লাইফটাই শেষ হয়ে গেল: আদালতে পাপিয়া

  • আদালত প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-24 23:31:06 BdST

যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়াকে আদালতে রিমান্ড শুনানিতে দেখা গেল কখনও বিস্মিত, কখনও বিমর্ষ চেহারায়; কখনও তার কণ্ঠে ঝরল ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কার কথা।

সোমবার বিকালে ঢাকার হাকিম আদালতে তিন মামলার রিমান্ড শুনানির মাঝে বিচারক পরিবর্তনের ফাঁকে এক আইনজীবীকে তিনি বললেন, “আমার লাইফটাই শেষ হয়ে গেল!”

র‌্যাবের অভিযোগ, পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী নরসিংদী এলাকায় ‘অস্ত্র ও মাদকের কারবার, চাঁদাবাজি, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণাসহ বিভিন্নভাবে মানুষের অর্থ আত্মসাত করে’ বিপুল সম্পদ গড়েছেন।

জাল নোট এবং অবৈধ অস্ত্র ও বিদেশি মদ রাখার তিন মামলায় তাদের দুজনকে মোট ১৫ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন ঢাকার দুজন মহানগর হাকিম।

এছাড়া শনিবার তাদের সঙ্গে গ্রেপ্তার তাদের দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে এক মামলায় ৫ দিন করে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।

শনিবার ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট,  ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান রুপি ও সাতটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনায় র‌্যাব-১ কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলাম বিমানবন্দর থানায় চারজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

আর ওয়েস্টিন হোটেলে পাপিয়ার নামে ভাড়া করা ‘প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট’ এবং ইন্দিরা রোডে ওই দম্পতির দুটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পিস্তল, গুলি, মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, উদ্ধারের ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা হয় অন্য দুটি মামলা।

তিন মামলাতেই আসামিদের দশ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে সোমবার বিকালে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করা হয়।  আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থিত কনিষ্ঠ একদল আইনজীবী তাদের পক্ষে শুনানি করতে আদালতে দাঁড়ান। 

পাপিয়ার অন্যতম আইনজীবী ইলতুৎমিশ সওদাগর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আসামিপক্ষের অধিকাংশ আইনজীবীই ছিলেন নরসিংদী জেলার। তবে এ আইনজীবী দলের প্রধান আতিকুর রহমানের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলায়।

বেলা ৩টা ২৯ মিনিটে প্রথমে পুরুষ আসামিদের কাঠগড়ায় তোলা হয়। নারী পুলিশ সদস্যরা পাপিয়াসহ দুই নারী আসামিকে কাঠগড়ায় না নিয়ে আইনজীবীদের বেঞ্চে বসানোর চেষ্টা করেন। তবে উপস্থিত আইনজীবীদের চাপে শেষ পর্যন্ত পাপিয়াকেও কাঠগড়ায় তোলা হয়।

কালো স্কার্ফ ও লেস দেওয়া লিলেনের সালোয়ার কামিজ পরিহিত পাপিয়া কাঠগড়ায় উঠে শুরুতে মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছু সময় পর তাকে মুখ তুলে বিমর্ষ চেহারায় দুই পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনতে দেখা যায়। মাঝে কয়েকবার স্বামীর সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। সুমন এবং তাদের দুই সহযোগী  এসময় ছিলেন শান্ত ও নির্বিকার।

জাল নোটের মামলায় রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করে আতিকুর রহমান বলেন, “তাদের গ্রেপ্তার করার পর ৪৮ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এই ঘটনা আসলে নাটকের মহড়ামাত্র।”

আসামিপক্ষের অন্য একজন আইনজীবী বলেন, “পাপিয়ার স্বামী মফিজুর ওরফে সুমন চৌধুরী ছাত্রলীগের নেতা, এলাকায় নির্বাচন করতে চাওয়ায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এই নাটক সাজিয়েছে।”

পাপিয়ার আরেকজন আইনজীবী বলেন, “মিডিয়া অলরেডি বিচার করে ফেলেছে। আর কী বিচার করবেন?”

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাপস কুমার পাল এর উত্তরে বলেন, “তাহলে মিডিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করুন।”

মহানগর হাকিম মাসুদ-উর-রহমান তখন দুই পক্ষকে থামিয়ে দিয়ে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি করতে বলেন।

এর আগে রিমান্ড আবেদনে আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই মাহমুদুর রহমান বলেন, “প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আসামিদের ঘটনাগুলো প্রচার হয়েছে। তারা নারীদের বিভিন্ন অনৈতিক কাজে ব্যবহার করত। তাদের কাছ থেকে মদ, অস্ত্র ও বিভিন্ন পরিমাণ জাল টাকা পাওয়া গেছে।”

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরন বলেন, “চাকরি দেওয়ার নাম করে তারা বিভিন্ন লোককে ব্ল্যাকমেইল করত, নারীদের বিনোদনের কাজে লাগাত। বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের জন্য বিলাসবহুল হোটেলে নিয়ে যেত আমন্ত্রণ করে। পরে সেসব নারীর সঙ্গে তাদের ছবি ও ভিডিও রেখে ব্ল্যাকমেইল, হয়রানি করত, অর্থ আদায় করত।”

হিরনের এ বক্তব্যের পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা হইচই করে প্রতিবাদ করতে থাকেন। 

শুনানি শেষে বিচারক মাসুদ-উর-রহমান চার আসামির সবাইকে জাল নোটের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

এ মামলার শুনানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামিদের আইনজীবীরা জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ড নিয়ে আপিল বিভাগের নির্দেশনার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। পাপিয়াকে এ সময় স্বামীর কাছ থেকে সেই ব্যাখ্যা শুনতে দেখা যায়।

একজন আইনজীবী কাঠগড়ার সামনে এসে পাপিয়া এবং তার স্বামীকে বলেন, “আপনারা যদি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, তাহলে পুলিশের শেখানো কোনো কিছু বলবেন না। ”

এ সময় পাপিয়াকে হতাশা প্রকাশে করে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কী অপরাধ করলাম!”

অন্য দুই মামলায় শুনানির জন্য নতুন হাকিম এজলাসে এসে আসন নিলে কিছুটা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকাতে দেখা যায় পাপিয়াকে।

পরে অস্ত্র ও বিদেশি মদ রাখার অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানার দুই মামলায় পাপিয়া ও তার স্বামীকে দশ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান।

এ সময় বিচারক পাপিয়াসহ অন্য আসামিদের কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তারা নিজে থেকে কোনো কথা বলেননি।