২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

ক্রিকেটের অমর বুড়োর আঙিনায়

  • আরিফুল ইসলাম রনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-06-11 11:15:44 BdST

“ডব্লিউ জি গ্রেস গেইট কি এটাই?”

প্রশ্ন শুনে নিরাপত্তারক্ষী যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

খানিক ভেবে, এদিক-সেদিক তাকিয়ে, ভ্রু কুঁচকে বললেন, “এটা তো নেভিল রোড গেইট, গ্রেস আবার কী?”

তার বিস্ময় মিশ্রিত পাল্টা প্রশ্ন বিভ্রান্তিতে ফেলার আগেই চোখ পড়ল গেইটের দেয়াল চিত্রে। সেখানে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং গ্রেস। নিচে অক্ষরে অঙ্কিত শ্রদ্ধাঞ্জলি, ‘স্মরণে ড. ডব্লিউ জি গ্রেস, দা গ্রেট ক্রিকেটার।’ 

নিরাপত্তারক্ষী এক অর্থে ভুল বলেননি। নেভিল রোডের মাথায় এই গেইট। তবে একটি ব্যাপার স্পষ্ট, গেইটের কেতাবি নাম কিংবা যার স্মরণে নামকরণ, কোনোটি সম্পর্কেই তার ধারণা নেই।

অথচ তার সামনে দাঁড়িয়েই রোমাঞ্চে প্রায় কাঁপছিলেন ভিনদেশি এই সাংবাদিক। এটিই সেই প্রবেশ দুয়ার, সামনেই ব্রিস্টল কাউন্টি গ্রাউন্ড। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী, ক্রিকেটের অমর বুড়োর স্মৃতি বিজড়িত আঙিনা!

ক্রিকেটের সামান্যতম অনুসারী হলেও ডব্লিউ জি গ্রেসকে না চেনার কারণ নেই। বলা হয় ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত মুখ, সবচেয়ে আইকনিক চরিত্র। বুক সমান দাড়ি, ছবিটি যেমন ক্রিকেট ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে, ভাস্বর হয়ে আছে তার কীর্তিও। আদুরে নাম তাই ‘অমর বুড়ো।’

অনেকে আবার স্রেফ ‘ডক্টর’ বলে ডাকতেন। এটি শুধু আদুরে ডাক নয়, সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার পেশায় তো ডাক্তারই ছিলেন!

আরেক কিংবদন্তি চরিত্র, ফুটবল- ক্রিকেট দুটিতেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার পাশাপাশি যিনি গড়েছিলেন লং জাম্পের বিশ্বরেকর্ড, একই সঙ্গে ছিলেন লেখক-সম্পাদক-শিক্ষক-কূটনীতিক-রাজনীতিবিদ, সেই সি বি ফ্রাই মজা করে বলতেন, ক্রিকেট মাঠে অপারেশন করে মেডিকেল ডিগ্রি পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি ডব্লিউ জি গ্রেস।

গ্রেসের সঙ্গেই কিংবদন্তি হয়ে আছে ব্রিস্টল কাউন্টি গ্রাউন্ড। মঙ্গলবার এ মাঠেই বিশ্বকাপের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ।

২০১০ সালে এখানেই ইংল্যান্ডকে ওয়ানডেতে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই জয়ে টেস্ট খেলুড়ে সব দেশকে ওয়ানডেতে হারানোর বৃত্তপূরণ হয়েছিল। দেশের সফলতম অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে প্রথম জয় ছিল সেটিই, অধিনায়ক নিজেই ছিলেন ম্যাচ সেরা।

১৩০ বছর পুরোনো এ মাঠের সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভাণ্ডারে বাংলাদেশের ওই অর্জন বাংলাদেশি ছাড়া অন্য কারও মনে কোনো আবেদন জাগাবে না। ক্রিকেট বিশ্ব এ মাঠকে ডব্লিউ জি গ্রেসের মাঠ হিসেবেই মনে রাখবে।

এই মাঠে অসংখ্য কীর্তি বা স্মৃতির কারণেই শুধু নয়, আক্ষরিক অর্থেই এটি তার মাঠ। মাঠের খুব কাছেই ছিল বাড়ি। ১৮৯৯ সালে তিনি মাঠটি কিনে নেন। উপহার দেন নিজের কাউন্টি দল গ্লস্টারশায়ারকে। সেই থেকে আজও এটি গ্লস্টারশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের ঘরের মাঠ।

দীর্ঘ পথচলায় মালিকানা হাতবদল হয়েছে আরও কয়েকবার। ১৯১৯ সালে কাউন্টি ক্লাবটি এই মাঠ বিক্রি করে দেয় একনটি কনফেকশনারি ফার্মের কাছে। তারা মাঠের নামও বদলে ফেলে।

১৯৩৩ সালে গ্লস্টারশায়ার আবার কিনে নেয় মাঠটি। ১৯৭৬ সালে বিক্রি করে দেয় আবার, সবশেষ আরেকবার কিনে নেয় ২০০৪ সালে। মালিকানা যার হাতেই থাক, সব সময়ই এ মাঠ গ্লস্টারশায়ার নিজেদের জন্য ব্যবহার করেছে।

মাঠের স্থায়ী গ্যালারির দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৭ হাজার। ক্রিকেট মৌসুমে অস্থায়ী স্ট্যান্ড বসানো হয়, ধারণ ক্ষমতা তখন হয় ১৮ হাজারের মতো।

বছর দশেক আগে স্থায়ী গ্যালারির দর্শক ধারণ ক্ষমতা ২০ হাজারে উন্নতি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সেটি শেষ পর্যন্ত করা যায়নি মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাপার্টমেন্ট মালিকদের আপত্তির কারণে। প্রস্তাবিত গ্যালারির অংশ যে তাদের সীমানায় পড়ে যাচ্ছিল!

অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের কারণে গ্যালারি বাড়ানো যাচ্ছে না- এমন বিচিত্র সমস্যা বিশ্বের আর কোনো মাঠের ক্ষেত্রে সম্ভবত হয়নি।

‘তিন ভবনের তিন বাসিন্দা’

ইংল্যান্ডের আর দশটা মাঠের মতো অতটা নান্দনিক হয়ত নয় ডব্লিউ জি গ্রেসের মাঠ। চারপাশে কিছু গাছপালা আছে। তবে নেই সবুজের সমারোহ কিংবা চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য। আবাসিক এলাকার মধ্যখানে মাঠ, তাই সীমাবদ্ধতা অনেক। অবশ্য ভবনগুলোতেও আছে ক্রিকেটের ছোঁয়া।

মাঠের এক প্রান্তে লাগালাগি দাঁড়ানো তিনটি ভবন। একটির নাম ডব্লিউ জি গ্রেস অ্যাপার্টমেন্টস, একটি গিলবার্ট জেসপ অ্যাপার্টমেন্টস, অন্যটি ওয়ালি হ্যামন্ড অ্যাপার্টমেন্টস। গ্লস্টারশায়ারের তিন কীর্তিমান ক্রিকেটারের নামে তিনটি ভবন।

তিনজন তিন প্রজন্মের ক্রিকেটার। গ্রেস শেষ টেস্ট খেলেছেন ১৮৯৯ সালের জুনে। তার দুই সপ্তাহ পরই টেস্ট অভিষেক জেসপের। ১৯১২ সালে জেসপ খেলেন শেষ টেস্ট; হ্যামন্ডের টেস্ট অভিষেক ১৯২৭ সালে।

তিনজনের মধ্যে টেস্ট রেকর্ড অনেক বেশি সমৃদ্ধ হ্যামন্ডের। সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের ছোট্ট তালিকায় থাকেন তিনি। কিন্তু গ্রেস ও জেসপ ছিলেন তুলনায় অনেক বর্ণময় চরিত্র। রান-উইকেট বা পরিসংখ্যানে নয়, ক্রিকেট ইতিহাসে তারা অমর ওই চরিত্রের কারণেই।

গ্রেসকে নিয়ে যত গল্পগাথা প্রচলিত আছে ক্রিকেটে, আর কোনো ক্রিকেটার সম্ভবত তার ধারেকাছেও নেই। আম্পায়ার আঙুল তুলে আউট দিয়েছেন, গ্রেস উইকেট ছেড়ে যাবেন না। তার অকপট ভাষ্য, “দর্শক তোমার আঙুল দেখতে মাঠে আসেনি, আমার খেলা দেখতে এসেছে!”

বোলার বোল্ড করেছেন তাকে। তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেলস তুলে স্টাম্পের ওপর বসিয়ে আবার ব্যাটিংয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেন কিছুই হয়নি!

কখনও কখনও আবার বোল্ড হওয়ার পর বেলস তুলে স্টাম্পের ওপর বসিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে আম্পায়ারকে বলেছেন, “বাতাসে বেলস পড়ে গেছে…।”

এরকম একবার বাতাসে বেলস পড়ার কথা বলার পর এক রসিক আম্পায়ার বলে বসেন, “এই বাতাস তোমাকে ঠেলে একটু ড্রেসিং রুমে নিতে পারে না ডক্টর?”

মাঠে গ্রেসের উপস্থিতি এমন দাপুটে ও ব্যক্তিত্বময় ছিল, আম্পায়াররা নাকি তাকে আউট দিতে ভয়ই পেতেন। পেসার চার্লস কর্টরাইট একবার দারুণ এক ডেলিভারিতে গ্রেসের অফ ও মিডল স্ট্যাম্প উপড়ে দিলেন। তারপর গ্রেসের কাছে গিয়ে বললেন, “নিশ্চয় তুমি মাঠ ছাড়বে না ডক্টর, একটি স্টাম্প তো এখনও দাঁড়িয়ে আছে!”

গ্রেসকে নিয়ে আছে এমন অসংখ্য গল্প। হয়তো কিছু সত্যি, কিছু বানানো। তবে এসব মিথ কখন ছড়ায়? ব্যক্তির চরিত্র যখন সত্যিই ততটা বিশাল হয়ে ওঠে। যেমন ছিলেন গ্রেস।

কিংবা জেসপ। তার দাপুটে চরিত্র দেখা যেত ২২ গজেই। এই যে আজ ক্রিকেটে ব্যাটিং আগ্রাসনের রাজত্ব, চার-ছক্কার মেলা, জেসপ এই মানসিকতায় ব্যাট করেছেন আরও ১০০-১২০ বছর আগে!

স্রেফ পরিসংখ্যান দেখলে অবশ্য তার ওজন বোঝা যাবে না। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতা আর ১১ স্টোন ওজনের মানুষটি অনেক বেশি ওজনদার ছিলেন ব্যাটসম্যানশিপে। সেখানে আক্রমণই ছিল শেষ কথা।

১৮৯৪ সালে গ্লস্টারশায়ারের হয়ে প্রথম ইনিংসে যখন উইকেটে গেলেন, বোলার তখন হ্যাটট্রিকের অপেক্ষায়।সেই বলটিকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে শুরু করেছিলেন পথচলা, ক্যারিয়রাজুড়ে ছিলেন একই ধারার অনুসারী। সেই ১৯০২ সালে ৭৭ মিনিটে টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছিলেন।

যে যুগে ঘণ্টায় ৫০ রান করতেও হিমশিম খেতেন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানরা। আর জেসপ রান তুলতেন ঘণ্টায় গড়ে ৭৯ করে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার ৫৩ সেঞ্চুরিতে গড়ে ঘণ্টায় করেছেন ৮৩ রান।

১৯১০ সালের আগ পর্যন্ত নিয়ম ছিল ছক্কা পেতে হলে বল পাঠাতে হতো স্টেডিয়ামের বাইরে। এখনকার মতো উড়িয়ে সীমানা পার করলে মিলত পাঁচ রান। জেসপের ক্যারিয়ারে ছক্কা ছিল অনেক, পাঁচের ছিল ছড়াছড়ি।

এই ব্রিস্টলেই মাঠের আশপাশের কত বাড়ি আর গাড়ির কাচ ভেঙেছে তার ব্যাট থেকে উড়ে আসা বলে! কিংবদন্তি আছে, তার ব্যাটে বল লাগার আওয়াজ শুনে দূর থেকে অনেকে নাকি বুঝে ফেলত জেসপ ব্যাটিংয়ে নেমেছেন।

মাঠের পাশের কোনো বার বা পাবে যখন জানালা বা দরজার কাচ ভাঙার আওয়াজ হতো, কেউ নাকি চমকে উঠতেন না। স্রেফ গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলতেন, জেসপ বেটা আরেকটা ছক্কা মেরেছে!

সোমবার এই মাঠেই বাংলাদেশ দলের অনুশীলন দেখতে দেখতে স্মৃতির সরণি ধরে ঘুরে বেড়ানো হলো গ্রেস-জেসপদের সময়ে। শতবছর পরেও চারপাশে তাদের উপস্থিতি দারুণ প্রবল। যেন এখনই আঙুল তুলে দাঁড়ানো আম্পায়ারের দিকে কটমট করে তাকাবেন গ্রেস। এখনই শোনা যাবে জেসপের পিটুনিতে ছুটতে থাকা বলে কোনো বাড়ির জানালার কাচ ভাঙার শব্দ!