‘লেগ স্পিনার’ সাইফ এবং লিটনের ক্যাচ বিতর্ক

  • আরিফুল ইসলাম রনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-06-26 14:00:57 BdST

“এই তোরা কে কে স্পিন পারিস, হাত তোল। আজ সব স্পিনারকে বোলিং দেওয়া হবে...।”

বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচে তখন চলছে আফগানদের ইনিংস। উইকেটে এমনভাবে স্পিন ধরছে যে, পানি পানের বিরতিতে মজা করে সাকিব আল হাসান বলছিলেন, কেউ স্পিন করতে পারলেই বোলিংয়ে আনা হবে!

সাউথ্যাম্পটনে সোমবার আফগানিস্তানের সঙ্গে স্বস্তির জয়ের পর দলের কয়েকজনের কাছ থেকে শুনছিলাম সেই ম্যাচের এ মজার কাহিনী।

আফগানরা নেমেছিল পাঁচ স্পিনার নিয়ে। কিন্তু স্পিনে বাংলাদেশের খুব বেশি বিকল্প সেদিন ছিল না। মূল দুই স্পিনার সাকিব ও মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে ছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন। কাঁধের চোটের কারণে মাহমুদউল্লাহর অফ স্পিনের কপাট বন্ধ বেশ কিছু দিন ধরেই।

তিন স্পিনারের সঙ্গে ছিলেন তিন পেসার। একাদশের অন্যদের মধ্যে সৌম্য সরকার করেন মিডিয়াম পেস। কিপার ব্যাটসম্যান দুজন। তামিম ইকবালের স্পিনের দৌড় শেষ এক যুগের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দুই ম্যাচ মিলিয়ে এক ওভারে সীমাবদ্ধ।

সাকিব গলা ভেজানোর সময় যখন স্পিন নিয়ে রসিকতা করছেন, হঠাৎ তামিমের মনে হলো, দলের পেসার সাইফ উদ্দিন তো লেগ স্পিনও পারে! নেটে সাইফের লেগ স্পিন তামিম খেলেছেনও।

তামিম তখনই বললেন, “সাইফ, তুই না লেগ স্পিন পারিস? আজকে কর বোলিং...।” তামিম বলা মাত্র অন্যরাও সঙ্গত ধরলেন- ‘সাইফ, আজকে লেগ স্পিন করতেই হবে...!’

সাইফ শুরুতে ফাজলামো মনে করে পাত্তা দিচ্ছিলেন না। পরে সবার জোরাজুরি দেখে পারলে পালিয়ে বাঁচেন! তামিমকে গিয়ে বললেন, “ভাই, ভাই, ভাই, আমার ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই না...।”

সাইফের অবস্থা দেখে সবাই হেসেই খুন!

গল্পটা শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল, সাইফের লেগ স্পিন আমিও দেখেছি। গত বছর, এ সময়টাতেই।

হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানোয় তখন হেলমেট পরতে মানা ছিল তামিমের। কিন্তু ব্যাটিং প্র্যাকটিসও দরকার। তাই হেলমেট ছাড়া ব্যাট করতেন শুরু স্পিনে।

সেরকমই এক দিনে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের একাডেমি মাঠে তামিমকে লেগ স্পিন করেছিলেন সাইফ। ঘটনাটি মনে আছে, কারণ লেগ স্পিনার সাইফের অ্যাকশন যেন প্রায় রশিদ খানের মতো!

সত্যি বলতে, সেদিন বল করতে দেখে একেবারে আনকোরাও মনে হয়নি তাকে। সাধারণত যারা লেগ স্পিন করেন না, তারা কবজির মোচড়ে বল ছাড়তে গেলে জায়গায় বল রাখতে পারেন না। ফুল টস বা শর্ট বল হয় কিংবা এলোমেলো হয় হরহামেশা। সেদিন নেটে দেখেছিলাম, সাইফের লেগ স্পিনের স্পট ভালো, নিয়ন্ত্রণও খারাপ নয়!

তাই বলে হঠাৎ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে লেগ স্পিন করতে গেলে অভিজ্ঞতা ভালো নাও হতে পারে। তবে মাঠের মজাটা দারুণ ছিল নিশ্চয়ই। সাইফের ভড়কে যাওয়া নিয়ে ম্যাচেরও পরও হাসাহাসি করেছেন সতীর্থরা।

লিটনের ক্যাচ বিতর্ক

লিটন দাসকে আউট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি না- সেই আলোচনা ম্যাচের পরও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘুরে ফিরে এসেছে।  

তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার হার খুবই কম। লিটনের ক্ষেত্রেও আপাতদৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত ভুল মনে হয়নি। তবে সমর্তকদের জোর দাবি, লিটনকে আউট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।  

মুজিব উর রহমানের বলে শর্ট কাভারে ক্যাচটি নিয়েছিলেন হাশমতউল্লাহ শহিদি। বল হাতে জমার সময় ফিল্ডারের মুখ ছিল ওপরের দিকে, কাজেই তার নিজের শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার উপায় ছিল না।

এসব ক্ষেত্রে তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য চাওয়ার সময় মাঠের আম্পায়ার নিজের মতটাও দিয়ে রাখেন, যেটাকে বলে ‘সফট সিগন্যাল।’ লিটনের ক্যাচটির ক্ষেত্রে মাঠের আম্পায়ারের ‘সফট সিগন্যাল’ ছিল ‘আউট’। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এর বড় ভূমিকা ছিল।

টিভি রিপ্লেতে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে এবং যতটা সম্ভব ‘জুম’ করে দেখেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি বল ফিল্ডারের হাতেই জমেছে, নাকি তার আগে মাটি ছুঁয়ে গেছে। 

নিয়মেই আছে, তৃতীয় আম্পায়ারও নিশ্চিত হতে না পারলে ও মাঠের আম্পায়ারের সফট সিগন্যালকে বাতিল করার মতো শতভাগ প্রমাণ না পেলে, সেই সফট সিগন্যালকেই অনুসরণ করতে হবে।

লিটনের ক্ষেত্রেও সেটিই মানা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী লিটন আউট ছিলেন- এটা নিয়ে সংশয় নেই।

এখন বিতর্ক হতে পারে সফট সিগন্যালের নিয়ম নিয়ে। প্রযুক্তির যুগেও কেন সফট সিগন্যাল রাখতে হবে বা এর ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হবে- সে আলোচনা চলতে পারে।

অনেক দিন ধরেই চলছে এ বিতর্ক। কিন্তু আদর্শ কোনো বিকল্প বা সমাধান মেলেনি। প্রযুক্তিরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ওই ম্যাচেও তা দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে, এত এত ক্যামেরা ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়েও শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না ক্যাচটি নিয়ে।

‘আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত’- এটি ছিল একসময় ক্রিকেটের আপ্তবাক্য। সময়ের প্ররিক্রমায় প্রযুক্তির কারণে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে অনেকটা। আর প্রযুক্তিও যেখানে অসহায়, সেখানে রক্ত-মাংসের আম্পায়ারের ওপরই ভরসা রাখা হয়েছে নিয়মে।

সেই নিয়ম অনুযায়ী লিটন আউট ছিলেন, এটা নিয়ে খুব বেশি প্রশ্নের অবকাশ তাই নেই।

প্রশ্ন কিন্তু বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমেও নেই। মঙ্গলবার সকালে এ নিয়ে কথা হচ্ছিল মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে। অধিনায়ক অকপটেই বললেন, লিটনের আউট নিয়ে কোনো সংশয় নেই তাদের।

তামিম ইকবাল ছিলেন পাশেই। লিটন আউট হওয়ার সময় উইকেটে তিনিই ছিলেন সঙ্গী। তামিমের কথা, নন-স্ট্রাইক প্রান্তে থাকায় মাঠে ঘটনাটি সবচেয়ে ভালোভাবে তিনিই দেখেছেন। তৃতীয় আম্পায়ার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই নাকি তিনি লিটনকে বলেছিলেন, ‘তুই আউট।’

দলের তেমন কারও সংশয় নেই। অথচ বাজে সিদ্ধান্ত, ভুল বা ষড়যন্ত্র বলতে বলতে সামাজিক যোগাযোগের দুনিয়ায় অনেকের ঘুম নেই!