পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

কে এই ‘গোল্ডেন মনির’

  • লিটন হায়দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-11-21 21:01:41 BdST

র‌্যাবের অভিযানে বিপুল অর্থসহ গ্রেপ্তারের পর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন মনির হোসেন, যাকে মেরুল বাড্ডার মানুষ ‘গোল্ডেন মনির’ নামেই চেনে।

এই নামকরণের সঙ্গে সোনা ব্যবসার বিষয়টি জড়িত হলেও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি মনিরকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলে মানতে অস্বীকার করেছে।

র‌্যাব জানিয়েছে, ব্যবসা নয়, কার্যত সোনা চোরাচালানই ছিল মনিরের ব্যবসা; পরে তিনি জড়িত হন জমির ব্যবসায়।

গামছা বিক্রেতা থেকে জমির ব্যবসার ‘মাফিয়া’ হয়ে ওঠা মনিরের বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার বিষয়টিও এই অভিযানের পর সামনে এসেছে।

বিএনপির সঙ্গে মনিরের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিতও দিয়েছেন র‌্যাবের কর্মকর্তারা।

মেরুল বাড্ডায় মনিরের ছয়তলা বাড়িতে র‍্যাব-৩ শুক্রবার মধ্যরাতে আকস্মিক অভিযান শুরু করে, যা চলে শনিবার সকাল পর্যন্ত।

সকালে মনিরকে গ্রেপ্তারের কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান র‌্যাব-৩ এর অপস অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার ফারজানা হক।

ওই বাড়ি থেকে ৯ লাখ টাকা মূল্যমানের বিদেশি মুদ্রাসহ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, চার লিটার মদ, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদেশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধারের কথা জানান তিনি।

পরে র‌্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের কাছে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন, যাতে মনিরের কোটি কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা জানানো হয়।

তবে মনিরকে গ্রেপ্তারের পর তার ছেলে রাফি হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন তার বাবা নির্দোষ। ‘বৈধ ব্যবসা’ করেই সম্পদের মালিক হয়েছেন।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রোববারই মনিরের দুবাই যাওয়ার কথা ছিল বলে জানান তার ছেলে, তার আগেই র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করল।

র‌্যাবের অভিযানে ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত মনির হোসেনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, চার লিটার মদ, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদিশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি।

র‌্যাবের অভিযানে ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত মনির হোসেনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, চার লিটার মদ, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদিশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি।

গামছা থেকে সোনায়

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, মনিরের বাবা কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সিরাজ মিয়া ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি ঢাকার নিউ মার্কেট ও গাওছিয়া মার্কেট এলাকায় ফেরি করে গামছা বিক্রি করতেন।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল রকিবুল হাসান বিডিনিউজ টোযেন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মনির দশম শ্রেণি প র্যন্ত পড়েছে। বাড্ডায় নানার বাসায় থেকে সে বড় হয়েছে।”

বাবার সূত্রে মনিরেরও ব্যবসার শুরু একইভাবে। পরে তিনি মৌলভীবাজার থেকে কাপড় এনে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করা শুরু করেন।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, “এভাবে সে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে আসার যাওয়ার মাধ্যমে ল্যাগেজ ব্যবসা শুরু করে। এই ব্যবসার আড়ালে সে স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসায় জড়িয়ে যায়।”

অভিযানে মনিরের বাসা থেকে নানা দামি পাথরসহ ৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের কথা জানান র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল রকিবুল হাসান।

‘গোল্ডেন মনির’ স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয়: বাজুস  

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাথর ছাড়া স্বর্ণের প্রকৃত ওজন জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

মনির গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, “মনিরকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এতে দেশের সাধারণ স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মান ক্ষুন্ন হচ্ছে। উক্ত মনির স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয়।”

র‌্যাব কর্মকর্তা রকিবুল বলেন, “মনিরের নিউ মার্কেট এলাকায় একটি স্বর্ণের দোকান এক সময় ছিল।

“স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসার সময় গোল্ডেন মনির নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে ২০০১ সালের পর থেকে সে এই ব্যবসা গুটিয়ে আনে এবং জমির ব্যবসার দিকে নজর দেয়।”

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত মনির হোসেনের এই ছয়তলা বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব।

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত মনির হোসেনের এই ছয়তলা বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব।

সোনা থেকে জমিতে

স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসার মধ্যেই ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মনির জমির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন বলে জানান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

এক কর্মকর্তা বলেন, “তখন গণপূর্ত ও রাজউকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গাঢ় হয়। সে সখ্য গড়ে তোলে এক মন্ত্রীর সাথে। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।”

মনির ঢাকা ও আশপাশে গত ২০ বছরে ২ শতাধিক প্লটের মালিক হন বলে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক রকিবুল বলেন, বাড্ডা, নিকেতন, কেরানীগঞ্জ, উত্তরা, নিকুঞ্জ এলাকায় অবৈধভাবে নেওয়া ২ শতাধিক প্লট-ফ্ল্যাট তার আছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই মনিরের বাড়িতে অভিযান চালান হয়।

“সে (প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে) ৩৫টি প্লটের কথা স্বীকার করেছে।”

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, “জমির ব্যবসায় নেমে রাজউকের বর্ধিত ভবনে একটি অফিস খুলে বসে সে, সেখান থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ শুরু করে।

“রাজউকের বিভিন্ন ধরনের তদবির, জমির কাগজ তৈরি, নকল ফাইল তৈরি করাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে থাকে।”

র‌্যাব জানায়, গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রাজউক কর্তৃপক্ষ একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে মনিরের অফিসে অভিযান চালিয়ে জমি-প্লট সংক্রান্ত ৭০টি ফাইল পায়, যেগুলো্ রা্জউজ থেকে চুরি হয়েছিল।

ওই ঘটনায় একটি মামলাও হয়, মনির সেই মামলায় জামিনে রয়েছেন।

২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলার খোঁজও পেয়েছে র‌্যাব। তবে সেই মামলার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি র‌্যাব কর্মকর্তারা।

অভিযানে টাকা, অস্ত্র, স্বর্ণ, মাদক ছাড়াও রাজস্ব কর্মকর্তা, রাজউক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার সিলসহ কাগজও পেয়েছে র‌্যাব, যা মনিরের কাছে থাকার কথা নয়।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক রকিবুল বলেন, “জমির অবৈধ ব্যবসার একটা বড় মাফিয়া ছিল সে (মনির)।”

জমির ব্যবসার পাশাপাশি গাড়ির ব্যবসায়ও নামেন মনির। প্রগতি সরণিতে তার অটো কার সিলেকশন নামে একটি গাড়ির বিক্রয় কেন্দ্রে রয়েছে।