হাজী সেলিম থেকে ‘তিব্বত হল’ উদ্ধারে ‘আশা নেই’

  • সাবিকুন্নাহার লিপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-11-01 01:33:01 BdST

সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের দখল থেকে তিব্বত হল উদ্ধারে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেয়ে আছে সরকারের পানে।

আর সরকার গঠিত এই সংক্রান্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদও হলটি উদ্ধারের আশা দেখছেন না।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কয়েক দফা আন্দোলন করলেও তিব্বত হল ফিরে পায়নি।

পুরান ঢাকার ওয়াইজ ঘাটের ওই জায়গাটির উপর সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ২০০২ সালে তার স্ত্রীর নামে ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’ নির্মাণ করেন।

তবে জায়গা দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন হাজী সেলিম। তিনি বলছেন, এটি তার কেনা জমি।

এক সময় জগন্নাথ কলেজের (পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত) ছাত্ররা ওই জায়গায় থাকলেও আইনি অধিকার দাবি করার পক্ষে কোনো দলিল কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।

এর আগে ব্যর্থ হলেও ছেলের কর্মকাণ্ডের জন্য হাজী সেলিমের বিপাকে পড়ার মধ্যে তিব্বত হল উদ্ধারে আবার সরব হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে হলটি উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।

কর্মসূচির নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিশু এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ চাইছেন।

নব্বইয়ের দশকের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, পুরান ঢাকার বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাড়ি দখল করে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা যেসব ছাত্রাবাস তৈরি করেছিল, ১৯৮৫ সালের পর থেকে তা হাতছাড়া হতে থাকে।

হাজী সেলিমের দখল থেকে তিব্বত হল উদ্ধারের দাবিতে মানবববন্ধনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

হাজী সেলিমের দখল থেকে তিব্বত হল উদ্ধারের দাবিতে মানবববন্ধনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার পর প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়া এসব ছাত্রাবাস উদ্ধারে নানা সময়ে আন্দোলন হলেও ১১টির মধ্যে কেবল দুটি হল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে উদ্ধার হওয়া হাবিবুর রহমান হলে কর্মচারী ও নজরুল ইসলাম হলে ছাত্ররা থাকছে।

এখনও বেদখল থাকা ছাত্রাবাসগুলোর একটি ৮.৮৮৯ কাঠার তিব্বত হল।

যেভাবে বেহাত

স্বাধীনতার পর জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানের যেসব পরিত্যক্ত বাড়িতে থাকা শুরু করেছিল, তার একটিই পরবর্তীতে ‘তিব্বত হল’ নাম পায়।

গুলশান আরা সিটি মার্কেটটি যে জায়গায় গড়ে ওঠেছে, সেটিই একসময় তিব্বত হল ছিল বলে জানান জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ ভিপি আলমগীর সিকদার লোটন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাড়িটি প্রথম কুমারটুলি ছাত্রাবাস নামে পরিচিত ছিল। ১৯৮৩ সালে জাতীয় ছাত্র সমাজের অন্তর্কলহে তিব্বত নামের একজন শিক্ষার্থী মারা যান। পরে কুমারটুলি ছাত্রাবাসের নাম পাল্টে একে তিব্বত হল নাম দেওয়া হয়।”

জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র সমাজ থেকে ১৯৮৭ সালে ভিপি নির্বাচিত হওয়া লোটন জানান, দোতলা ভবনটিতে তিন থেকে চারশ শিক্ষার্থী থাকতেন।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ১৯৮৫ সালে ধসে পড়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হল ছাড়তে নোটিস দিয়েছিল। এরপরও শিক্ষার্থীরা ছিল এখানে। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এখানে শিক্ষার্থীরা থাকত।”

২০১৪ সালে হল উদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এফ এম শরীফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ছাত্রাবাসটিতে জাতীয় ছাত্র সমাজের নেতারা যেসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালাতেন, তার জেরে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।

“এর একপর্যায়ে তিব্বত হল হাজী সেলিমের দখলে চলে যায়। হাজী সেলিম তখন সেখানকার কমিশনার ছিলেন।”

তখনকার ওয়ার্ড কমিশনার হাজী সেলিম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর এখন তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য তিনি।

জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীদের তিব্বত হল ভেঙে নতুন ভবনে ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’ করেছেন করেছেন হাজী সেলিম

জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীদের তিব্বত হল ভেঙে নতুন ভবনে ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’ করেছেন করেছেন হাজী সেলিম

২০১৪ সালে জাতীয় সংসদে হাজী সেলিম ছাত্রলীগের সমালোচনা করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হল পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু হয়।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে গুলশান আরা সিটি মার্কেটটি ঘেরাওয়ে গেলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় শিক্ষার্থীদের।

উদ্ধারে বাধা কোথায়

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথের হল ও বেদখল অন্যান্য সম্পত্তি উদ্ধারে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ওই কমিটি পরের মাসে তিব্বত হলসহ পাঁচটি ছাত্রাবাস বিশ্ববিদ্যালয়কে লিজ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি লিজের আবেদন করলেও তা আর অগ্রগতি পায়নি।

২০১৪ সালের আন্দোলনের পর বেদখল হল উদ্ধারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

ওই কমিটির সদস্য তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শরীফুল ইসলাম বলেন, কাগজপত্র না থাকায় হলটি উদ্ধার করা যায়নি।

“হাজী সেলিম মার্কেট করে তা ব্যবসায়ীদের কাছে খণ্ড খণ্ড ভাবে বিক্রি করে দেয়। তাদের কাগজপত্র আছে। আমাদের কাগজপত্র না থাকার কারণে আর সামাজিক-মানবিক মূল্যবোধের কারণে হলটি ফিরিয়ে আনতে পারিনি।”

হলটি উদ্ধারে শিক্ষার্থীদের আবার সরব হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “উদ্ধার প্রক্রিয়া কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তবে সরকার চাইলে সবকিছু সম্ভব। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে সরকার অনেক সিদ্ধান্তই নিতে পারে।”

ওই কমিটির প্রধান স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদও হলটি উদ্ধারের সম্ভাবনা দেখছেন না।

জগন্নাথ কলেজের সাবেক এই ভিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সব দেখে বুঝলাম হলগুলো উদ্ধার সম্ভব না।

“কোন কাগজপত্র নেই, ছাত্ররা পর্যায়ক্রমে হাতছাড়া করে ফেলছে। হলে অন্যরা ঢুকে গেছে। তারা কাগজপত্র, রেকর্ড করে আছে; এখন কী করে এটাকে উদ্ধার করব?”

জাতীয় পার্টির এই নেতা বলেন, “আমরা অনেক চেষ্টা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, এখানে এগুলো করার চেয়ে ভালো কেরানীগঞ্জে পুরো ক্যাম্পাসটাকে নিয়ে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, তিনি আমাদেরকে সেখানে জমি দিয়েছেন।”

ফিরোজ রশীদের নেতৃত্বাধীন কমিটির সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, কমিটি হলগুলোর বিষয়ে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দিলেও এরপর এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি জানতে পারেনি।

“আমাদের তো হল উদ্ধার করার ক্ষমতা নেই, সরকার উদ্ধার করে দিলে পরবর্তী ব্যবস্থা আমরা নেব।”

২০১৪ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় হল দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে হাজী সেলিম বলেছিলেন, পুরান ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা আব্দুল্লাহ ওয়ালফেয়ার ট্রাস্টের সম্পত্তিতে তিনি মার্কেট নির্মাণ করেছেন।

এবার এবিষয়ে কথা বলতে সংসদ সদস্য হাজী সেলিমকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় ছেলে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর তিনিও রয়েছেন অপ্রকাশ্যে।

হাজী সেলিমের ব্যক্তিগত সহকারী বেলাল হোসেন এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের আইনজীবীর সাথে কথা বলতে বলেন।

হাজী সেলিমের আইনজীবী প্রাণনাথ দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা জগন্নাথের হল না। যার সম্পত্তি, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে তার থেকে এটি কিনে নেওয়া হয়েছে, সে দলিল আছে আমাদের কাছে।”