চুড়িহাট্টার আগুন: এগোচ্ছেই না মামলার তদন্ত

  • প্রকাশ বিশ্বাস, আদালত প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-17 16:45:22 BdST

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত যেন এগোচ্ছে না কিছুতেই। অথচ তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য দফায় দফায় তারিখ দিয়ে যাচ্ছে আদালত।

ওই ঘটনায় নিহতদের ময়নাতদন্ত এক বছরেও শেষ করা যায়নি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। তদন্ত কর্মকর্তা অপেক্ষায় আছেন সবগুলো মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের। কবে সেসব পাওয়া যাবে, তাও নিশ্চিত নয়। তাছাড়া মামলার বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দিও নেওয়া হয়নি।

মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য নয়টি তারিখ পার হয়েছে। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখ ঠিক করা রয়েছে প্রতিবেদনের জন্য ।

তদন্তের এই শম্বুকগতিতে হতাশ মামলার বাদী মো. আসিফ জানিয়েছেন, মামলার তদন্তের অগ্রগতির কোনো খবর তার কাছে নেই। তার সঙ্গে তদন্ত কর্তৃপক্ষ যোগাযোগও করছে না।

“আমরা চাই দ্রুত তদন্ত শেষ হোক। আমরা যেন তাড়াতাড়ি বিচার পাই,“ বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ‘ক্যাটসআই’ দোকানের কর্মী আসিফ।

চুড়িহাট্টার আগুনে বাবা মো. জুম্মনকে (৫২) হারিয়েছেন তিনি।

গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টা মোড়ের কাছে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে লাগা আগুন আশপাশের কয়েকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভবন এবং আশপাশের দোকানে থাকা রাসায়নিক আর প্লাস্টিক-পারফিউমের গুদাম আগুনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনাস্থল থেকে ৬৭ জনের পোড়া লাশ মর্গে পাঠান উদ্ধারকর্মীরা। পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে। এদের মধ্যে চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যান তাদের স্বজনরা।

এ ঘটনায় পরের দিন‍ ‘অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিসংযোগের ফলে মৃত্যু ঘটাসহ ক্ষতিসাধনের’ অপরাধে চকবাজারের ওয়াটার ওয়াকর্স রোডের ৩২/৩৩ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মো. আসিফ চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদ তাদের চারতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ রাখতেন। মানুষের জীবনের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম করার জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বাসা ভাড়া দেন তারা।

এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন শহীদ ও হাসানসহ অজ্ঞাত পরিচয় ১০-১২ জন ।

মামলার নথিপত্রে দেখা গেছে, গত বছরের ১৬ এপ্রিল এজাহারভুক্ত আসামি দুই ভাই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। এর আগে রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাদের।

মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদ গত বছরের ৮ অগাস্ট হাই কোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। এরপর গত রোববার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এই জামিনের মেয়াত আরও এক বছরের জন্য বাড়িয়ে দেন বিচারপতি আবদুল হাফিজ এবং মো. ইজারুল হক আকন্দের হাই কোর্ট বেঞ্চ।

মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ মোরাদুল ইসলাম। তিনি বদলী হওয়ার এখন তদন্ত করছেন পরিদর্শক কবীর হোসেন।

তদন্তের হাল জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ৭১ মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত শেষ করতে পারেননি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্ত বিভাগের চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ।

“অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আরও ৫/৬ জনের বিরুদ্ধে । কিন্তু তাদের সঠিক বতর্মান বা স্থায়ী কোনো ঠিকানাই পাওয়া যাচ্ছে না। যে ঠিকানা অনুসন্ধানে পাওয়া গিয়েছিল সেখানে যেয়ে দেখি তারা সেখানে থাকেন না। সেটি তাদের সঠিক ঠিকানাও নয়। আশপাশের কেউ ঠিকানা দিতেও পারছে না।

“তাছাড়া ময়না তদন্ত প্রতিবেদনও তো এখনও রেডি হয়নি। আগে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল, নিয়মিত মামলা হওয়ার পর ওই মামলা শেষ হয়ে গেছে। এখন একটিই মামলা রয়েছে। আমি এখনও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। হয়তো একসঙ্গে আমাকে সরবরাহ করবেন চিকিৎসক।”

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “চেষ্টা করছি তাড়াতাড়ি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার। আদালত আমার কাছে এখনও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাননি, কোনো তাগিদও দেননি।”

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল।

ময়নাতদন্তের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে ৭/৮টি মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শেষ করেছি। বাকীগুলোর করা হচ্ছে।”

কবে শেষ করা যাবে জানতে চাইলে তিনি ‘পরে কথা হবে’ বলে কল কেটে দেন। পরে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।