সবচেয়ে বড় শাস্তি আমি পেয়ে গেছি: ওসি মোয়াজ্জেম

  • আদালত প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-14 18:44:10 BdST

bdnews24

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় বিচারের শেষভাগে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনে দাঁড়িয়ে আদালতে কাঁদলেন ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, যাকে এতদিন হাস্যোজ্জ্বলই দেখা যাচ্ছিল।

বৃহস্পতিবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সামনে তিনি বললেন, “এই অভিযোগে যত বড় শাস্তিই দেন না কেন, তার চেয়ে বড় শাস্তি আমি পেয়ে গেছি।”

এ আদালতে মোয়াজ্জেমের বিচার চলেছে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দির ভিডিও করা এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে। রায়ের আগেই কীভাবে শাস্তি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন?

আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি বলেন, “সামাজিকভাবে এই মামলার কারণে হেয় হয়েছি অনেক। আমার ১৫ বছরের ছেলে স্কুলে যেতে পারে না। আমি ১০টা খুন করলেও এত বড় সাজা হত না। ৭০/৭৫ বছর বয়সী আমার মা, আমার মেয়ে এই ঘটনায় খুব মর্মাহত হয়েছেন।”

মোয়াজ্জেম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমি কী অপরাধ করলাম! উনি (বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন) যদি ভিডিওটা পুরোপুরি দেখতেন তবে এই মামলা করতেন না। উনি ভিডিও ঠিকমত দেখেনই নাই।”

সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি গত মার্চ মাসে তার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন। সেসময় সোনাগাজী থানায় তার জবানবন্দি নেন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

তার কয়েক দিন পর মাদ্রাসার ছাদে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের গায়ে আগুন দিলে সারাদেশে আলোচনা শুরু হয়। তখন নুসরাতের ওই জবানবন্দির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হলে গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামি করে ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

পরিদর্শক মোয়াজ্জেমই ওই ভিডিও ছড়িয়েছেন- পিবিআইয়ের এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চার মাস আগে এ মামলার বিচার শুরু হয়, যা আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের মধ্য দিয়ে প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছালো।    

আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে এসে পরিদর্শক মোয়াজ্জেম বলেন, “গত ৬/৭ মাস আমাকে সারা বিশ্বে কলঙ্কিত করা হয়েছে। চাকরি থেকে আমাকে রংপুরে ক্লোজ করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। অথচ আমি এই মামলায় আইওকে (তদন্তকারী কর্মকর্তা) সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়েছি। আমার মোবাইল তার কাছে জমা দিয়েছি।

“কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে এমন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলা পড়েছে যিনি আইন অনুযায়ী তদন্ত করেননি। উনি (আইও) নিজেই তদন্তের প্রয়োজনে ছবি তুলেছেন।”

বিচারক তখন জিজ্ঞাসা করেন, জবানবন্দি নেওয়ার সময় তদন্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমের কোনো ভিডিও করেছেন কি না। উত্তরে মোয়াজ্জেম বলেন, “না।”

“আমার থানায় সিসি ক্যামেরা আছে। আমি তদন্ত কর্মকর্তাকে যে স্ক্রিন শট দিয়েছি, সেখানে তারিখ দেখে তিনি ঘটনার সময় উল্লেখ করেছেন। অ্যাডিশনাল ডিআইজি ফায়েজ স্যার আমার কাছ থেকে ভিডিও নিয়েছে। সেটা আমি তাকে হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি। আমি নিজে ফেইসবুক ব্যবহার করি না। শুধু ঘটনার পরদিন ৯ তারিখ রাতে এসপি সাহেব ফেইসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। দুদিন পরই আমি তা আবার ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিই।”

বিচারক তখন জিজ্ঞাসা করেন, মামলা দায়ের বা তদন্তের জন্য ভিডিও করার কোনো নির্দেশনা আইনে আছে কি না।

জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, “সেরকম কোনো আইন নেই। তবে আপডেটেড টেকনোলজির কারণে আমরা অনেক কিছু ভিডিও করে রাখি। এটা আমাদের প্র্যাকটিস, এক্ষেত্রে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের কিছু নির্দেশনাও আছে।”

তখন বিচারক বলেন, “বাদী, সাক্ষী তো দূরে থাক, গ্রেপ্তারের পর আসামির ভিডিও বা ছবি না তোলার ব্যাপারে হাই কোর্টের নির্দেশনাই তো আছে।”

তখন মোয়াজ্জেম বলেন, “জি, তা আছে। এগুলো ভিডিও করে আমরা কাউকে দিই না। শুধুমাত্র আদালত চাইলে সাক্ষ্য হিসেবে তা উপস্থাপন করা হয়। আমরা এটা ফেইসবুক বা ইউটিউবে পোস্ট করি নাই। কীভাবে সোশাল মিডিয়ায় গেছে তা আমি জানি না।”

আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বিচারককে বলেন, “জ্ঞানতঃ আমি কোনো অপরাধ করি নাই। আমি মুসলমান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি স্যারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।” 

এসব বক্তব্য সবিস্তারে লিখিত আকারেও আদালতে দাখিল করেন পরিদর্শক মোজাম্মেল। তবে তিনি কোনো সাফাই সাক্ষী দেবেন না বলে জানান তার আইনজীবী ফারুক আহাম্মাদ। এরপর আদালত আগামী ২০ নভেম্বর এ মামলার যুক্তিতর্কের তারিখ ধার্য করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা গত ২৭ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

আগাম জামিনের চেষ্টায় গত ১৬ জুন গোপনে হাই কোর্টে গিয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম। কিন্তু শুনানি হওয়ার আগেই পুলিশ শাহবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। ১৭ জুন সাইবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে জমিন নাকচ করে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।

পরে ১৭ জুলাই আদালত আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। ১২ নভেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার জেরার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, নুসরাতের মা, ভাই ও দুই বান্ধবী, দুই পুলিশ সদস্য ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১২ জন এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন।

বৃহস্পতিবার আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের পর যুক্তিতর্ক শেষ হলেই মামলাটি রায়ের পর্যায়ে যাবে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় তার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে গত ২৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড দেয় ফেনীর নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। সেই রায় ডেথ রেফারেন্স হিসেবে শুনানির জন্য ইতোমধ্যে হাই কোর্টে গেছে।