করোনাভাইরাস: মানসিক চাপ দূরে রাখতে দরকার সচেতনতা

  • কাজী নাফিয়া রহমান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-31 20:12:49 BdST

নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তারের কারণে মানুষের জীবন এখন চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছন্দপতন ঘটেছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। নানা আতঙ্ক, অস্বস্তিতে মানসিক চাপে ভোগা এখন খুবই স্বাভাবিক। 

মনোবিদরা বলছেন, সঙ্কটের এ সময়ে সচেতন থাকলেই কেবল মানসিক চাপ উতরানো সম্ভব। আর এজন্য অনুসরণ করতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়া।

করোনাভাইরাসে বিস্তার শুরুর পর গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরই মূলত মানুষজন নিজেদেরকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন ঘরের মধ্যে। এরই মধ্যে ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার ঘোষণা এসেছে। ছুটি শেষ হলেই যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে এখন সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট গোলাম রব্বানী।

রোগটি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে মানসিক শক্তি বাড়ানো এবং যেকোনো বিপদে উদ্বিগ্ন না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কিছু উপায়ও বাতলে দিয়েছেন এই অধ্যাপক।

“নলেজ ইজ পাওয়ার। রোগটা সম্পর্কে আমরা পড়াশুনা করি বা জানি। হাঁচি-কাশির সময় মুখে টিস্যু বা রুমাল দেই। খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে গরম গরম খেতে হবে। দূরত্ব মেইনটেইন করে চলতে হবে। নিজেরা যা জানি, তা ফেইসবুক-টুইটারের মাধ্যমে মানুষকে জানাই। যারা মানসিকভাবে দুর্বল, যারা বিষয়টি সম্পর্কে ততটা জানে না, তাদের আমরা জানাতে পারি।”

মহামারীর দিনে ঘরবন্দি জীবন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

মহামারীর দিনে ঘরবন্দি জীবন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

ষাটোর্ধ্ব এবং যাদের কোমরবিডিটি (দীর্ঘমেয়াদী অন্য রোগ) যেমন, অ্যাজমা, ব্রোঙ্কাইটিস রয়েছে এবং নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম, যারা প্রতিবন্ধী, শারীরিক-মানসিকভাবে দুর্বল, তাদের কোভিড-১৯ এ ঝুঁকি বেশি।

এমন ব্যক্তিরা যেন ভয় না পান, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যারা অবুঝ, মানসিক প্রতিবন্ধী, তাদের আমরা বুঝিয়ে সচেতন করতে পারি। তার ভেতরে সাহস বাড়াতে পারি। কাউন্সিলিং করতে পারি। যার মনের জোর বেশি, যার বলার ক্ষমতা ভালো, সে অপরকে বুঝিয়ে সাহস দিতে পারি।

“ভয় পেয়ে কোনো লাভ নেই, বরং ক্ষতি। ভয় না পেয়ে ঠান্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে জেনে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যদি মরার আগে ভয় পেয়ে মরে যাই, তাহলে তো হবে না। চিন্তা, বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে আতঙ্কটা কমিয়ে আনতে হবে। রোগটা সম্পর্কে জানি ও অপরকে জানাই। ভুল তথ্য প্রচার না করে সঠিক তথ্য দেই। মানসিক-শারীরিক সুস্থতা ঠিক রাখি।”

তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

“স্ট্রেস থেকে রিলিজ পেতে হবে। যার যার ধর্মে বিশ্বাস রেখে নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম মনে করেন, করোনাভাইরাস সবার মনোজগতে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে।নিজেদের নিরাপদ রাখতে কিছু পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “মূলত এই আতঙ্কটাই বাড়ে এ সময়টাতে। এক্ষেত্রে সতর্কতাটাই মূল বিষয়। এখন সাধারণ সর্দি-কাশি হলেও ভয় লাগছে আমাদের, কেননা আমরা জানতে পারছি না করোনার বাহক কে? সেজন্য সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। জনসমাগম পরিহার করতে হবে। হাসপাতাল, মসজিদ, বাজার, যেখানে বেশি লোক একসাথে থাকে, সেখানে যাব না।

“মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে। বাসায় যারা আছেন তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে। ঘন ঘন হাত ধোয়া, যাই ধরি না কেন, হাত ধোয়া।”

সচেতনতাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় বলে জানান এই অধ্যাপক।

এ সময়ে মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ার বিষয় জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানমও।

বাইরে বেরুনো মানা, মহাখালীর এক ভবনের ছাদে উঠেছে ফুটবল। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

বাইরে বেরুনো মানা, মহাখালীর এক ভবনের ছাদে উঠেছে ফুটবল। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হল, যে আশঙ্কাটার মধ্যে আমরা আছি, আমরা কিন্তু জানি না যে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে? যেহেতু বাইরে থেকে যে খবরগুলো আসছে, সবগুলোই ভীতিকর, কাজেই ভীতিটা আমাদের মধ্যে কাজ করছে। কিন্তু আবার আমরা নিজেদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছি যে, আমাদের হবে না।

“আশঙ্কাটা কাজ করছে সবার ভেতর। আপনি যাই করেন না কেন, এই শঙ্কাটা থেকে যাবেই- যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে চেষ্টা করতে হবে এই দুশ্চিন্তা বা আতঙ্কের কারণে আপনি যেন ‘প্যানিকড’ অবস্থায় চলে না যান।”

সেজন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, "এজন্য আপনার নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করতে হবে, যে আমরা সাবধানতা অবলম্বন করছি, আশা করি আমাদের কিছু হবে না।

“এ সময়টায় মাইন্ডটাকে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ যে কাজটা করতে ভালো লাগে, সেই কাজগুলোতে নিজেদের নিমগ্ন রাখতে হবে, যাতে এ সংশ্লিষ্ট নেগেটিভ চিন্তা মাথায় না আসে। চিন্তা আসলেও পজিটিভ থিংকিং রাখতেই হবে। পছন্দের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে।”

এই সময়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের বাইরের কোন সংবাদে মনোযোগ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই মনোবিজ্ঞানী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগ ও বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি সোসাইটি ‘করোনা পরিস্থিতিতে মানসিক সুস্থতা’ শীর্ষক সচেতনতামূলক প্রচারপত্র তৈরি করেছে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব এখন ছুটিতে। সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হলেও বাসার গলিতে ক্রিকেটে মেতেছে শিশুরা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব এখন ছুটিতে। সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হলেও বাসার গলিতে ক্রিকেটে মেতেছে শিশুরা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

প্রচারপত্রটিতে বলা হয়েছে, মানুষ এখন নানা উদ্বেগ, অতিমাত্রায় হতাশা ও অস্থিরতায় ভুগছে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

এসব পরিহার করে সবাইকে যথাযথ নিয়ম মানার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রচারপত্রটিতে বলা হয়েছে, মানসিকভাবে ভালো থাকতে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খবর নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মহামারীর বেশি খবর রাখাটাও ভয় এবং উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

এ সময়ে বই-ম্যাগাজিন পড়া, গান শোনা অথবা নতুন কোনো ভাষা শেখার মত সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত রাখা যেতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনের রুটিন তৈরি করা, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনাভ্যাস মেনে চলা, ব্যায়াম করা, সুষম খাবার খাওয়া এবং পরিমিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে কোভিড-১৯ রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো এবং আপৎকালীন সময়ে মানসিকভাবে ভালো থাকা সম্ভব।