পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে কেমন আছেন বস্তির বাসিন্দারা?

  • ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-28 12:08:20 BdST

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ঢাকার ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা যখন ঘরবন্দি, সেই সময় অবলীলায় তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা; এখন শিক্ষিতজনরা ঘরের বাইরে মুখে মাস্ক ও দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করলেও তার কিছুই মানছেন না বস্তির বাসিন্দারা।

ছোঁয়াচে রোগের কাছে পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকলেও সেভাবে আক্রান্ত বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বস্তিগুলোতে, যেখানে ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাটা সম্ভব না।

এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুরের ভাসানটেক এবং মহাখালীর কড়াইল বস্তি ঘুরে  দেখা যায়, এখানকার বাসিন্দারা করোনাভাইরাসকে পাত্তাই দিতে চান না। তাদের দাবি, বস্তির কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি বা মারা যাননি। কেউ কেউ বলছেন, “করোনাভাইরাস বস্তিতে আসে না।”

ভাসানটেক বস্তিতে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে থাকেন জেসমিন আক্তার। বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। 

জেসমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বস্তিতে তার পরিচিত কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি।

“বস্তিতে যদি করুনা (করোনা) ভাইরাস আইতো তাইলে লাশের পর লাশ পড়ত। দেখেন না একজনের গায়ে আরেকজন লাইগ্গা আছে। কারও মুখে মাস্ক নাই। যদি আল্লাহ হেফাজত না করত তাইলে কী অবস্থা হইত চিন্তা করেন। হেই আগের মতোনই আছে, করুনা কি আমরা তা বুঝিই না।”

এই বস্তির আরেক বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মতে, বস্তির মানুষ ‘দুর্নীতি করে না’ বলে এখানে ‘করোনাভাইরাস আসে না’।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের বস্তির মধ্যে করোনাভাইরাস নাই। হইলে আমরা জানতাম। বস্তির মানুষ হইলো গরিব মানুষ। বস্তির মানুষ দুর্নীতি করে নাই। এই কারণে আল্লাহই হেফাজত করছে। আমাগো বস্তির রাস্তার ওই পাশেই এক কমিশনারের ভাই করোনা আক্রান্ত হইয়া মারা গেছে। কিন্তু বস্তির কেউ অহন পর্যন্ত মরে নাই।”

কড়াইল বস্তির বাসিন্দা সবজি বিক্রেতা আবদুল আলী বলেন, বস্তিগুলো খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। তারপরও এখানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কম।

“এইখানে ঘরের লগে ঘর। চিপাগলি দিয়া শয়ে শয়ে লোক যাতায়াত করে। একজনের লগে আরেকজন লাইগা যায়। কিন্তু করোনা বস্তির ভিতরে কারো হয় নাই। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া আল্লায় ভালো রাখছে।”

কড়াইল বস্তিতে থাকেন রিকশাচালক তৈয়ব আলী। তিনি বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মাসখানেক আগে তার জ্বর হয়েছিল, কিন্তু তিনি কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাননি।

তৈয়ব আলীর মতে, জ্বর একটি স্বাভাবিক অসুখ।

“জ্বর তো আহেই, অষুধ খাইলে ভালা হইয়া যাই। জ্বর হইলেই করুনা অয় এমুন না। গরিবরে আল্লায় রক্ষা করতাছে।”

বস্তিবাসীদের কণ্ঠে এভাবে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর অন্য এলাকার তুলনায় কম হলেও বস্তিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে কোভিড-১৯ কতটা বিস্তার লাভ করেছে তা জানতে ১৮ এপ্রিল থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত খানা জরিপ পরিচালনা করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। জরিপ হয় রাজধানীর ছয়টি বস্তিতেও।

গত ১৬ অগাস্ট জরিপের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে আইইডিসিআর। এতে দেখা যায়, ঢাকার সামগ্রিক জনসংখ্যার ৯ শতাংশের মধ্যে কোভিড-১৯ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর বস্তিবাসীদের ৬ শতাংশের শরীরে করোনাভাইরাস রয়েছে।

বস্তিবাসীদের সংক্রমণের হার কম হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে ডটকমকে বলেন, “বস্তিবাসীদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ কম হওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা দরকার।”

ভারতের মুম্বাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বস্তিতে পরীক্ষা করে উচ্চমাত্রায় সংক্রমণ পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের এখানে সে ধরনের কাজ হয়নি। এখানে যদি আমরা এইভাবে কাজ করতাম তাহলে বস্তির প্রকৃত চিত্রটা পাওয়া যেত। বস্তিবাসীর মধ্যে সংক্রমণ কম কেন জানতে আমাদের আরও বিস্তারিত গবেষণা দরকার।”

বস্তিবাসীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি কি না-এ প্রশ্নে ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন,  “এটা এক ধরনের ধারণা। বস্তিবাসীদের কিছু কিছু রোগের সংক্রমণ কম হতে পারে। আবার বস্তিবাসীরা পুষ্টিকর খাবার কম গ্রহণ করায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হতে পারে। এজন্য এ সিদ্ধান্তে আসা খুব কঠিন।”

বস্তি এলাকায় করোনাভাইরাসের প্রকোপ কম- এটাকে একটি ধারণা হিসেবে দেখছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসাইনও।

আইইডিসিআরের জরিপে বস্তিবাসীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কম পাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই গবেষক বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর কাজ হারিয়ে বস্তিবাসীদের একটা বড় অংশ গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। এছাড়া আক্রান্ত হলেও বেশিরভাগ পরীক্ষা করায়নি।

“যারা ঢাকায় ছিল তারা কর্মক্ষম। তারা সংক্রমিত হলেও লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। সংক্রমণ ধরা পড়বে তখনই যখন তারা পরীক্ষা করবে। জরিপে ৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাটি কম না।”

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের সদ্য সাবেক পরিচালক (বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার মতে, জরিপে বস্তিবাসীদের মধ্যে সংক্রমণ কম পাওয়া ‘খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না’।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোনো কারণে হয়ত বস্তিতে সংক্রমণ কম হয়েছে। কিন্তু বস্তির মানুষ সুরক্ষিত, তাদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ হবে না- এটা মনে করার কারণ নেই।

“কারণ কোভিড-১৯ থেকে কেউ কিন্তু সুরক্ষিত না। যার শরীরে ভাইরাস ঢুকবে তার এই রোগটি হবেই। আমাদের অনেকের ধারণা বস্তিবাসীদের আলাদা কোনো ইমিউনিটি আছে কি না। আমি মনে করি, না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না পাব যে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে ততক্ষণ পর্যন্ত এটি ভাবা ঠিক হবে না।”

অন্য জায়গার চেয়ে বস্তিতে স্বাস্থ্যবিধি বেশি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “বস্তিতে যেহেতু জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি সে কারণে সেখানে আরও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা করতে হবে।”

সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, “বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে সংক্রমণ কম কেন তার কারণ জানতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পুরো তথ্য পেতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে।”