১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬

৩ বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত, বিচারকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-08-22 16:40:44 BdST

bdnews24
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

‘অসদাচরণের’ অভিযোগে হাই কোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত হওয়ার পর তাদের বিচারকাজ থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করেই প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এ পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ।

উচ্চ আদালতের এই তিন বিচারক হলেন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক।

তাদের নির্ধারিত বেঞ্চ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকায় রাখা হয়নি। তিন বিচারকও আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেননি।

তিন বিচারকের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ রয়েছে- তা স্পষ্ট করেনি সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ। তবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ‘ভাবমূর্তি ঠিক’ রাখার জন্য, বিচার বিভাগকে ‘কলুষমুক্ত’ রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি ছিল আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি।

তিন বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি নিয়ে সকাল থেকে নানা গুঞ্জন চললেও সুপ্রিম কোর্ট বা আইন মন্ত্রণালয়ের কেউ মুখ খুলছিলেন না। সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খবর আসছিল সংবাদমাধ্যমে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে ‘অবগত নেই’ বলে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান। আর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তখন স্পষ্ট কিছু না জানিয়ে কেবল বিষয়টি ‘শোনার’ কথা বলেন। 

শেষ পর্যন্ত বিকালে সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, “হাই কোর্টের মাননীয় তিনজন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে মহামন্য রাষ্ট্রপতির সাথে পরামর্শক্রমে তাদের বিচারকার্য থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করা হয় এবং পরবর্তীতে তারা ছুটির প্রার্থনা করেন।”

সাংবাদিকরা তিন বিচারকের নাম জানতে চাইলে সাইফুর রহমান প্রথমে নিরুত্তর থাকেন। সাংবাদিকরা তখন তিন বিচারকের নাম বলে জানতে চান- তাদের ক্ষেত্রেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র সাইফুর রহমান তখন বলেন, “আপনারা তো লিখেছেনই।”

তিন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এ কর্মকর্তা।

বিকেলে নিজের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আরও কিছু তথ্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তবে তিনিও অভিযোগের বিষয়গুলো বিশদ করেননি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “অভিযোগ অনুসন্ধানের পরেই জানা যাবে। কী অভিযোগ তা জনসম্মুখে প্রকাশ করাটা আমি মনে করি বিচার বিভাগের জন্য শুভ হবে না। আর এটা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির ব্যাপার, বিষয়টা সেভাবেই দেখতে হবে।”

যে তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাদের নাম বলতে চাননি মাহবুবে আলমও।

তিনি বলেন, “নাম আপনারা সবাই জানেন। কাদেরকে আজ বেঞ্চ দেওয়া হয়নি। কাজেই আমি আর উচ্চারণ করতে চাই না।”

অভিযোগ প্রকাশ করা ছাড়াই বিচারককে তার কাজ থেকে বিরত রাখার নজির বাংলাদেশে আছে কিনা- এমন প্রশ্ন রেখেছিলেন একজন সাংবাদিক।

জবাবে তিনি বলেন, “অভিযোগ আছে কি নাই, সেটা অনুসন্ধানের পরেই বোঝা যাবে।”

কোনো আইনজীবী বা সুপ্রিম কোর্ট বারের পক্ষ থেকে এই তিন বিচারকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কিনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “বারের সাধারণ সদস্যরা সব সময়ই চেয়েছেন বিচার বিভাগ কলুষমুক্ত রাখতে এবং ভাবমূর্তি যেন সাধারণ জনগণের কাছে উজ্জ্বল থাকে।

“আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকতে পারে না। কোনো মন্ত্রী থাকতে পারে না, কোনো বিচারপতিও থাকতে পারেন না। আমরা সাধারণ মানুষও থাকতে পারি না। কাজেই আজকের পদক্ষেপ অবশ্যই একটি ইঙ্গিত যাবে অন্যদের কাছে, যারা নিজেদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করছেন না।”

কীভাবে তদন্ত?

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতির ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা রাষ্ট্রপতির সাথে আলাপ-আলোচনা করেই নিয়েছেন। আইনজীবীরা সবাই চান আমাদের আদালতটা সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে। কারো সম্পর্কে যেন কোনো কথা না ওঠে।”

এখন কীভাবে এই তদন্ত বা অনুসন্ধান হবে- প্রধান বিচারপতিই তা ঠিক করবেন মন্তব্য করে মাহবুবে আলম বলেন, “রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিয়েই তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।… বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার জন্য কী পদক্ষেপ নেবেন, তা উনারাই ঠিক করবেন।”

তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের মিল আছে কিনা- এই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল অ্যাটর্নি জেনারেলের সামনে।

উত্তরে তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতি আমাকে জানিয়েছেন, তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির তাতে সম্মতি আছে। রাষ্ট্রপতির সাথে আলাপ আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম বলেন, “কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিষয় থাকলে, ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের।”

আর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, “যদি অভিযোগ থাকে, তড়িঘড়ি নয়, পূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত এবং পদক্ষেপও নেওয়া যেতে পারে। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের স্পষ্ট করা উচিত।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। তাই বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এখন অস্পষ্টতা রয়েছে। আবার প্রধান বিচারপতি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।”

বিচারকদের আচরণবিধিতে যা আছে

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে ফিরল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত: স্পিকার

ষোড়শ সংশোধনী: রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন সরকারের  

স্বাধীনতার পর প্রথম সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলেও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সময়ে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় ১৯৭৭ সালে সংবিধানে যুক্ত হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিধান।

সেখানে বলা ছিল, প্রধান বিচারপতি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারককে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হবে। বিচারকদের জন্য পালনীয় একটি আচরণবিধি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে এবং কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে তদন্ত করবে।

কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র থেকে রাষ্ট্রপতি যদি জানতে পারেন যে, কোনো বিচারক শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে, তাহলে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্ত করে ফলাফল জানানোর নির্দেশ দিতে পারবেন।

তদন্তে অভিযোগ বা বিচারকের অসমর্থ্যতার প্রমাণ পেলে এবং কাউন্সিল বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানালে তিনি ওই বিচারককে অপসারণের আদেশ দেবেন।

বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিতি পায়।

কিন্তু ২০১৭ সালে তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পাশাপাশি ৯৬ অনুচ্ছেদের ছয়টি ধারা পুনর্বহাল করে।

সেই সঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান কার্যকর করতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য ৩৯ দফার একটি আচরণবিধি ঠিক করে দেয় আপিল বিভাগ। 

সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ একটি রিভিউ আবেদন করেছে, যা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।   

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বলবৎ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যদি থাকত, প্রধান বিচারপতি তার কনিষ্ঠ দুই বিচারপতিকে নিয়ে একটা অনুসন্ধান করার জন্য পদক্ষেপ নিতেন। রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের তদন্ত রিপোর্ট পাঠাতেন। 

“প্রধান বিচারপতি এখনও আছেন, তার কনিষ্ঠ দুইজনও আছেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি শুধুমাত্র দুইজনের সাথে না, আপিল বিভাগের সমস্ত বিচারপতিদের সাথে পরামর্শ করে এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।”