১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

৩৫ বছরের মধ্যে বৃষ্টিবহুল এপ্রিল

  • মঈনুল হক চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2017-04-24 21:46:15 BdST

bdnews24
রাজধানীতে বৃষ্টির ছবিটি তুলেছেন আব্দুল মান্নান

এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩ মিলিমিটার। এবার  সপ্তাহ বাকি থাকতেই রেকর্ড হয়ে গেছে ৮ হাজার ৯০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের।

৩৫ বছরের মধ্যে এপ্রিল মাসে এবারের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত আর হয়নি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এর চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১৯৮১ সালে, তখন ১০ হাজার মিলিমিটার ছাড়িয়েছিল।

এবার বৈশাখ শুরুর আগে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে প্রায় সারাদেশে। এপ্রিলে কালবৈশাখী ঝড় স্বাভাবিক চিত্র হলেও এবার যতক্ষণ বৃষ্টি হচ্ছে ততক্ষণ মুষলধারে ঝরছে, যা সাধারণত বর্ষাকালেই দেখা যায়।

অনেক বছর পর এ ধরনের ভারি বর্ষণকে ‘ক্লাইমেট ভ্যারিয়েবিলি’ বলছেন আবহাওয়াবিদরা। বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয় বেশি দুর্বল থাকায় পুবালি ও পশ্চিমা লঘুচাপের সক্রিয়তাকে অতি বর্ষণের কারণ দেখাচ্ছেন তারা।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সাধারণত এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলেও তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৭-৭৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু এবার স্বাভাবিকের চেয়ে ১১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হচ্ছে।

এপ্রিলের বিভিন্ন দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, ২ এপ্রিল সিলেটে ৭১ মিলিমিটার, ৩ এপ্রিল সিলেটে ৮১ মিলিমিটার, ৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে ৫৮ মিলিমিটার, ৫ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে ১২২ মিলিমিটার, ৭ এপ্রিল সিলেটে ৬২ মিলিমিটার, ৮ এপ্রিল নেত্রকোণায় ২১ মিলিমিটার, ১৫ এপ্রিল দিনাজপুরে ৩৬ মিলিমিটার, ১৮ এপ্রিল তেঁতুলিয়ায় ৩৩ মিলিমিটার, ১৯ এপ্রিল মাদারীপুরে ১১৪ মিলিমিটার, ২০ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে ১৯৪ মিলিমিটার,  ২১ এপ্রিল দিনাজপুরে ৯৭ মিলিমিটার, ২২ এপ্রিল মাইজদীতে ৯৮ মিলিমিটার ও ২৩ এপ্রিল রাঙ্গামাটিতে ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সোমবার পর্যন্ত চলতি মাসে সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১১৯.৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

“এটা বেশ ব্যতিক্রম বলতে হবে। পশ্চিমা ও পুবালি লঘুচাপের সংমিশ্রণের ফলে এবার বৃষ্টি বেশি হয়েছে।”

রেকর্ড ঘেঁটে তিনি জানান, ১৯৮১ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৭, ১৯৯৮, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৫ সালেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলেও তা এবারের চেয়ে কম।

বৃষ্টির আগে মেঘের ঘনঘটা

বৃষ্টির আগে মেঘের ঘনঘটা

এবারের এপ্রিল মাসের ব্যতিক্রমী আবহাওয়াকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলে মনে করছেন না আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০-৩০ বছরের ব্যবধানে আবহাওয়ার এমন রূপ থাকে। এবার বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয় দুর্বল থাকায় জলীয় বাষ্প বেশি থেকেছে টানা কিছুদিন, এতে ভারি বর্ষণ হয়েছে। এটাকে ক্লাইমেট ভ্যারিয়েবিলিটি বা জলবায়ু বৈচিত্র্য বলা যায়।”

এ আবহাওয়াবিদ বলেন, উচ্চচাপ বলয় যত শক্তিশালী হয় কালবৈশাখী ঝড় তত কম হয়। এবার দুর্বল থাকার কারণে পুবালি-পশ্চিমা লঘুচাপের সংমিশ্রণ বাংলাদেশের উপর বেশি সক্রিয় হয়েছে বলে বর্ষণ বেশি হচ্ছে।

তবে উচ্চচাপ বলয়ের দুর্বলতা কেটে যাওয়ায় আগামী দু-একদিনের মধ্যে বৃষ্টি কমে আসবে বলে মনে করেন সমরেন্দ্র কর্মকার।

তবে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় তাপমাত্রা বাড়লে তা উপরে উঠে মেঘ হয়ে ফের মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি।

অসময়ের ভারি বর্ষণের সঙ্গে হাওর অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতিতে এবার জনদুর্ভোগ শুরু হয়েছে বর্ষার আগেই।

সুনামগঞ্জে তলিয়ে যাওয়া হাওর

সুনামগঞ্জে তলিয়ে যাওয়া হাওর

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহন কুমার দাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এপ্রিল মাসে এর আগে ২০০০, ২০০২, ২০০৪, ২০১০, ২০১৬ সালে হাওর অঞ্চলসহ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।

এবার সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় সব হারিয়েছেন কয়েক লাখ কৃষক।

গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সোমবার পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এবার হাওর তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। ২৯ মার্চ ওইসব এলাকা প্লাবিত হওয়ার নজির নেই।

এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেন মোহন দাস।

“সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে, আগাম পূর্বাভাসকে কাজে লাগাতে হবে। সেই সঙ্গে টেকসই উন্নয়নে সমন্বত কর্মপরিকল্পনা নেওয়ারও সময় এসেছে।”