২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

যারা খেলায় নিত না, এখন তাদের অধিনায়ক শরিফুল

  • সুলাইমান নিলয়, ইংল্যান্ডের উস্টার থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-08-14 12:11:27 BdST

পায়ের উপর দিয়ে বাসের চাকা চলে যাওয়ায় কেটে ফেলতে হয় কিশোর শরিফুলের পা। সেই কষ্টও সামলে নিতে শিখেছিলেন তিনি। কিন্তু পা নেই বলে যখন বন্ধুরা খেলায় নিত না, সেই কষ্ট আর চেপে রাখা যেত না।

সেই কষ্টই হয়ত জীবন বদলে ফেলার প্রেরণ যুগিয়েছিল। যে বন্ধুরা একদিন খেলায় নিতে চাইত না, কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামের ক্লাবে সেই বন্ধুদের ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হয়ে যান পা হারানো শরিফুল।

সেখানে তিনি থেমে থাকেননি। বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের একজন হয়ে তিনি এখন খেলছেন দেশে বিদেশে।

শারিরীক প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেটে পাঁচ জাতির টুর্নামেন্ট উপলক্ষে শরিফুল এখন আছেন ইংল্যান্ডের উস্টার শহরে। বাংলাদেশ দলের এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ও উইকেট কিপার সেখানেই শোনালেন নিজের জীবন বদলের গল্প।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ইনামনগর গ্রামে ১৯৯৭ সালে যখন জন্ম হয়, শরিফুল ছিলেন আর দশটি বাচ্চার মতই। চট্টগ্রাম শহর লাগোয়া ওই গ্রাম থেকে তিনি পড়তে যান পাশের লতিফপুর আলহাজ আবদুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ে।

সময়টা ২০০৯, অষ্টম শ্রেণির দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা আসি আসি করছে। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া বোনকে বাদাম কিনে দেন শরিফুল। তাকে সাবধানে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু কে জানতো, সেদিন দুর্ঘটনায় পড়ে তার নিজেরই পা হারাতে হবে!

সেদিন বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে শরিফুলের রিকশাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি বাস। ছিটকে পড়া শরীফুলের পায়ের ওপর দিয়েই বাস চালিয়ে পালিয়ে যান চালক।

আহত অবস্থায় শরিফুলকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় কাছাকাছি একটি হাসপাতালে। পরে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

জীবনের বহু দুর্ভাগ্যের সূচনার সেই দিনকে তিনি এখনো স্মরণ করেন বড় আক্ষেপ ভরে। চিকিৎসা নিয়েও রয়েছে তার ক্ষোভ।

শরিফুল বলেন, “বড় ডাক্তাররা হাসপাতালে থাকে দুপুর পর্যন্ত। এখানে বড় ডাক্তারদের চিকিৎসাই দরকার ছিল। সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটি মিলিয়ে তিন দিন আমাতে সাধারণ চিকিৎসা দিয়ে রাখা হল। কিন্তু সেটা যথেষ্ট ছিল না। ফলে পা কেটে ফেলার জায়গায় চলে গেল।”

দরিদ্র বাবা-মা ছেলের পা কাটার সিদ্ধান্ত মানতে পারছিলেন না। প্রয়োজনে ঘরবাড়ি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু ডাক্তারের সাবধান বাণী ছিল, দেরি করলে বিপদ বাড়বে, তখন পা কাটতে হবে আরও উপর থেকে।

এরপর ডাক্তারের পরামর্শ মেনে নিলেন বাবা-মা। অপারেশনের পর দুরন্ত শরিফুল হয়ে গেলেন ক্র্যাচে-বন্দি।

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে শরিফুল বলেন, “বন্ধুরা আমাকে খেলায় নিত না। কষ্ট নিয়ে আমি মাঠের পাশে ক্র্যাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বড়রা আমাকে নিত না। বলত, ‘তুই পারবি না। তুই খেলিস না’।

“একটা সময় ছিল, যখন বাসা থেকেও সাপোর্ট পেতাম না। বলত, ‘তুই এখন খেলাধুলা করে কী করবি? এখন মন দিয়ে পড়াশোনা কর। তুই আর কোনো ভারী কাজ করতে পারবি না। তোর এখন বসে বসে কাজ করতে হবে’।”

কিন্তু শরিফুল তা মানলেন না। টাকা যোগাড় করে বল আর ব্যাট কিনলেন। এলাকার ছোট বাচ্চাদের বলতেন বল করতে, ক্র্যাচে ভর দিয়েই নিজে করতেন ব্যাট।

“এক পর্যায়ে নিজের ভেতরে একটা জেদ কাজ করল, মনে হল আমি পারব। ক্র্যাচে ভর দিয়েই খেলাধুলা চালিয়ে গেলাম।”

এক পর্যায়ে শরিফুলের বাবা এলাকার এক মুরুব্বির সহায়তায় ছেলের কৃত্রিম পা সংযোজন করেন। তবে সেই পায়েও স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করা যেত না। এক সময় শরিফুল সন্ধান পান চট্টগ্রাম সিআরপির।

সেখানে কিছুটা উন্নত কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা হয়। সিআরপিতেই শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট শুরুর খবর পান। সময়টা তখন ২০১৪ সাল।

চট্টগ্রামে প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে যাওয়ার পর শরিফুলকে পাঠানো হয় ঢাকায়। সেখানে দেড় মাসের ক্যাম্পে নিজেকে তিনি শানিত করে তোলেন। তখন থেকেই বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেট দলের একজন তিনি।

শরিফুলের গ্রামের ক্লাবের নাম মোস্তাক স্মৃতি সংসদ। কয়েক বছর ধরে শরিফুলের বন্ধুরা খেলছেন সেই ক্লাবের জুনিয়র টিমে, যারা এক সময় তাকে খেলায় নিতে চাইত না।

অনেকগুলো বছর পর এখন গ্রামের সেই দলের নেতৃত্ব দেন শরিফুল। তার হাতে নেতৃত্ব দিতে পেরে ক্লাবই যেন সম্মানিত।

ক্লাব সদস্য আব্দুল হালিম ছোটন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাবতে ভালোই লাগে যে, শরিফুল আমাদের এলাকার ছেলে, সে আমাদের ক্লাবে খেলে।”

ছোটন জানান, তাদের ক্লাবে দুটো দল রয়েছে। সিনিয়র দল ও জুনিয়র দল। শরিফুল সিনিয়র দলেও খেলেন আর জুনিয়র দলেরও নেতৃত্ব দেন।

শরিফুল জানান, এখন তিনি উন্নত কৃত্রিম পা পেয়েছেন। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ক্রিকেটের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস (আইসিআরসি) এই কৃত্রিম পা সংযোজনের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেছে।