২৫ মার্চ ২০১৯, ১১ চৈত্র ১৪২৫

যেভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল চকবাজারের আগুন

  • তাবারুল হক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-02-21 21:44:09 BdST

bdnews24
ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ঠাসাঠাসি করে থাকা প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল, প্রসাধনীর গুদাম, হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার, বই-খাতা বাধাইয়ের দোকান আর সঙ্কীর্ণ রাস্তায় তীব্র যানজট- এসবই চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনকে ভয়াবহ মাত্রা দিয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, রিকশায় বসে থাকা অবস্থাতেই এক দম্পতি শিশু সন্তানসহ জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। আর প্রথম যে ভবনে আগুন লাগে, সেই ওয়াহেদ মঞ্জিলের দোকানপাট ও গুদামে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতাদের অধিকাংশই বের হওয়ারই সুযোগ পাননি। কিছু দেহ এমনভাবে পুড়েছে যে, শনাক্ত করারও উপায় নেই।   

ছবি: রয়টার্স

ছবি: রয়টার্স

বুধবার রাতের ওই অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে অগ্নি নির্বাপক বাহিনী এখনও নিশ্চিত হতে না পারলেও শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত।

প্রত্যক্ষদর্শীদরাও বলেছেন, ওই মোড়ে ভিড়ের মধ্যে একটি পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে প্রথমে রাস্তায় থাকা যানবাহনে এবং পরে আশপাশের ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

ছবি: রয়টার্স

ছবি: রয়টার্স

চুড়িহাট্টা মসজিদের পাশে প্রয়াত ওয়াহেদ চেয়ারম্যানের চার তলা ভবনটিতে (ওয়াহেদ মঞ্জিল) প্রথমে আগুন লাগে। তারপর তা পাশের রাজমহল নামে একটি রেস্তোরাঁ এবং সরু রাস্তার উল্টো দিকের তিনটি ভবনে ছড়ায়।

পুরান ঢাকার ওই সংকীর্ণ সড়কে রাত সাড়ে ১০টায় অগ্নিকাণ্ড শুরুর সময়ও ছিল যানবাহন আর মানুষের ভিড়। তাছাড়া মসজিদের সামনে ফুটপাতের উপর দোকান, আনাস হোটেলের সামনে একটি ফলের দোকান এবং আরও কয়েকটি ভাসমান দোকান ছিল। মসজিদের উত্তর পাশে, সামনে, দক্ষিণপাশের রাস্তায় ছিল গাড়ি আর চলতি পথের যাত্রীদের ভিড়।

আগুন লাগার দুই মিনিট আগে ওই এলাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল তা উঠে এসেছে স্থানীয় আজগর আলী লেনের বাসিন্দা আবদুল আলিমের ভাষ্যে।

“আমি রাজমহল হোটেল থেকে রুটি নিয়ে বাসায় যাই। যখন আমি হোটেলে আসি তখন চুড়িহাট্টা মোড়ে ব্যাপক যানজট দেখতে পাই। গাড়িগুলো সেখান থেকে সহজে বের হতে পারছিল না, যানজটের কারণে পথচারীদের হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছিল।”

চকবাজারের প্লাস্টিক কাঁচামালের ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন বলেন, ওয়াহেদ মঞ্জিলের দোতলার পুরোটা পাইকারি ও খুচরা প্লাস্টিক জিনিসপত্রের কাঁচামালের দোকান ও গোডাউন ছিল। বিভিন্ন প্রসাধনীর গোডাউনও ছিল সেখানে। ওয়াহেদ মঞ্জিলের সামনেরও দুইটি ভবনের নিচ ও দোতলাতে একাধিক এ ধরনের দোকান ছিল। এলাকাটা মূলত প্লাস্টিক কাঁচামালের দোকান ও গোডাউন।

আগুনের ভয়াবহতার বর্ণনা করে সাব্বির বলেন, “শুনেছি গাড়ির সিলিন্ডার থেকে আগুন লাগে, তারপর যানজটে আটকে থাকা অন্যান্য গাড়ির সিলিন্ডার, খাবার হোটেলের সিলিন্ডার ও অন্যান্য যানবাহনের জ্বালানির কারণে পুরো রাস্তায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ওয়াহেদ মঞ্জিলের দোতলায় প্লাস্টিকের দানা ও অন্যান্য প্রসাধনী আগুনকে আরও দাউ দাউ করে জ্বলতে সাহায্য করে।”

তিনি জানান, তার পরিচিত ওয়াহেদ মঞ্জিলের এমআর টেলিকমের দুই ভাই- রানা ও রাজু মারা গেছেন। এ ভবনের সামনের ভবনে হায়দার মেডিকোর মঞ্জু পুড়ে মারা যান।

মো. সোহেল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “সড়কের একটি গাড়ি থেকে আরেকটি গাড়িতে আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে রিকশায় বসা অবস্থাতেই পুড়ে এক দম্পতি ও তাদের কোলের শিশু মারা গেছে।”

আরেক স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সোলায়মান বলেন, “আগুন রাস্তা থেকে দোকানে, এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভবনে লাগে। সবচেয়ে বেশি আগুন লাগে ওয়াহেদ মঞ্জিলে। এ ভবনের নিচ তলায় চোখের পলক ফেলা সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, ভেতরের অধিকাংশ ক্রেতা-বিক্রেতা বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পায়নি, সেখানে আটকে পড়ে বহু মানুষ মারা যায়।”

ছবি: রয়টার্স

ছবি: রয়টার্স

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মমিনুল ইসলাম বলেন, এখানকার ভবনগুলো অপরিকল্পিত এবং যত্রতত্র প্লাস্টিকের কাঁচামাল, রাসায়নিকের দোকানপাট ও গোডাউন থাকায় আগুনের মাত্রা বেড়ে যায়।

একই কথা বলেছেন আশিক উদ্দিন নামের আরেক বাসিন্দা।