২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫

আতঙ্ক কাটছে না চুড়িহাট্টাবাসীর

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-02-23 00:15:05 BdST

bdnews24
চুড়িহাট্টা মোড়ের ওয়াহেদ ম্যানশনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘ঝুকিপূর্ণ ভবন লেখা সতর্কবাণী।ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ভয়াবহ আগুন অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ আর বিপুল সম্পদ গিলে নেওয়ার পর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এখন অনেকটাই ভুতুড়ে এলাকা। একদিন আগের আগুনের বিভীষিকা যেন পিছু ছাড়ছে না স্থানীয়দের। 

অগ্নিকাণ্ডের সময় স্থানীয় যারা বাসাবাড়ি ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ফিরলেও এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে অনেকের মধ্যে।

চুড়িহাট্টা মোড় থেকে পূর্ব দিকে কয়েক গজ গেলে বাম দিকের গলির শেষ মাথার বাড়ির মালিক মো. মঈন উদ্দিন।

তার সামনের ভবনে আগুন লাগায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ির পেছনের গেইট দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বুধবার রাতে। তার বাড়ির অর্ধেক ভাড়াটিয়া ফিরে এলেও অন্যরা আতঙ্কে ফিরছেন না বলে জানান তিনি।

“তাদেরকে ভরসা দিচ্ছি যে কিছু আর হবে না, কিন্তু তারা ভরসা পাচ্ছে না,” বলেন ষাটোর্ধ্ব মঈন উদ্দিন।

নন্দ কুমার দত্ত লেনের পাশে হায়দার বখশ লেইনের একটি বাড়ির বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী মো. আনোয়ার হোসেনের চোখে এখনও আটকে আছে ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা।

চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশেই তার বাসা। আগুন লাগার পর ভবনের আর সব বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রাণ বাঁচাতে তিনিও সপরিবারে ছুটেছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দৌঁড়াতে গিয়ে আহত হন তার স্ত্রী মুনিরা বেগম।

সেই রাতের কথা মনে করে শিউরে ওঠেন আনোয়ার।

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় রাসায়নিকের দোকানে পুড়ে যাওয়া বস্তা।ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় রাসায়নিকের দোকানে পুড়ে যাওয়া বস্তা।ছবি: মাহমুদ জামান অভি

“আমরা এখনো ঘুমাইতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও কান্নার আওয়াজ পাই। সকালে এলাকায় আইস্যা দেখি, লাশ আর লাশ! এই দৃশ্য সহ্য করা যায় না।”

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের হায়দার ফার্মেসির মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন। এই সড়কে তার বসবাস ২৩ বছর ধরে।

“আগুন লাগার আগে ফার্মেসিতে অন্তত নয়জন ছিল। ডাক্তার মঞ্জু ভাই, তার দুজন সহকর্মী, আর বাচ্চা কোলে আসা মহিলা.... আরও কেউ কেউ...... আগুন লাগার পরে বাঁচার জন্য শাটার নামায়া দিছিল..... ভাইরে... ভিতরে সব পুইড়া মরল। সকালে তাদের লাশ যখন বাইর করে...” বলতে বলতে কেঁদে উঠেন শরীফ।

তাকে সান্তনা দিতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেন আনোয়ার হোসেনসহ চুড়িহাট্টার আরো দুই বাসিন্দা।

আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত ওয়াহেদ ম্যানশনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায় চুড়িহাট্টা মোড়ের এক কোণে। ফ্যালফ্যাল চোখে তিনি তাকিয়ে ছিলেন পোড়া বাসার দিকে।

তিনি বলেন, “বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছি। কীভাবে বের হয়ে গেছি সবাই জানি না।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলাতেই একসঙ্গে ২৪টি মৃতদেহ পাওয়া যায়, সিঁড়ি ঘরের ফ্লোরে দলা পাকানো অবস্থায় ছিল পোড়া লাশগুলো। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও পারেনি হতভাগ্য মানুষগুলো।

চকবাজারের ব্যবসায়ী নূর হোসেন মাত্র মিনিট কয়েকের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি রানা–রাজুর দোকান আসছিলাম। আমার এক বন্ধু কামালও আমারে চা খাওয়াতে চাইছিল। আমি বললাম, কালকে খামু।

“একটু পরে জোরে জোরে আওয়াজ আর বিস্ফোরণ। চারপাশে আগুন আর আগুন। এমন ঘটনা আমি আর কখনো দেখি নাই। বিশ্বাস করেন, রাতে দুই চোখের পাতা এক করলে এখন খালি রানা-রাজু আর কামাল ভাইরে দেখি। কত ভালা ভালা মানুষগুলা কেমন কইরা চইলা গেল।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় পারফিউমের ক্যানের স্তূপ সরাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় পারফিউমের ক্যানের স্তূপ সরাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তুপ থেকে মৃতদের লাশ বের করতে সহযোগিতা করেছিলেন মোহাম্মদ সুরুজ। মঞ্জুর ফার্মেসি, মদিনা ডেকোরেটর্স আর সড়ক থেকে ৩০টি লাশ তিনি নিজ হাতে উদ্ধার করেন।

শুক্রবার দুপুরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নন্দ কুমার দত্ত লেইনে। বললেন, দুর্ঘটনার বর্ণনা শোনার পর তার দুই শিশু কন্যার মনেও বড় প্রভাব পড়েছে।

“আমার বড় মাইয়াডা ভয়ে আমারে সারাক্ষণ জড়ায়া থাকে। এই যে আসছি, সে তো আসতেই দিতে চাইতাছিল না। খালি কয়, আব্বা আবার যদি আগুন লাইগ্যা যায়, তুমি যাইও না।”

রাসায়নিকের গুদামগুলো যেন মৃত্যুফাঁদ

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের চাল ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন মনে করেন প্লাস্টিক, রাসায়নিকের মজুদের কারণে আগুন এত বেশি বিস্তৃত হয়।

“আমরা কতবার বলছি, আবাসিক এলাকা থেকে এসব বিপজ্জনক জিনিস সরান। থানার লোকজনের সামনেই এসব ব্যবসা হইত। থানায় গিয়া অভিযোগ দিয়াও তো কোনো লাভ হয় নাই। নিমতলির ঘটনায় কারো শিক্ষা হয় নাই। এই এলাকার বাড়িওয়ালারাও বেশি টাকার লোভে গোডাউন ভাড়া দেয়, আর তাতে এসব মালামাল মজুদ করা হয়। দোষ তাদেরও কম না।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো দিকের ভবনের মালিকানা চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের। সেই ভবনের পেছনে ছোট ঘরে হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডারগুলো মজুদ করা হত বলে এলাকাবাসী জানায়।

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের বাসিন্দা আশিকউদ্দিন সৈনিক বলেন, “ওই ভবনে বেআইনিভাবে মজুদ করা সিলিন্ডারগুলো একবার বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। পারা যায়নি। বাড়ির পাশে এসব সিলিন্ডার রাখা মানেই যেন বাড়ির পাশে বোমা-বারুদের গোডাউন।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো দিকে আনাস হোটেল। তার পেছনের ভবনের মালিক দুই ভাই সোহেল ও ইসমাইল। এ ভবনের নিচতলায়ও রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে বলে জানান পাশের বাড়ির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলিম উদ্দিন।

“আমাদের তিনতলা ভবনে কোনো ভাড়াটিয়া নেই। কোনো গোডাউনের জন্যও ভাড়া দেওয়া নেই। আমরা ও চাচাদের পুরো পরিবার সেখানে বাস করি। কিন্তু আমাদের বাড়ির সামনের ভবনটিতে নানা ধরনের কেমিক্যালের গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেওয়া আছে। এসব তো আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ।”

পোড়া ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় পারফিউমের ক্যানের স্তূপ। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

পোড়া ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় পারফিউমের ক্যানের স্তূপ। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

আলিম বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের আকুল-আবেদন এসব কেমিক্যালের গোডাউন যেন আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হয়। আমাদের জীবনের মূল্যের কথা যেন রাষ্ট্র একবার চিন্তা করে।”

চুড়িহাট্টা মোড় থেকে এক মিনিটের দূরত্বে ১৫/১ নম্বর বাড়ির মালিকদের একজন মো. সোহেল বলেন, তাদের সামনের লাভলু সাহেবের বাড়ির পুরোটাই বিভিন্ন রাসায়নিকের গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া আছে।

“এখন তো দেখছি এসব গোডাউন আমাদের মরণের ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

রাসায়নিকের কারণেই জানমালের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মন্তব্য করে সোহেল বলেন, “যারা আবাসিক ভবনে গোডাউন ভাড়া দিয়েছে, এর পরবির্তে বাসা-বাড়ি হিসেবে যেন ভাড়া দেওয়া হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”

১৪ নম্বরের পাঁচতলা বাড়ি ‘আশিকিন স্কয়ারের’ মালিকের ছেলে আশিকিন পারভেজ জানান, তাদের বাড়ির আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতেই রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে।

“এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে নিমতলীর আগুনের পরও আবাসিক ভবন থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরানো গেল না। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যদি শক্ত অবস্থানে থাকত তাহলে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব হত।”

আছে ভিন্নমতও

চুড়িহাট্টার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিমের মতে, পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণেই আগুনের সূত্রপাত এবং বিস্তৃতি।

“মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর অতিরিক্ত যানজটের কারণে অন্যান্য গাড়ির সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে, যার কারণে এতগুলো মানুষের জীবন চলে গেছে।”

চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক দিন পর রাস্তা থেকে পোড়া জঞ্জাল সরাতে ব্যস্ত সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক দিন পর রাস্তা থেকে পোড়া জঞ্জাল সরাতে ব্যস্ত সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ইব্রাহিমের মতে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। যানবাহনের সকল মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার যাতে ব্যবহার না হয় সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় নিয়মিত যানজট লেগে থাকে। চুড়িহাট্টার আগুনের ভয়াবহতার জন্য এ যানজট দায়ী বলে মনে করেন তিনি।

“এই এলাকায় আমাদের পূর্বপুরুষরা বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন। এখন আমরা ব্যবসা করছি। কেউ যদি বলে কোনো গোডাউন বা কেমিক্যালের কারণে আগুন লেগেছে, এটা সম্পূর্ণ ভুল হবে। এই আগুন কোনো কেমিক্যাল থেকে লাগেনি। সিলিন্ডার থেকে লেগেছে, সরকারকে গাড়ির সেসব সিলিন্ডার নিয়ে ভাবতে হবে।”

একই অভিমত চকবাজারের ছাতা মসজিদ গলির বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাকের।

চুড়িহাট্টা মোড় এখন যেমন

চুড়িহাট্টা এলাকায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ভবনসহ আশপাশের অন্তত ১০টি ভবন ছাড়া অন্যান্য ভবনে শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনে পোড়া যানবাহনের অংশ, পারফিউম, প্রসাধনী ও অন্যান্য ছাইয়ের অংশ পরিষ্কার করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২ পযন্ত ১০০ পরিচ্ছন্নকর্মী এ কাজে অংশ নেন।

ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এখনও সেখানে অবস্থান করছে। উৎসুক মানুষের ভিড় ঠেকাতে আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।