অনলাইনে দেশি-বিদেশি ছয় শিল্পীর গান-আড্ডা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-24 02:27:28 BdST

bdnews24

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে চলমান লকডাউনে ঘরবন্দি ছয়জন শিল্পী এক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে মুখর আড্ডায় তুলে ধরলেন নিজেদের সংগীত ভাবনা, গাইলেন গান, শোনালেন মুক্ত জীবনের অপেক্ষার কথা।

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) প্ল্যাটফর্ম ইয়াং বাংলা আয়োজিত ‘লেটস টক অন সংস ইন দ্য টাইম অব করোনা’ শিরোনামে এই অনলাইন আড্ডায় শনিবার রাতে শামিল হয়েছিলেন নেমেসিস ব্যান্ডের ভোকাল জোহা চৌধুরী, ক্ষ, লক্ষ্মী টেরার ভোকাল ও লন্ডনভিত্তিক শিল্প দল কমলা কালেক্টিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা সোহিনী আলম, সংগীত পরিচালক-প্রযোজক লাবিক কামাল গৌরব, সংগীতশিল্পী কারিশমা শানু সভ্যতা, জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডজয়ী দুই শিল্পী মোহন রবিদাস ও উম্মে সালমা জয়া।

আড্ডা সঞ্চালনা করেন মেঘদল ব্যান্ডের ভোকাল শিবু কুমার শীল।

ভোকাল জোহা চৌধুরী বলেন, “করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারা পৃথিবী এখন থমকে আছে। পৃথিবীজোড়া আমরা সবাই একটাই যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছি। তবুও গান থেমে নেই আমাদের। রক ব্যান্ড নেমেসিস নতুন গান বাঁধছে। পুরাতন গানগুলোর একুইস্টিক ভার্সন নিয়েও কাজ করছি। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আমাদের মনটাকেও যে ভালো রাখতে হবে। গানের মাধ্যমেই এভাবে নিজেদের ব্যস্ত রাখছি।”

সোহিনী আলম বলেন, “আমাদের সারা বছরে যত শো ছিল, সব বাতিল হয়ে গেছে। এখানে লন্ডনে মিউজিক স্টুডেন্টদের জন্য ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা সরকারের। এখনও ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে তাতেও আমার গান থেমে থাকছে না। নিজের মতো করে সুর করছি, গান করছি।”

সভ্যতা বলেন, “আমি নিজে বাচ্চাদের গান শেখাই। তাই নিজের মানসিক আর আর্থিক দুটো দিকই বেশ ভালো যাচ্ছে। জানি না কত দিন বাচ্চারা গান শিখতে পারবে। জানি না কত দিন মানুষ আগ্রহ নিয়ে গান শুনবে। তবুও গান লিখছি, সুর করছি।”

লাবিক কামাল গৌরবের ব্যস্ততা বেড়েছে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে তার মতোই ঘরবন্দি মানুষকে আশাবাদী করে তুলতে তিনি গান রচনা, সুর ও সংগীতায়োজনের কাজে এখন ভীষণ ব্যস্ত বলে জানালেন।

যখন একদমই গানের ব্যস্ততা থাকে না, তখন পাঁচ বছরের মেয়ে আনন্দীকে নিয়ে কাটে তার সময়। রান্নাঘরে বাবা-মেয়ের খুনসুঁটি চলে অথবা বাবার গিটার নিয়ে বসে পড়ে মেয়ে। প্রতিদিন এক ঘণ্টা তাই মেয়ের গানের আসরে দিব্যি কেটে যায় গৌরবের।

চা বাগানের বাসিন্দা মোহন রবিদাস জানান, নিজের গান চর্চার পাশাপাশি জাগরণ যুব ফোরামের নেতৃত্বে তারা চা বাগানে বসবাসরত অসহায় চা শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের কাজ করছেন।

তিনি বলেন, “এ মুহূর্তে আমাদের লকডাউনে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু তরুণদের  অনেক বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে সমাজের প্রতি।”

আড্ডায় লাবিক কামাল গৌরব বলেন, একজন সংগীত শিল্পীর ঘরানা বলে কোনো ব্যাপার থাকা উচিৎ না।

তিনি বলেন, “আমরা যখন গান প্রকাশ করি তখন নানা রকম আনুষ্ঠানিকতা করি, লেভেল করি। পপ-রকের নানা ফিউশন করতে চেষ্টা করি। কিন্তু সমসাময়িক গানের কথা যদি আমরা বলি তাহলে কিন্তু জনরা (ঘরানা) কিন্তু উঠে যাচ্ছে। ব্যাপারটাকে আমি পজিটিভলি দেখি। পার্টিকুলার কোনো ঘরানা থাকা উচিৎ না শিল্পীদের।”

সংগীত, চলচ্চিত্র বা গান- বিনোদনের তিন মাধ্যমের অনেকাংশই এখন অনলাইন নির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে। অনলাইনে নানা প্ল্যাটফর্মে তারকারা হাজির হচ্ছেন নতুন ধারায়, নতুন বিষয়ে।

সংগীতশিল্পী সভ্যতাও তাই তার অ্যালবাম প্রকাশের ক্ষেত্রে জোর দেন অনলাইনেই।

“আমার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে আমি গানগুলো প্রকাশ করতে থাকলাম। নিজের গান বা অন্য যে কোনো গান যা কাভার করেছি। দেখলাম শ্রোতারা তা লুফে নিচ্ছে। একটা অ্যালবাম প্রকাশ করতে গেলে মিউজিক কোম্পানির সঙ্গে দেনাদরবার। আমি আমার গানের রয়্যালিটি, কপিরাইট কেন অন্যকে দেব? আমার গান আমার কাছে আমার বাচ্চার মতো। আমি আমার গানগুলো তাই অনলাইনে প্রকাশ করব।”

পরে তিনি তার লেখা ও সুর করা ‘ঈশ্বর’ গানটা শোনান শ্রোতাদের।

লন্ডনে সংগীত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা করে আসা লাবিক কামাল গৌরব তুলে আনেন সংগীত শিল্পীদের রয়্যালিটি প্রাপ্তির ইস্যুটি।

তিনি মনে করেন, সংগীত শিল্পীদের রয়্যালিটি আদায় নিশ্চিতে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে হবে।

“লন্ডনে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম পিআরএস আর এনসিপি নামে দুটো প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সংগীতের মেকানিকাল ও ইন্টেলেকচুয়াল পার্টটা দেখে। কিন্তু এখানে কোনো বডি নাই, যারা দেখবে কোথায় কী হচ্ছে। বিদেশে যে কোনো জায়গায় কোনো গান বাজলে তার তালিকা আগে থেকে সরকারকে দিতে হয়। শিল্পী তার রয়্যালিটি পেয়ে যায়। কিন্তু এখানে যে কোনো জায়গায় শিল্পীর গান বাজছে, কিন্তু দেখার কেউ নাই। একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকা উচিৎ, যারা এ বিষয়গুলো মনিটর করবে।”

লন্ডনের বাসিন্দা সোহিনীর বেড়ে উঠা বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। বিদেশে থেকে বাংলা গান করাটা যে চ্যালেঞ্জের, সেটা তিনি জানান  এ আড্ডায়।

“বাংলাদেশে থেকে বাংলা গান করাটা বেশ সহজ। এখানে আমি ইংরেজি গান করলে আমার শ্রোতার কলেবর আরও বাড়ত। বিশ্ব সংগীতে বাংলা গান হয়ত ধীরে ধীরে তার জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক শিল্পী চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, নাইজেরিয়ান মিউজিক যেভাবে জায়গা দখল করে নিচ্ছে, সেখানে এ বিদেশে বসে বাংলা গান করাটা বেশ কঠিন।”

অনলাইনে যতই আয়োজন হোক না, শ্রোতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে না পারলে সংগীত শিল্পী কখনও তৃপ্ত হন না বলে জানান জোহা।

নেমেসিস ব্যান্ডের এই ভোকালিস্ট বলেন, “স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে এক রকম সম্পৃক্ততা হবে, আর সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাইলে আরেক রকম। অপেক্ষায় আছি কবে কোভিড চলে যাবে, আবার মঞ্চে উঠে পারফর্ম করতে পারব।”

প্রায় দুই ঘণ্টার আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলে তাদের সংগীত পরিবেশনা।