আম্পান: উপকূলে উঁকি দিচ্ছে একানব্বইয়ের স্মৃতি

  • হাতিয়া থেকে ফয়সাল আতিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-20 14:12:26 BdST

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পান নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলার হাতিয়ার উপকূলের দিকে ধেয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন; প্রকৃতির বৈরী আচরণ দ্বীপের মানুষের মনে জাগাচ্ছে অজানা বিপদের শঙ্কা।

উপকূলবর্তী হাতিয়া, মনপুরা ও ভোলা অঞ্চলে সর্বশেষ বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে এসেছিল ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়। গত ৩০ বছরে সিডর, আইলা, নার্গিস ও মহাসেনের মতো অনেকগুলো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেলেও একান্নব্বুইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানিই সর্বোচ্চ বলে মনে করা হয়।

উপকূলীয় অঞ্চলের ভোলার মনপুরা দ্বীপের রয়েছে এক লাখ মানুষের বসবাস। আর নিঝুমদ্বীপ ও হাতিয়া দ্বীপে রয়েছে আরও সাত লাখ মানুষের বসতি। এই তিনটি দ্বীপ একাধিক বেড়িবাঁধ দিয়ে ঘেরা থাকলেও বসতির বিস্তার দিনে দিনে বেড়িবাঁধকেও ছাড়িয়ে গেছে।

কেবল হাতিয়া দ্বীপেই এক লাখেরও বেশি মানুষ বেড়িবাঁধের বাইরে সমুদ্রের তীরে স্থায়ী বসতি নির্মাণ করেছেন বলে প্রশাসনের হিসাব। ঘূর্ণিঝড় আম্পান বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালালে কিংবা পূর্বাভাস মতো জলোচ্ছ্বাস আসলে বাঁধের বাইরে থাকা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার হাতিয়ার কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, মানুষের মধ্যে শঙ্কা থাকলে ঝড় মোকাবিলায় তেমন প্রস্তুতি দেখা যায়নি। প্রশাসনের পক্ষে থেকে মাইকিং কিংবা সতর্ক বার্তাও চোখে পড়েনি। কেবল বাজার ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে টানানো হয়েছে ছয় নম্বর বিপদ সংকেতের লাল পতাকা।

বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ আম্পান বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভারতের দীঘা উপকূল থেকে বাংলাদেশের হাতিয়া উপকূলবর্তী বিশাল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের বিস্তৃতি থাকতে পারে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবর।

মঙ্গলবার বিকালে হাতিয়ার দক্ষিণ উপকূলে বুড়িরদোনা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছে; ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতির বিশেষ কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি নৌকার মাঝি কিংবা দোকানিদের মাঝে।

সাগরে মাছধরা ট্রলারগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই বাজারের পাশেই ঘাট করে করে আাছে প্রায় দেড়শ ট্রলার। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস কিংবা ঢেউ মোকাবেলায় ট্রলারগুলোতে দেখা যায়নি বাড়তি কোনো পদক্ষেপ।

স্থানীয় মাঝি সাহাবুদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা মূল্যের এই ট্রলারগুলোকে চতুর্দিক থেকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখাই একমাত্র পদক্ষেপ। স্থানীয়দের ভাষায় একে বলে সিট করা। ১০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আসলে এই পদক্ষেপও যথেষ্ট নয়।”

এই স্টেশন থেকে গত ২২ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরার পেশায় যুক্ত আছেন সাহাবুদ্দিন মাঝি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ট্রলারের সিট করতে গিয়ে নিজের বাবা ও ভাইসহ তিনিও ঢেউয়ের ঝাপটায় ভেসে গিয়েছিলেন।

সাহাবুদ্দিন বলেন, “একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ের সময় একবার ভেসে গিয়েছিলাম। এরপরে জীবনে আর বড় ধরনের কোনো বিপদ আসেনি। এখন ঘূর্ণিঝড়ের যে তীব্রতার কথা বলা হচ্ছে, তাতে একানব্বইয়ের মতো কিছু একটা হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীদের ভাষ্য, প্রায় তিন দশক আগের ওই  ঘূর্ণিঝড়ে হাতিয়ার বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থানকারী হাজার হাজার মানুষের সলিল সমাধি ঘটেছিল।

জিয়া আলী মোবারক নামের একজন ইউপি সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ১৯৭০ সালের পর ১৯৯১ সালেই এ অঞ্চলে বড় ধরণের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল। সেই সময় হাতিয়ার নদী তীরবর্তী এলাকায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

সাহাবউদ্দিন মাঝি বলেন, “এবার ঝড়-তুফান বেশি হলে আশ্রয়কেন্দ্র যেতে হবে, আমরাও যাব। কিন্তু আমাদের কাছাকাছি যে আশ্রয়কেন্দ্রটি আছে তা বেড়িবাঁধের চেয়েও নিচু। তাই আশ্রয় কেন্দ্রের চেয়ে বেড়িবাঁধই আমাদের জন্য নিরাপদ জায়গা।”

এবারের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ ফুট থেকে ১০ ফুট এমনকি ১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আসার পূর্বাভাস দিয়েছে আহ্বাওয়া অধিদপ্তর। কেবল ১০ ফুট উঁচু ঢেউ আসলেও বেড়িবাঁধের অনেক নিচু স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারবে বলে জানান জেলেরা।

“বেড়িবাঁধের অনেক স্থানে মাটি সরে গিয়ে নিচু হয়ে গেছে। সেখানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৫ ফুট বেশি পানি আসলেই আর রক্ষা নেই,” বলেন নজরুল নামের এক জেলে।

ওই বেড়িবাঁধের টানবাজার নামের একটি এলাকায় রিকশা-সাইকেলের মেকানিক হিসাবে প্রায় ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন জওহরলাল। ৯১ সালের ঘূর্ণঝড়ে তিনিও হারিয়েছিলেন ঘরবাড়ি।

এবারের ঘূর্ণঝড়ের প্রস্তুতি কী? জানতে চাইলে এই মেকানিক বলেন,“তখন আমাদের ঘর ছিল বেড়িবাঁধের বাইরে। সেই ঘর ভেসে যাওয়ার পর বাঁধের ভেতরে এসে ঘর করেছি। টিনের তৈরি কাঁচাঘর। বড় ঝড় হলে এই ঘরও ধরে রাখা যাবে না।”

ঝড়ের সতর্কতায় মাইকিং কিংবা অন্য কোনো তৎপরতা না দেখা গেলেও একটি বাজারে এসে লালপতাকা টানাতে দেখা যায় রেডিও সাগরদ্বীপ ও সিপিপির কর্মী সুফিয়া বেগম পারুলকে।

চল্লিশোর্ধ এই নারী বলেন, দায়িত্বের অংশ হিসাবে তিনি পতাকাটি টানিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে বলছেন।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, দ্বীপের ৭ লাখ বাসিন্দার মধ্যে এক লাখ মানুষকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হচ্ছে।

৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ থাকেন বেড়িবাঁধগুলোর দুই পাড়ে। ঘূর্ণিঝড়ে তাদেরকেই সবার আগে উদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলায় ১৮৫টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণ ক্ষমতা ৮০ হাজার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় মাস্ক, সাবান, ব্লিচিং পাউডার ও স্পে মেশিন সর্বরাহ করে দিয়েছি। আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শুকনো খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ”

মঙ্গলবার সারাদিন মাইকিং করেছি। রাতেও মাইকিং চলবে।“

আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজে যুক্ত থাকবে সিপিপির আড়াই হাজার সেচ্ছাসেবক। এর মধ্যে ৮৮৫ জন নারী। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যানরা আশ্রয়কেন্দ্র দেখভাল করবেন। আর খাবার বণ্টনের দায়িত্বে থাকবে সরাসরি উপজেলা প্রশাসন।

পাশের দ্বীপ উপজেলা মনপুরার নির্বাহী কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, “মনপুরার প্রায় এক লাখ বাসিন্দার জন্য ৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। গত রাতেই এসব আশ্রয়কেন্দ্রে কিছু কিছু লোক এসেছে। আমরা তাদেরকে রাতের খাবার দিয়েছি।”

মনপুরার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দ্বীপটি বেড়িবাঁধবেষ্টিত থাকলেও কিছু কিছু স্থানে ভাঙনও রয়েছে। ফলে ১০ ফুট উঁচু জোয়ার এলে দ্বীপটি প্লাবিত হতে পারে।

বুধবার দুপুরের পর থেকে হাতিয়া, নিঝুমদ্বীপ ও মনপুরা উপকূলীয় এলাকায় দমকা বাতাস ও ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার দিনভর রোদ থাকলেও সন্ধ্যার পর ভারী বৃষ্টি নেমে আসে হাতিয়া উপকূলে।

একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে স্মরণীয় হয়ে আছে এর ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাসের কারণে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ভোলা, মনপুরা, নিঝুমদ্বীপ, হাতিয়া, স্বন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের দ্বীপগুলোতে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

আহ্বাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২৫ কিলোমিটার গতিবেগের বাতাস নিয়ে আসা ওই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে কিছু কিছু স্থানে ১২ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসও হয়েছিল।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ১৯৭০ সালের পর বড় ধরনের শক্তি নিয়ে আঘাত হানে ১৯৯১ সালের এই ঘূর্ণিঝড়।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে হাতিয়ার পূর্বপাশে সাইবানীর চর, পশ্চিম পাশে মৌলভীর চর, দক্ষিণে বালুয়ার চরের (নিঝুমদ্বীপ) প্রায় সব বাসিন্দাই জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিলেন। সেই সময় বেড়িবাঁধ ছিল না এসব এলাকায়। বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর ঘূর্ণিঝড় সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালিয়েছে ১৯৯১ সালে।

হাতিয়ার সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়ন বুড়ির চরের ইউপি চেয়ারম্যান জিয়া আলী মোবারক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন হাতিয়ার চতুর্দিকে একাধিক বেড়িবাঁধ থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হচ্ছে না। ফলে কিছু কিছু এলাকায় বেড়ি বাধ ভেঙে গিয়েছে। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হলে এসব ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্লাবিত হতে পারে।