২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

‘খিচুড়ি রেঁধে’ মায়ের অপেক্ষায় তুবা

  • সাইমুম সাদ, গ্লিটজ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-08-12 23:20:00 BdST

উত্তর বাড্ডায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর চার বছর বয়সী মেয়ে তাসমিন মাহিরা তুবার এবারের ঈদ কাটছে মাকে ছাড়াই।

ছোট্ট শিশুটি মায়ের মৃত্যুর খবর জানে না। তাই ঈদের দিনে খেলনা বাটিতে খিচুড়ি রান্না করে মায়ের অপেক্ষায় কাটিয়ে দিয়েছে দিন।

ঈদের দিন সোমবার সন্ধ্যায় মহাখালীর ওয়ারলেস গেইট এলাকায় রেনুদের বাসায় ঢুকতেই দেখা মিলল তুবার, খেলনা চুলায় রান্নার হাঁড়ি চড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত সে। কী রাঁধছ জানতে চাইলে লাকড়ি নাড়িয়ে জানান দিল, ‘খিচুড়ি’।

পাশ থেকে তার খালা নাজমুন নাহার নাজমা বললেন, “অনেকক্ষণ ধরেই মায়ের জন্য রান্নাবাড়া করছে। তুবার ধারণা, মা আমেরিকায় আছে; ওর হাতে রান্না করা খিচুড়ি খেতে চলে আসবে।

“ওর খেলনা ফোনটা কানে দিয়ে মায়ের সঙ্গে একা একাই কথা বলে। পরে আমাদের বলে, আম্মুর সঙ্গে কথা বলবে? আমাদের বুকটা ভারী হয়ে যায়। ছোট্ট মেয়ের সামনে কাঁদতে পারি না।”

মাকে হারিয়ে ‘শান্তশিষ্ট’ তুবা এখন ‘অস্থির’ হয়ে উঠেছে বলে জানালেন রেনুর ভাগনে নাসির উদ্দিন টিটো।

তিনি বলেন, “আগে কিছু বায়না করলে বুঝিয়ে বললে শুনত। কিন্তু খুব অস্থির হয়ে গেছে। কোনো কিছু বলে বোঝানো যায় না। আমরাও ওদের নিয়েই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। ওর মাকে খোঁজে; হয়তো পায় না। ও যেটা বলতে চাচ্ছে সেটা হয়তো বুঝাতে পারে না।”

তুবা এখনও মায়ের অপেক্ষায় থাকলে তার এগারো বছরের ভাই মাহির মায়ের জন্য কেঁদে বুক ভাসায়। গণপিটুনিতে মায়ের নির্মম মৃত্যু এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় ব্রতী হওয়ার স্বপ্ন দেখে লক্ষ্মীপুরের লামচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহির।

প্রত্যেক ঈদেই মা তাকে জুতা-জামা, ব্যাট-বল আর স্টিকার কিনে দিতেন। দুই ভাই-বোনকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই জীবন্ত মা এখনও শুধুই স্মৃতি।

বুকভরা শূন্যতা বুকে চেপে ঈদের নামাজ পড়ে মায়ের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার আছে প্রার্থনা করেছে সে।

তাসলিমার ভাগনে বলেন, “বাসার প্রতিটা জায়গায় আন্টির স্মৃতি রয়েছে। কোরবানির ঈদের সময় তিনি রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকতেন। ফকিরদের দেওয়ার জন্য আমাকে টাকা দিতেন। গরুর মাংস বাসায় নিয়ে এলে ফকিরদের জন্য ভাগ করে রাখতেন। অনেক গরিব মানুষ খুঁজে খুঁজে মাংস বিলি করতেন।”

ঈদের সময় ঘুরতে পছন্দ করতেন রেনু; বিশেষ করে ঈদের সময় আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে যেতেন; বাচ্চাদের মার্কেটে নিয়ে গিয়ে জামাকাপড় কিনে দিতেন।

আর কোরবানির ঈদের সময় খুব ভোরে উঠতেন। বাইরে স্বভাবে শান্তশিষ্ট হলেও ঈদের সময় পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতেন বলে জানান টিটো।

তাসিলমাকে ছাড়া সাদাকালো এই ঈদের দিনে নিজেদের বর্ণিল জীবনের ঈদের গল্প শোনালেন নাজমা।

“আমরা পিঠাপিঠি তিন বোন একই রঙের পোশাক কিনতাম।রেনু সবার ছোট ছিল বলে আমাদের আদরের ছিল। ঈদের দিন সন্ধ্যার পর একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম। আজকে আমি একা হয়ে গেছি, বড় একা।

“ঈদের আগের দিন মেহেদি কিনে নিয়ে আসতাম। খুব সুন্দর মেহেদি লাগাতে পারত রেনু।আমাকে নকশা করে মেহেদী লাগিয়ে দিত।”

সবচেয়ে ছোট মেয়েকে অকালে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সত্তরোর্ধ্ব সবুরা খাতুন। সকাল থেকেই তিনি মেয়ের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন।

নাজমা বলেন, “রেনু মাকে গোসল করিয়ে দিত। সেমাই পায়েশ রান্না করে মাকে খাওয়াতো। আজকে মা দেখেন, ও নেই। মা অনেক ভেঙে পড়েছে।”