১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫

আওয়ামী লীগের অভাবনীয় জয়

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2018-12-30 19:29:32 BdST

bdnews24
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে রোববার নবাবগঞ্জের দিঘীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের অপেক্ষা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২৫৭টি আসনে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

রোববার অনুষ্ঠিত এই ভোটের ফলাফলে নৌকার অভাবনীয় এই জয়ের বিপরীতে ভরাডুবি হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে নির্বাচনে আসা বিএনপির।

সবমিলিয়ে মাত্র ৭টি আসনে জয় পেয়েছে ধানের শীষের প্রার্থীরা; তাদের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম অংশীদার জাতীয় পার্টি ২২টি।

২২টি আসন নিয়ে দৃশ্যত আবারও সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে এইচ এম এরশাদের দল।

তা হলে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি এবার ভোটে অংশ নিলেও সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনেও ফিরতে পারছে না।

তবে ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেওয়া বিএনপি যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের শপথ না নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে দলটির নেতাদের কথায়। সেক্ষেত্রে ওই আসনগুলোতে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃনির্বাচনের দাবি তুলেছে।

এ নির্বাচন জাতিকে ভবিষ্যতে ‘সমস্যায় ফেলবে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু এবং বিরোধী জোটের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে দিনভর ভোটগ্রহণ চলে।

ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীর মৃত্যুতে গাইবান্ধা-৩ আসনের ভোট আগেই স্থগিত হয়েছিল। তিনটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ফল স্থগিত করা হয়েছে রোববার। ওই কেন্দ্রগুলোতে নতুন করে ভোট হওয়ার পর ফল ঘোষণা হবে বলে ইসি জানিয়েছে।

ভোটগ্রহণ শেষে চলছে গণনা; ফলাফলে জিতেছে আওয়ামী লীগ

ভোটগ্রহণ শেষে চলছে গণনা; ফলাফলে জিতেছে আওয়ামী লীগ

ভোটগ্রহণের মাঝপথেই ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে অংশ নেওয়া জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়; যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এতদিন বলা হচ্ছিল যে জামায়াত নির্বাচনে নেই।

দুপুরের পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিএনপি ও তাদের জোটের কয়েকজন প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বর্জনের কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোটের প্রচার যেমন তারা চালাতে পারেননি, তেমনি তাদের প্রার্থীদের এজেন্টদেরও কোনো কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ইসিতে নালিশ দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রপতি একটা গেজেট দিলেই হত যে নৌকা ২৯৯ আসন বা দুইশ সাড়ে নিরানব্বই আসন পেয়ে গেছে।”

সন্ধ্যার পর মলিন মুখে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতারা; কামাল হোসেন বলেন, “অবিলম্বে এই প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করা হোক। এই নির্বাচনের কথিত ফলাফল আমরা প্রত্যাখ্যান করছি এবং সেই সঙ্গে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনঃনির্বাচন দাবি করছি।”

ভোটগ্রহণের মাঝপথে রোববার দুপুরে নির্বাচন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা কামাল হোসেন। তার পাশে থাকা জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এসময় বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

ভোটগ্রহণের মাঝপথে রোববার দুপুরে নির্বাচন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা কামাল হোসেন। তার পাশে থাকা জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এসময় বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

এই দাবি না মানলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, সোমবার বৈঠক করে তারা করণীয় ঠিক করবেন।

বিএনপির পাশাপাশি বাম গণতান্ত্রিক জোটও এই নির্বাচনকে ‘তামাশা’ আখ্যায়িত করে নতুন করে নির্বাচনের দাবি তুলেছে।

অন্যদিকে কারচুপির অভিযোগের পাল্টায় আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম বিদেশি পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণকেই তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ভোটের দিন বিএনপির হামলায় আওয়ামী লীগ সমর্খকদের নিহত হওয়ার বিষয়টিও বলেছেন তিনি।

এইচ টি ইমাম বলেন, “তারা (বিদেশি পর্যবেক্ষক) সবাই আমাদের বাংলাদেশের আজকের যে নির্বাচন হল তার প্রশংসা করেছেন। তারা বলেছেন, অত্যন্ত সুন্দর সুষ্ঠু এবং সুচারুভাবে এই নির্বাচন পরিচালিত হয়েছে।”

তার ভাষায়, দলীয় সরকার রেখেও যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, তা প্রমাণিত হয়েছে রোববারের ভোটের মধ্য দিয়ে।

অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, “অনেকে মনে করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়াটা ভুল ছিল, আজকের নির্বাচন প্রমাণ করল যে, সেটা ভুল ছিল না।”

সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপের পর তা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছিল বিএনপি; কিন্তু তা না হওয়ায় ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল তারা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ছবি: সাইফুল ইসলাম কল্লোল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ছবি: সাইফুল ইসলাম কল্লোল

ওই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এক বছর পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার হটাতে আন্দোলনে নামলেও ব্যর্থ হয়। তিন মাসের আন্দোলনে নাশকতায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর পিছু হটতে হয় তাকে।

এরপর রাজপথের আন্দোলনে অনেকটাই নীরব থাকা বিএনপি বড় ধাক্কা খায় এই বছরের শুরুতে দুর্নীতির মামলায় তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার দণ্ড নিয়ে কারাগারে যেতে হওয়ায়।

খালেদাকে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আশায় বিএনপি থাকলেও শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে সফল না হওয়ার প্রেক্ষাপটে কামাল হোসেন, আ স ম রব, আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে নতুন জোট গড়ে তারা।

বিএনপির এই চমকের পাল্টায় এতদিন ধরে ‘না’ করে আসার পর রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার মধ্যদিয়ে বিএনপি আসে ভোটে, যদিও তাদের কোনো দাবিও আদায় হয়নি।

‘ভোট বিপ্লবের’ ডাক দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটে এলেও নির্বাচনের প্রচারে তাদের প্রার্থীদের না দেখা ছিল আলোচিত; তবে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দাবি ছিল, পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের বাধায় তারা প্রচারে নামতে পারেননি।

এরপর ভোটের দিনও তাদের প্রার্থী ও সমর্থকদের তেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীনদের বাধাকে কারণ দেখিয়েছে তারা। অন্যদিকে বিএনপির ভরাডুবির জন্য তাদের নেতাদের উপর কর্মীদের আস্থাহীনতাকে কারণ দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগ জোটের অংশীদার জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

অন্যদিকে আগের চেয়েও বেশি শক্তি নিয়ে বাংলাদেশে এই প্রথম টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ; যেখানে সংসদে জাতীয় পার্টিকে বাদ দিলে বিরোধী দলের আসন সংখ্যা দাঁড়াল ৭টি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এর চেয়ে বেশি সংখ্যক আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু; ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয় পেয়েছিল।

বিরোধী দলবিহীন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮ আসনে জিতেছিল। এরশাদ আমলে ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়েছিল। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩৪টি আসন।

তবে ওই তিনটি নির্বাচনের কোনোটিতেই সব দলের অংশগ্রহণ ছিল না। এবার সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনে ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়েও বেশি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ।

ভোট দিতে সারিবদ্ধভাবে ভোটারদের অপেক্ষা বনানী মডেল স্কুল কেন্দ্রে। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

ভোট দিতে সারিবদ্ধভাবে ভোটারদের অপেক্ষা বনানী মডেল স্কুল কেন্দ্রে। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

এবার ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছে ২৫৭টি আসন, আর মহাজোটগতভাবে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮৮টি।

১৪ দলীয় জোটের দলগুলোর মধ্যে জাসদ ২টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, বিকল্প ধারা ২টি, তরীকত ফেডারেশন ১টি আসনে জিতেছে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের মিত্র দল জাতীয় পার্টি (জেপি) বাইসাইকেল প্রতীকে একটি আসনে জিতেছে।  

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে বিএনপি ৫টি আসনে জিতেছে, গণফোরাম দুটি আসতে জিতেছে। তিনটি আসনে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা; তাদের দুজন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, আরেকজন খালেদা জিয়ার আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছিলেন।

ভোটের হার কত, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি ইসি; তবে ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, এটা ৮০ শতাংশের কাছাকাছি হবে।

বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, “আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানাই, তারা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। এই নির্বাচন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।”

[নির্বাচনের পুরোটা সময় ঘটনা প্রবাহ, ফলাফল ও বিশ্লেষণ নিয়ে লাইভ-এ ছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী]

 

 

 

 

 

 

কোন নির্বাচনে
কোন আসনে কার অবস্থান কী