের অনশনের সপ্তম দিন চলছে।