‘কারখানার নাম বলব না, চাকরি হারাতে চাই না’

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-18 16:46:39 BdST

দেশের অনেক পোশাক কারখানায় নারী কর্মীরা যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হলেও চাকরি হারানোর ভয়ে ঘটনার প্রতিকার চাওয়া থেকে পিছিয়ে যান তারা।

রাজধানীতে মঙ্গলবার একটি সেমিনারে এমন তথ্য উঠে আসার পর নির্যাতিত একজন নারী শ্রমিকের বক্তব্যে বিষয়টির তাৎক্ষণিক প্রমাণ মেলে।

‘কর্মক্ষেত্রে সকল প্রকার সহিংসতা ও যৌন হয়রানী বন্ধে হাই কোর্ট নির্দেশনা-২০০৯ বাস্তবায়ন এবং আইএলও কনভেনশন ১৯০ এর ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবে।

সেমিনারে জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, এখনও বহু কারখানায় নারী শ্রমিকরা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে মুখ খুলে বলতে পারেন না।

“যারা সাহস করে বলেন, যখন অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় তখন তারাই চাকরি যাওয়ার ভয়ে আর সামনে বাড়তে চায় না। এ এক মহাসঙ্কট। এসব বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দরকার।”

এ সময় কারখানায় পুরুষকর্মী দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা তুল ধরেন মিরপুর-১৩ নম্বরের একটি গামেন্টের কর্মী রেহানা বেগম। 

২০০৭ সাল থেকে ওই কারখানায় কাজ করে আসা রেহানা বলেন, “আমাদের চোখের সামনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়, আমি নিজেও আমার কারখানার এক পুরুষ কর্মী দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছি। বিচার চেয়েও পাইনি।”

কারখানার নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কারখানার নাম আমি বলব না, আমার ছেলে-মেয়ে আছে, সংসার আছে, আমি চাকরি হারাতে চাই না।”

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সায়েমা খাতুন যৌন হয়রানি বন্ধে আলাদা আইনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

একটি গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ওই গবেষণায় দেখা যায় ৮০ শতাংশ গার্মেন্ট শ্রমিক কারখানায় যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ২০১৫ সালে অ্যাকশনএইডের আরেকটি গবেষণায় এসেছে, বাংলাদেশের সাতটি শহরে ৮৪ শতাংশ নারী ও শিশু আপত্তিকর মন্তব্য ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালাগাল শোনেন।

যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইন ও কার্যবিধিতে বিচারের সুযোগ থাকলেও এই বিষয়ে একটি আলাদা পূর্ণাঙ্গ আইন থাকা দরকার মন্তব্য করে অধ্যাপক সায়েমা বলেন, “আলাদা আইন থাকলে ভুক্তভোগী নারী তার সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে সাহস পাবে। তখন ন্যায়বিচারের পথ আরও সুগম হবে।”

জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতার বলেন, “সমস্ত ক্ষেত্রে একটা পুরুষতান্ত্রিকতা দেখা যায়। পুরুষতান্ত্রিকতা মানে অগণতান্ত্রিকতা, আমার যা ইচ্ছে তা করা। পুরুষ বলে যা ইচ্ছে করতে পারব, এমন মানসিকতা।

“এই অবস্থা যতক্ষণ পর্যন্ত না ভাঙতে পারা যাবে ততক্ষণ নারীর প্রতি হয়রানি-নির্যাতন চলতে থাকবে। এজন্য সকল পেশা-শ্রেণির নারীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামতে হবে। পাশাপাশি পুরুষদেরকেও সচেতন করতে হবে।”

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জেন্ডার অ্যাডভাইজার বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, “নারী নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধে সবার আগে ব্যক্তি ‘আমার’ পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তনটা হলে এই সংক্রান্ত সমস্যার কার্যকরী সমাধান সম্ভব। এই জন্য সচেতনতা বাড়াতে প্রধান দায়িত্বটা সরকারকে নিতে হবে।”

বিভিন্ন পোশাক কারখানায় যৌন নিপীড়ন নিরোধ সেল গঠন নিয়ে কাজ করা ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশনের লিড ট্রেইনার ও লিগ্যাল কনসালট্যান্ট নাহিদা আনজুম কনা বলেন, “কাজ করতে গিয়ে দেখি অনেক কারখানার মালিক বলে তাদের ওখানে কোনো যৌন হয়রানির ঘটনা নেই। আসলে তারা যৌন হয়রানি বলতে ধর্ষণের মত ঘটনাকে বোঝেন।”

যৌন নিপীড়ন সেল গঠনে ৪০০ কারখানায় কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সাতটি কারখানায় আমরা যৌন নিপীড়ন নিরোধ সেল গঠন করেছি, সামনে আরও হবে। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে, আরও হবে বলে মনে হচ্ছে।”

কর্মজীবী নারী সংগঠনের সভাপতি প্রতিমা পাল মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব দিল আফরোজা বেগমসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।