ফাঁসছেন সোনাগাজীর সেই ওসি মোয়াজ্জেম

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও আদালত প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-05-26 22:57:18 BdST

ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দি ইন্টারনেটে ছড়ানোর অভিযোগের ‘প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পিবিআই।

গত মার্চ মাসে নুসরাত তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করার পর তার তদন্তে তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম থানায় ডেকে নিয়ে এই মাদ্রাসাছাত্রীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন।

তার কয়েকদিনের মাথায় নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করা হলে তা নিয়ে সারাদেশে আলোচনার মধ্যে ওই জবানবন্দির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের মৃত্যুর পর গত ১৫ এপ্রিল ওই ভিডিও ছড়ানোর জন্য ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামি করে ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মাদ আস সামছ জগলুল হোসেন ওই অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।

ওই মামলার শুনানির আগের দিন রোববার ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পিবিআই, যারা নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলাও তদন্ত করছে।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার কুমার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে সব অভিযোগ করা হয়েছে, আমরা তার কিছু প্রমাণ পেয়েছি।”

সোনাগাজীর ওসি বদলি, মামলার দায়িত্বে পিবিআই

সোনাগাজীর সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম সাময়িক বরখাস্ত  

নুসরাতের ভিডিও: ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা  

নুসরাত হত্যা: পুলিশের ভূমিকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় টিআইবি

তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানালেও রোববার রাত পর্যন্ত সাইবার ট্রাইব্যুনালে যোগাযোগ করে প্রতিবেদন জমা হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ট্রাইবুনালের পেশকার মো. শামীম আল মামুন রাত ৮টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় বলেন, “পিবিআইর কোনো প্রতিবেদন আমরা এখনও পাইনি।”

আদালত কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মামলাটির তারিখ ধার্য রয়েছে।

একই কথা জানান মামলাকারী আইনজীবী সায়েদুল হক সুমনও।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সোমবার মামলাটি আদালতে উঠবে এবং পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে তিনি জেনেছেন।

“১৩ পৃষ্ঠার রিপোর্টে ক্লিয়ারকাট সব উল্লেখ করেছে পিবিআই। আমি যেসব অভিযোগগুলো ওসির বিরুদ্ধে করেছিলাম, তদন্ত রিপোর্টে সেগুলোই উঠে এসেছে।”

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন

ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিও নিয়ে প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছিলেন, নির্যাতিতের এ ধরনের ভিডিও ধারণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

মামলায় আইনজীবী সুমন বলেছিলেন, “যেহেতু ওসি নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনুমতি ব্যতিরেকে ভিডিও ধারণ করে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করেন এবং অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষা প্রয়োগ করেন, তাই তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।”

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় মামলাটি করেন তিনি, এই ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রথমে সোনাগাজী থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় পুলিশ বাহিনী থেকে।

ঢাকার হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি বলে যান তার গায়ে আগুন দেওয়ার কথা

ঢাকার হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি বলে যান তার গায়ে আগুন দেওয়ার কথা

তবে মোয়াজ্জেমের দাবি, তার মোবাইল থেকে নুসরাতের জবানবন্দির ভিডিও তার ‘অজ্ঞাতসারে’ স্থানান্তরিত হয়েছিল।

তিনি গত ১৪ এপ্রিল সোনাগাজী থানায় করা এক সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) বলেন, অফিসে মোবাইল ফোন রেখে তিনি ওয়াশরুম ও নামাজের জন্য বের হলে ওই সুযোগে স্থানীয় সাংবাদিক আতিয়ার সজল তার মোবাইল ফোন থেকে ভিডিওটি নিয়ে যান, যা তিনি তার মোবাইল হিস্ট্রির মাধ্যমে জানতে পারেন। এটা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আতিয়ার সজল পাল্টা আরেকটি জিডি করেন। তাতে তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম তার বিরুদ্ধে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

সজলের দাবি, বলেন, গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসায় নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে তথ্য জানতে চাইলে তিনি নুসরাতের ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজে থেকেই ওই ভিডিও দেখান, পরে তাকে দেন। তবে তিনি তা ইন্টারনেটে তোলেননি।

ফেনী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আসাদুজ্জামান দারাও বলেছিলেন, ওসি মোয়াজ্জেম প্রথমে নুসরাতের ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্য পূরণে ওই ভিডিওটি সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন তিনি।

নুসরাতের খাতার পাতায় অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের বর্ণনা

নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়েছিল ৫ জন: পিবিআই

অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ‘বৈঠক করে’ নুসরাতের গায়ে আগুন

নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে স্থানীয় রাজনীতিও: ডিআইজি  

সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে ২৬ মার্চ ছাত্রী নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছিল।

নুসরাতের মা ওই মামলা করার পরদিন অধ্যক্ষ সিরাজ ও নুসরাতকে থানায় ডেকে নিয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম। সেদিনই নেওয়া হয়েছিল নুসরাতের জবানবন্দি।

ওই দিন অধ্যক্ষ সিরাজকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; তখন তার মুক্তির দাবিতে একদল কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি মামলা প্রত্যাহারে নুসরাতকে চাপ দিচ্ছিল।

এরপর ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয়। এই তরুণী নিজেই বলে গেছেন, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা তুলতে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন দেওয়া হয়।

পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় নুসরাতের।

নুসরাতের মৃত্যুতে সারাদেশেই ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্ম দেয়; গোটা দেশেই নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়।