ভদ্রা নদীর পানির রঙ বদলে দেওয়া 'চুকনগর গণহত্যা’

একাত্তরের মুক্তিযু্দ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলার আনাচে-কানাচে যে গণহত্যা চালিয়েছে তার সাক্ষী বাংলার মানুষ। গণহত্যার ওই মানচিত্রে রক্তাক্ত একটি নাম খুলনার ডুমুরিয়ার ‘চুকনগর’।

প্রত্যক্ষদর্শী আর ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ এর ২০ মে চুকনগরে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যায় সেদিন শহীদ হন প্রায় ১২ হাজারের মত নিরীহ বেসামরিক মানুষ, যারা প্রাণে বাঁচতে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন ভারত সীমান্তে।

পাকবাহিনী ও রাজকারদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, রামপাল, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ফুলতলাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাজারো মানুষ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আশ্রয় নিয়েছিল চুকনগর এলাকায়। ওইদিন সকাল ১০টা দিকে হাজার হাজার নারী-পুরুষের ওপর পাকিস্তানি সেনারা এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের চালায়।

একাত্তরের ২৫ মার্চের ভয়াল কালরাতের পর মে মাসে যুদ্ধকাল পেরিয়েছে তিনমাস। দেশীয় দোসর রাজকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজধানী ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় জেলায় জেলায়, চালায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লণ্ঠনের মত মানবতাবিরোধী অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বহু মানুষ প্রাণে বাঁচতে ঘরবাড়ি ফেলে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোয়।

সীমান্তে পৌঁছুতে খুলনার ডুমুরিয়ার 'চুকনগর বাজার' এমনই একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। খুলনা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ভারত সীমান্তবর্তী ভদ্রা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলটি পড়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে।

চুকনগরের ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা একজনের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। তিনি ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়নের পরমাওয়াখালী গ্রামের দেবাশীষ রায়। স্মৃতিকাতর এই প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যা চরমে পৌঁছায় এপ্রিল ও মে মাসে।

তার কথায় জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরা ভারত পৌঁছুতে কেন এই পথকে বেছে নিয়েছিলেন। একাত্তরে মে মাসে বরিশাল, ফরিদপুর, বাগেরহাটের রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটার বিপুলসংখ্যক হিন্দুধর্মাবলম্বীর ঢল নামে। উদ্দেশ্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া।

গ্যাংরাইল নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী চুকনগর বধ্যভূমি দেখভালকারী ফজলুর রহমান মোড়ল।

সেই সীমান্তে পৌঁছুতে ডুমুরিয়া পর্যন্ত ভদ্রানদী দিয়ে নৌকায় আসা ছিল অনেকটাই সহজ এবং নিরাপদ, কারণ এখানে হানাদারবাহিনীর আনাগোনা ছিল না বললেই চলে বলে জানান দেবাশীষ।

আর তিন দিক থেকে নদী ঘেরা ডুমুরিয়ার চুকনগর বাজার। ভদ্রানদী দিয়ে নৌকায় করে আসা মানুষের বিশ্রামের একমাত্র জায়গা এই চুকনগর বাজার। এই বাজারে এসে মানুষজন নৌকা থেকে নেমে রান্নাবান্না করতেন, সামনের বিরামহীন পথে চলতে একটু জিরিয়ে নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতেন।

এই গণহত্যার প্রতক্ষ্যদর্শী খুলনার বটিয়াঘাটার উত্তর রাঙ্গেমারি গ্রামের বলাইও বলেন, এই পথের সুবিধার কথা জেনে মে মাসের পর সীমান্ত পথযাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। মে মাসের ১৮ ও ১৯ তারিখে দেশ ছাড়তে জনস্রোত যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।

তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, দলে দলে মানুষ নৌকায় করে চুকনগরে বাজারে এসে ভিড়ছেন, বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার ছুটছেন সীমান্তে।

যুদ্ধের অর্ধশতাব্দীকাল পেছনে ফেলে আসা ৮০ বছরের বৃদ্ধ এরশাদ আলী মোড়ললের স্মৃতি-বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়নি সেদিনের গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি।

আটলিয়া ইউনিয়নের মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে শোনান সেদিনের কথা, ওইদিন তার বাবা কৃষক চিকন আলী মোড়লকেই প্রথম গুলি করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল পাকিস্তানি সেনারা।

তিনি বলেন, তখন আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন গোলাম হোসেন, যিনি যুদ্ধ শুরুর পর নাম লেখান শান্তি বাহিনীতে। সেই গোলাম হোসেন এবং ভদ্রা নদীর খেয়া ঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক বিহারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাতক্ষীরা ক্যাম্পে গিয়ে খবর দেন চুকনগর বাজারে ভারতে যেতে হিন্দুদের ঢল নেমেছে। খবর পেয়ে ক্যাম্প থেকে রওনা হয় সেনাবোঝাই একটি ট্রাক ও জিপ।

এরশাদের ভাষ্য, ১৯ মে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ গ্যাংরাইল নদীর পাশের উঁচু এলাকা, চুকনগরের পাতখোলা বিল, ভদ্রা নদীর কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতোলাসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়।

"তখনও মানুষ কেবলই আসছিল নানা প্রান্ত থেকে। কেউ কেউ সঙ্গে আনা পলিথিন বা কাপড় দিয়ে তাঁবু টানান, তবে ভয়-আতঙ্কে বেশিরভাগ মানুষই ওই রাতটি কাটিয়েছিলেন নির্ঘুম। বেশিরভাগই চেয়েছিলেন ভোরের আলো ফুটলেই সীমান্তের দিকে রওনা দেবেন," বলেন এরশাদ।

তিনি জানান, দ্রুত রান্না-খাওয়া সারতে তাদের অনেকেই সকাল সকাল রান্না চাপিয়ে দেন। কারোর রান্না হয়ে গেছে, কোনো কোন পরিবার আবার খেতে বসেছে।

এরশাদ জানান, বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি ট্রাক ও একটি জিপ চুকনগর- সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে। সে সময় রাস্তারপাশে পাট খেতে কাজ করছিলেন তার বাবা চিকন আলী মোড়ল।

চিকন আলী গাড়ির শব্দে উঠে দাঁড়ানো মাত্র পাকিস্তানি হানাদাররা তাকে দেখে গুলি করতে গেলে তিনি হাতের কাস্তে ছুঁড়ে মারেন তাদের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশফায়ার। একটু দূরে দাঁড়িয়ে এমন ঘটনাটি চোখের সামনে দেখতে হয় এরশাদকে।

চিকন আলীকে মেরে ফেলার পর পাকিস্তানিরা ভাগ ভাগ হয়ে গণহত্যা চালায়, বলেন এরশাদ।

"পাতখোলা বাজারে ঢুকে নিরীহ মানুষদের লাইনে দাঁড়িয়ে ব্রাশফায়ার শুরু করে পাকিস্তানি সেনারা। আরেক দল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জমা হওয়া মানুষের উপর গুলি চালাতে শুরু করে।"

সেদিন লাশের স্তূপ থেকে একটি শিশুকে উদ্ধার করে এরশাদ আলী নাম রেখেছিলেন ‘সুন্দরী’। সুন্দরী এখন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অফিস সহায়কের চাকরি করেন  

শহীদের এই সন্তান জানান, ভদ্রা নদীর পানির রঙ পাল্টে যায় সেদিন। লাল টকটকে রক্তে ভেসে যায় পুরো নদী, কোথাও কোথাও লাশের কারণে নদীপথও আটকে যায়।

এরশাদ বলেন, "সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া হানাদারদের ওই গণহত্যা গুলি ফুরিয়ে আসার কারণে থামে দুপুর ৩টায়। যারা সাঁতরে নদীর ওপাড়ে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তারাই কেবল বাঁচতে পেরেছিলেন।"

এরশাদ আলীর ভাষ্য, চার ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সেদিন প্রায় ১২ হাজারের মত নিরীহ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলে পাকিস্তানি সেনরা। মা-বাবাকে হারিয়ে অজস্র শিশু হয় নাম-পরিচয়হীন।

বিকালে বাবা চিকন আলী লাশ খোঁজার বিবরণ দিতে গিয়ে এরশাদ আলী শোনান আরেক গল্প।

বিকাল ৪টার দিকে বর্তমান চুকনগর কলেজের সামনে পাতখোলা বিলে তখন গুলিবিদ্ধ অসংখ্য লাশের স্তূপ। হঠাৎ চোখ আটকে যায় এক ফুটফুটে শিশুর দিকে, কন্যা শিশু, গায়ে রক্তমাখা। গুলিতে মারা যাওয়া মায়ের দুধপানের চেষ্টা করছিল শিশুটি। বাবার মৃত্যু শোককে পাশে রেখে এরশাদ আলী কোলে তুলে নেন মেয়েটিকে, নিয়ে আসেন বাড়িতে। নাম রাখেন 'সুন্দরী'।

সুন্দরীর মায়ের চুলের সিঁথিতে সিঁদুর আর হাতে শাঁখা দেখেছিলেন এরশাদ। তাই এলাকার এক হিন্দু পরিবার তার দায়িত্ব নেয়। সুন্দরী বেড়ে ওঠেন স্বাধীন দেশে। ১৯৮৪ সালে তার বিয়ে হয় একই এলাকার বাটুল সরকারের সঙ্গে। ১৯৯০ সালে স্বামীকে হারান এই নারী আছেন ছেলেদের সঙ্গে।

ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা নদীরপাড়ে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া আবাসন প্রকল্পের একটি টিনশেড ঘরে বসবাস করেন সুন্দরী। ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরিও করছেন। 

সুন্দরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এর আগেও সরকারিভাবে ১১ শতাংশ সরকারি খাসজমি পেয়েছেন তিনি। তবে সেখানে ডোবা থাকায় অর্থাভাবে ভরাট করতে পারেননি।

সুন্দরী বলেন, “বছর ঘুরে ২০ মে আসলে তিনি যান চুকনগর বধ্যভূমিতে। বধ্যভূমিতে গেলে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। নতুন করে জানতে ইচ্ছা করে আমার পরিচয়, বাবা মায়ের নাম জানতে ইচ্ছা করে।"

গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী চুকনগর বধ্যভূমি দেখভালকারী ফজলুর রহমান মোড়ল বলেন, "এই গণহত্যায় পর নদীর পানিতে অজস্র লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। যে কারণে শহীদদের প্রকৃতসংখ্যা উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বরিশাল, ফরিদপুর, বাগেরহাট সদর, বাগেরহাটের রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, খুলনার দাকোপসহ নানা জায়গা থেকে যারা এসেছিলেন তাদের স্বজনদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

চুকনগর গণহত্যা ১৯৭১ স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি এ বি এম শফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেদিন চুকনগরের প্রায় চারমাইল এলাকাজুড়ে এই হত্যাযজ্ঞ চলে।

"এ গণহত্যার পর এলাকাবাসী কিছু লাশ গ্যাংরাইল ও ভদ্রা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এলাকার লোকজন ২ মাস পর্যন্ত ওই নদীর মাছ খায়নি। দুর্গন্ধ এড়াতে কিছু লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। চুকনগর কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় মানুষের হাড়গোড় পাওয়া যায়।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘১৯৭১ চুকনগরে গণহত্যা’ বই-এ বলা হয়েছে, "৭১-এর ২০ মে বাংলাদেশের জন্মের জন্য এখানে বৃহত্তম গণহত্যা সংঘটিত হয়। সেদিন ১০ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। একদিনে আর কোনো দেশে এত বড় গণহত্যা হয়নি।"

খুলনার ‘মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভ জাদুঘর’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শেখ বাহারুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই অঞ্চলে জামায়াতের এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে রাজাকারবাহিনী গড়ে তোলা হয় যুদ্ধ শুরুর ১৫ দিন আগে এই বাহিনী খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানিবাহিনীর দোসর হয়ে অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে।

বাহারুল বলেন, "চুকনগরে ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় ও নৃশংস গণহত্যায় শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও জানা না গেলেও ১০ থেকে ১২ হাজার নিরপরাধ, নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করা হয়।"

ভয়াবহ এবং নৃশসংতার ইতিহাস সংগ্রহ করতে ২০০০ সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দুদিন ‘মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প’র আয়োজন করে। ওই আয়োজনে গণহত্যায় স্বজন হারানো প্রায় দুইশ প্রত্যক্ষদর্শী তাদের কথা জানাতে এসেছিলেন। পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে চুকনগরের গণহত্যার রক্ত, মৃত্যু, রাজাকারের দেশদ্রোহিতা এবং স্তম্ভিত করে দেওয়া পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ কাহিনী।