রাখাইনে ‘গণহত্যা’ হয়েছে, গবেষণায় তথ্য

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2018-09-22 18:53:12 BdST

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘গণহত্যার’ শিকার হয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’ পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতনকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় ‘বিদ্রোহীদের’ হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। সেই সঙ্গে শুরু হয় বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল।

গত এক বছরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের কথায় উঠে এসেছে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমারের বাহিনীর ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে

। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়।

তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকারের ওই দাবি নাকচ করে দিয়ে জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, রাখাইনে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সমতুল্য।

শনিবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘দ্য রোহিঙ্গা জেনোসাইড: কমপাইলেশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস অব সারভাইবারস টেসটিমনিস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে করা হয়।

‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’ এর গবেষক ইমরান আজাদ বলেন, “আমরা ১৬১ জন রোহিঙ্গার ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ নিয়েছি। যে ভাষ্য বা প্রমাণগুলো পেয়েছি, তা আমরা দেখতে চেয়েছি বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের অপরাধী কাঠামোর আলোকে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হয়েছে কিনা তা আমরা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা বিরোধী আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৯৮ সালের আইসিসির (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বুঝতে চেয়েছি।

“এই দুইটি আইনে গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, গণহত্যা তখনই হবে যখন কাউকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাকে বা তাদের আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া, হত্যা, শরীরিক-মানসিক আক্রমণ বা অত্যাচার করা। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যার মাধ্যমে সেখানে বসবাসকারী মানুষ বা পুরো সম্প্রদায় ওই স্থান থেকে নিঃশেষ হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা মুসলিম ও তারা এথনিক- এই পরিচয়ের কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতন  চালিয়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় দেখেছি, রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় বা ধর্মচর্চার অধিকারে আক্রমণ করা হয়েছে। হত্যা-নির্যাতন করা হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নারীদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে।”

গণহত্যার উদ্দেশ্যে তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এই শিক্ষক বলেন, “মিয়ানমারের সেনাবিাহিনীর প্রধানের বক্তব্যে আমরা দেখেছি, উনি রোহিঙ্গা সমস্যাকে একটি বাঙালি সমস্যা হিসেবে দেখছেন এবং তাদের নির্মূল করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।”

২০১৭ সালের অক্টোবর, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে তিন দফায় কক্সবাজারের আটটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৬১ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে গুণগত গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

আক্রমণের শিকার জনগোষ্ঠী ও প্রত্যক্ষদর্শী এবং ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষক দলের সদস্য শাওলি দাসগুপ্ত গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে বলেন, “আমরা যে সাক্ষ্যগুলো পেয়েছি, সেগুলোতে প্রমাণ হয় যে, গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছে মিয়ানমারের মিলিটারি ফোর্স ও সরকার এবং এলাকার বৌদ্ধরা যারা মগ নামে পরিচিত তারা এ কাজগুলো করেছে।”

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’ এর পরিচালক মফিদুল হক বক্তব্য দেন।