পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ‘সেই শক্তিধর’ দেশ: প্রধানমন্ত্রী

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2016-03-18 19:11:55 BdST

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থনকারী ‘শক্তিধর দেশের’ শিকার হয়েই বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর ৯৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “তখনকার দিনে বিশ্বে দুটি ভাগ ছিল। যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করে নাই, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সমর্থন করেছিল, তাদেরও তো ষড়যন্ত্র ছিল।

“তাদের কথা কেউ শুনল না, দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। পাকিস্তান আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় বরণ করল। বিশ্বে অনেক শক্তিধর শক্তি সাথে থেকেও তাদের জেতাতে পারল না। এই পরাজয় অনেকে সহজে মেনে নেয়নি।”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন দুই পরাশক্তির একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। দেশটি পাকিস্তানকে অস্ত্রও সরবরাহ করেছিল।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সামরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ভারতে প্রায় এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নেয়। প্রবাসী বাংলাদেশি সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো কোলকাতা থেকে। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতেই প্রশিক্ষণ নিত।

যুদ্ধের একবারে শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিলে পাল্টা পরমাণু অস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে মোতায়েনের হুমকি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তখন পিছু হটে ওয়াশিংটন।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, “তাই তাদের ষড়যন্ত্র চলছিল। আর সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হল, জাতির পিতা ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট।”

১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার কথাও এসময় উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ প্রধান।  

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর টালমাটাল পরিস্থিতির এক পর্যায়ে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর মুক্ত হন। সেদিন নিহত হন খালেদ মোশাররফসহ অনেক সেনা কর্মকর্তা। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন জিয়া।

শেখ হাসিনা বলেন, “অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের ডুপ্লিকেট সরকার গঠন করে।

“যে লোক নিজে একদিনে দেড়শ’ বাঙালিকে হত্যা করেছিল, তারও স্থান হয় জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায়। পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে গিয়ে যে কথা বলেছিল, তাকেও মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছে।”

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শাহ আজিজুর রহমান জাতিসংঘে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন। আব্দুল আলীম সরাসরি বাঙালিদের হত্যা করেন। তারা দুজনই জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯টি সামরিক অভ্যুত্থান হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “রাতের পর রাত হাজার হাজার সেনা সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শুধু বিমান বাহিনীতেই ৫৬২ জনকে হত্যা করা হয়। একে একে সকল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে হত্যা করা হয়।”

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার কন্যা বলেন, “দুঃখী মানুষের দুর্দশা তাকে পীড়া দিত। স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনীতি শুরু করেন।

“বাংলাদেশের মানুষের প্রতিটি অর্জনের পেছনে জাতির পিতার অবদান রয়েছে।”

বঙ্গবন্ধু এই দেশের মানুষের জন্য ছয় দফা দেওয়ার পর তাকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়- উল্লেখ করে সেসময় তার ওপর রাজনৈতিক নিপীড়নের বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “ছয় দফার মধ্যে যে স্বাধীনতার মূল মন্ত্র ছিল, এটা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী উপলব্ধি করতে পেরেছিল। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চেষ্টা ছিল যেভাবেই হোক বঙ্গবন্ধুকে দমাতে হবে।” 

“বঙ্গবন্ধু যেমন বাংলার মনের কথা জানতেন, তেমনি বাংলার জনগণও বঙ্গবন্ধুকে তাদের আপনজন হিসেবে মানতেন। নীতির সাথে তিনি কখনও আপস করেন নাই,” যোগ করেন শেখ হাসিনা।

দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে গিয়ে তার বড় মেয়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। 

“১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’

“জনগণের সার্বিক মুক্তি। আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কী, মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু’, জবাব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।”

শেখ হাসিনা বলেন, “একজন মানুষ তার দেশের মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসলে, দেশের মানুষের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে পারেন?”

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়।

সে প্রসঙ্গে তুলে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি জাতির পিতার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া (তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক)।

“সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না’।”

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে জাতির পিতা সব কাজ করে গেছেন। কত দূরদর্শী নেতা ছিলেন তিনি।”

বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বসভায় যে মর্যাদা নিয়ে চলছে, সে মর্যাদা নিয়ে চলবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পিতা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছে। আমরা তার জনগণের জন্য উন্নত জীবন গড়ে তুলব।”

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন ও সতীশ চন্দ্র রায়, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম।