লেখালেখি পাগলামি ছাড়া কিছু নয়: নাইপল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2016-11-18 20:53:21 BdST

‘অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গড়তে হয় একেকটি চরিত্র; সেই চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে গল্প হয়ে উঠে- একের এর এক শব্দের গাঁথুনি, সে বড় সহজ কাজ নয়।’

লেখক হয়ে উঠার গল্প বলছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনের শেষ অধিবেশন ‘দ্য রাইটার অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ এ লেখক জীবনের নানা গল্প শোনান তিনি।

ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবরের সঞ্চালনায় স্ত্রী নাদিরা নাইপলকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনায় যোগ দেন ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক।

গল্পে-গল্পে নাইপল শোনান, বিবিসির লন্ডন অফিসের নবাগত ফ্রিল্যান্সার গল্প খুঁজে বেড়াতেন এখানে-ওখানে। কিছু লিখবেন, কিন্তু কি লিখবেন তা জানেন না। অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়ান শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।

“আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কি লিখবো তার কিছু্ই জানতাম না। কিন্তু লিখবো, এটা জানতাম। আমি বুঝতে পারলাম যে এজন্য আমাকে কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব বিব্রতকর ছিল।

“আসলে লেখাঝোঁকা পাগলামি ছাড়া আর কিছু্ই না। আবার এটাও বলতে হয়, কোনো কিছুই খুব সহজ না। অনেক চিন্তাভাবনা করে তারপরেই একটা কিছু দাঁড়ায়।”

২০১১ সালে নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিক বলেন, তার সাহিত্যিক হয়ে উঠার পেছনে বাবা সিপেরসাদ নাইপলের অবদান ‘অনেক’।

“আমি লেখক হতে চাইছিলাম, কিন্তু জানতাম না কি লিখবো। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম বাবার জন্য, আমার অনেক লেখায় আমার বাবার জীবনের ছাপ রয়েছে।”

তিনি বলেন, “একটা সময় আমি বুকপকেটে নোট বই নিয়ে ঘুরতাম। আমার কাছে যাদের ভিন্নরকম মনে হতো, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম। এবং সেগুলো লিখে রাখতাম।”

বয়সের ভারে ন্যুজ, কিন্তু কলম চলছে অবিরাম। তারুণ্যের সেই দিনগুলোর মতো এখনও দুচোখ খুঁজে ফেরে গল্প আর নতুন কোনো চরিত্র।

১৯৭১ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার জয়ী নাইপল ৮৪ বছর বয়সে এসে ফিরে তাকান পুরনো দিনে।

“আমি যে লেখালেখি করেছি তা ননসেন্স ছাড়া আর কিছু না। আমার লেখালেখির জীবন ছিল জাদুর মতো। আমি ভাগ্যবান আমি সে পথে হেটেছি।”

নাইপলের স্ত্রী লেডি নাদিরা নাইপল শোনান লেখকের বিখ্যাত ‘হাউজ ফর মি. বিশ্বাস’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে উদাসীনতার কথা।

তিনি বলেন, “বইটির পাণ্ডুলিপি লেখার পরে তিনি ভুলক্রমে রান্নাঘরে ফেলে রাখেন। প্যারিস ঘুরতে গিয়ে তার মনে হয়, রান্নাঘরে ফেলে এসেছেন তা, তার যে আর কোনো কপি ছিল না।”

এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা লিট ফেস্টের অন্যতম পরিচালক আহসান আকবর।

দ্বিতীয় দিনে ৩৭ অধিবেশন

গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, প্রকাশনা সংস্থাসহ সমকালীন বিশ্বের নানা প্রসঙ্গে আলোচনা, তর্কে মুখর ছিল ঢাকা লিট ফেস্ট- এর দ্বিতীয় দিনের আসর।

৯০টি অধিবেশনে সাজানো সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে অনুষ্ঠিত হয় ৩৭টি অধিবেশন।

বাংলা একাডেমির পাঁচটি মঞ্চে শুরু হওয়া এ সাহিত্য উৎসবের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন শুরু হয় আধ্যাত্মিক গানের পরিবেশনা দিয়ে। শেষ হয় এ বছরের সাহিত্য শাখায় নোবেলজয়ী সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলানকে নিবেদিত গানের মাধ্যমে।

সকাল ৯টায় কেকে টি স্টেজে ‘ইন আদার ওয়ার্ডস; লাইব্রেরি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক অধিবেশনে ২০০১৬ সালের ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক ডেবোরা স্মিথ, অরুনাভ সিনহা, চার্লস টর্নার ও কায়সার হক অংশ নেন। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ড্যানিয়েল হার্ন।

একই সময়ে ব্র্যাক মঞ্চে ম্যাক্স রোডেন বেকের সঞ্চালনায় ‘ক্যান ইন্ডিয়া স্পিক’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচনা করেন নারেশ ফারনান্দেজ, মঞ্জুলা নারায়ণ ও শ্রীরাম কারি। এ আলোচনায় মূলত ভারতের গণতন্ত্রের চর্চা ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ উঠে আসে।

একই সময়ে কসমিক টেন্টে প্রদর্শিত হয় তথ্যচ্চিত্র ‘ব্লকেড’। তথ্যচিত্রটিতে বাংলাদেশের বাইরের অন্যান্য সমাজ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ করেছিল, সে বিষয়টি উঠে আসে।

সোয়া ১১টায় মূল মঞ্চে ‘দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড ডিজওর্ডার’ শীর্ষক আলোচনায় অনুষ্ঠিত হয়। জাস্টিন রোলাটের সঞ্চালনায় এ বিষয়ে আলোচনা করেন ম্যাক্স রোডেন বেক, বেন জুদা, রোজামান আরউইন ও ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান।

নাইন/ইলেভেনের পর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ-সংঘাত এবং তাদের শত্রু রাষ্ট্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়গুলো উঠে আসে।

একই সময়ে কেকে টি স্টেজে ‘নারী ও নারীত্ব’ বিষয়ক অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক উদিসা ইসলামের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন নাসিমা আনিস, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপড়ি রহমান ও সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম।

পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অবস্থান কি হবে এবং নারীর অবস্থান পরিবর্তনের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয় এ অধিবেশনে।

একই সময়ে একাডেমির লনে কার্তিকা ভিকের উপস্থাপনায় ‘কথোপকথনে’ অংশ নেন পুলিৎজারজয়ী সাহিত্যিক বিজয় শেষাদ্রী। আর ব্র্যাক মঞ্চে সুফি সোল শীর্ষক আলোচনায় আমিনা ইয়াকিনের সঞ্চালনায় অংশ নেন সাদিয়া দেলভি ও অধ্যাপক সলিমউল্লাহ খান।

বেলা ২টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাহিত্য যখন সবার’ শীর্ষক অধিবেশন। আন্দালিব রাশদীর সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইমতিয়ার শামীম।

ভারতের সাহিত্যিক সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায় বলেন, “বৃহৎ সাহিত্যের আবেদন আগ্রাসী। সেই সাহিত্য সময় বিভাজন, শিক্ষা, ক্লাস সবকিছুকে উপেক্ষা করে। সাহিত্যের অনুভব শক্তি এত প্রবল যে সাহিত্য সব বাধা উপেক্ষা করে হয়ে উঠে সকল সম্প্রদায়ের।”

বেলা ২টায় লনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মঞ্চ যখন আমার শিরোনামের’ অধিবেশন। অভিনেত্রী বন্যা মির্জার সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন মঞ্চনাটকের তিন নাট্য অভিনেত্রী সারা যাকের, মিতা হক ও সামিনা লুৎফা।

এ পর্বে সারা যাকের বলেন, “শিল্পের কোনো সীমা নেই। তাই কোনো বিদেশি গল্প আশ্রিত করে আমরা যে নাটক করি, সেটাকেও নিজের মনে করি। কারণ, নাটকের ফর্মটা আমরা নিজেদের মতো করে গড়ি।”

সামিনা লুৎফা বলেন, “শুধু নাটক দিয়ে সমাজ বদল সম্ভব না। সমাজ বদলে একইসঙ্গে শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। তাই প্রতিটি সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নাট্যকর্মীদেরও থাকতে হবে সামনের সারিতে।”

দুপুর ২টায় ব্র্যাক স্টেজে ‘পাবলিশিং পেইনস’ শিরোনামের বৈঠকে অংশ নেন এশিয়া প্যাসিফিক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (আপিপিএ)র সভাপতি প্রাবদা ইয়ুন, ভারতের হারপার কলিন্সের প্রকাশক ভিকে কার্তিকা, মাহরুখ মহিউদ্দিন।

নতুন প্রকাশকদের আত্মপ্রকাশ, মুক্তধারার প্রকাশনা সংস্থার বিকাশ ইস্যু ছাড়িয়ে এই প্যানেলের আলোচনায় মুখ্য হয়ে উঠে ছাপা বইয়ের পাঠক কিভাবে প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সের্লাস অ্যাসোসিয়েশন অব থাইল্যান্ড (পিইউবিএটি) এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রাবদা ইয়ুন বলেন, “এ যুগে এসে পাঠক স্বাভাবিকভাবেই প্রযুক্তির দিকেই ধাবিত হবেন, এটা মেনে নিতে হবে আমাদের। কিন্তু তাই বলে ছাপা বইয়ের পাঠক কিন্তু একেবারেই হারিয়ে যাবে না। এখন তো প্রিন্ট ভার্সনের সঙ্গে অনেক প্রকাশক ই বুকও প্রকাশ করছেন। পাঠকের রুচি, অভিমত কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা বুঝেই আসলে বই প্রকাশ করতে হবে।”

জনপ্রিয় সাহিত্যগুলো প্রযুক্তিমাধ্যমে পাইরেসি হয়ে ক্রমেই আবেদন হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ভারতের প্রকাশক ভিকে কার্তিকা।

তিনি বলেন, “পাঠকরা গান বাজনার মতো বইও ফ্রি ডাউনলোড করতে চাইছে। কী ভয়াবহ! এভাবে চলতে থাকলে তো একদিন প্রিন্ট ভার্সন সত্যি হারিয়ে যাবে। আমি শুনেছি, এখানেও নাকি পাইরেটেড বই বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।”

তরুণ প্রকাশকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “উঠে আসতে গেলে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকবেই। টাকা, শ্রম, স্বপ্ন সবকিছু মিলিয়ে তবেই তো উঠে  আসতে হবে।  তবে তারও আগে তাদের তরুণ পাঠকদের অভিরুচি জানতে হবে তাদের।”

‘বীরাঙ্গনা’ শিরোনামের এক আলোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তরাজ্যের ডুরহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা পরিচালক ও রিডার নয়নিকা মুখার্জি; আলোকপাত করেন যুদ্ধকালীন সময়ে নারীর উপর নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা।

নয়নিকা বলেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের নারীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার কোনো স্বীকৃতি মেলেনি অনেকদিন। অনেকদিন পরে হলেও বাংলাদেশ সরকার সেই বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে।”

বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আগে তো লোকে ভাবত, অস্ত্র হাতে যারা যুদ্ধে গেছেন, তারাই মুক্তিযোদ্ধা। এখন এই ধারণার পরিবর্তন হবে। এই সম্মাননা উদাহরণ হয়ে থাকল।”

দুপুর সোয়া ৩টায় কেকে টি স্টেজে অনুষ্ঠিত হয় ‘টিকে থাকার আজ কাল পরশু’ শীর্ষক অধিবেশন।

পশ্চিমবঙ্গের নিউরো সায়েন্টিস্ট গার্গো চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন ফিরোজ আহমেদ, চলচ্চিত্রকার ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী, সাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল ও মানস চৌধুরী।

একই সময়ে লনে ‘জীবনের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনায় নিজের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে কথা বলেন নন্দিত কবি নির্মলেন্দু গুণ।